জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তাঁর ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন—এই খবর পাওয়ার পর ঢাকা উদ্যান থেকে রিকশায় করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে রওনা হয়েছিলেন তাসলিমা আক্তার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক সাক্ষীর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ স্মৃতি। তাসলিমা আক্তার তাঁর জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন, ‘কিছু দূর যাওয়ার পর আমি রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখি এবং কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তাপস, বিপ্লব এদের হাতে অস্ত্র দেখতে পাই। আমার সামনেই একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ’
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১-এ এই জবানবন্দি প্রদান করেন তাসলিমা আক্তার। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় তিনি সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হন। এই মামলায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ মোট ২৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
জুলাইয়ের শহীদ ইসমাইলের মা তাসলিমা আক্তার জবানবন্দিতে বিস্তারিত জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরের খাবার শেষ করে বিকেল তিনটার দিকে ইসমাইল বাসা থেকে বের হয়। সে আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে চলমান আন্দোলনে যোগ দেয়। ইসমাইলের খালা যখন তাকে ফোন করেন, তখন সে প্রথমে ফোন ধরে না। এরপর বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পর তার বন্ধু কালু ফোন ধরে জানায় যে, ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওইদিন রাত ১০টার দিকে তাসলিমা আক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান। জবানবন্দিতে তিনি জানান, ছেলের অবস্থান জানতে চাইলে তাকে মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন তিন থেকে চার শ লাশ স্তূপীকৃত অবস্থায় পড়ে আছে। ইসমাইলের পোশাক দেখে তিনি তাকে চিনতে পারেন এবং লক্ষ্য করেন যে তাঁর ছেলে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে।
ছেলের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ আরও অনেকের দায়ভার উল্লেখ করেন তাসলিমা আক্তার। তিনি আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।’
মামলার তথ্যানুসারে, মোট ২৮ জন আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন এবং যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী। তবে জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলে নূর তাপসসহ বাকি ২৪ জন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।