বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মরত এক নারী চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকে গালিগালাজ এবং মারমুখী আচরণের অভিযোগ উঠেছে এক রোগীর সঙ্গে আসা একদল ব্যক্তির বিরুদ্ধে। চিকিৎসকের দাবি, ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি তার কক্ষে প্রবেশ করে তাকে হুমকি-ধমকি দেন এবং মারতে তেড়ে আসেন। তবে হাসপাতালের অন্যান্য কর্মী এবং উপস্থিত রোগীর স্বজনরা দ্রুত এগিয়ে আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে ক্যানুলা পরানো নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে বলে জানান চিকিৎসক ডা. সাকিয়া হক। ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রে চরম নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত এই চিকিৎসক। হাসপাতালের রেজিস্টারে রোগীর নাম ‘শানু’ হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ব্যক্তি আসলে বাগেরহাট জেলা শ্রমিক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ হানু। তবে এই ঘটনার বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডা. সাকিয়া হক তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “বাগেরহাটে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক শানু (নাকি হারুন জানি না) এসে শুধু গায়ে হাত দেওয়া বাকি রেখেছে নাইট ডিউটিতে। আমি একা রুমে। ৮-১০ জন সাঙ্গোপাঙ্গ এসে মারমুখী, কারণ একটাই—আমাদের ওয়ার্ড বয় ক্যানুলা মিস করছে।” পরবর্তীতে রাত সোয়া ১টার দিকে একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি স্পষ্ট করেন যে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে তিনি এই অভিযোগ করেননি।
ডা. সাকিয়া হক জানান, রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তার ডিউটি ছিল। সেই সময়ে ২৫০ শয্যার এই বিশাল হাসপাতালটিতে তিনি একাই চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি বিস্তারিত জানান, “রাত সাড়ে ১২টার দিকে বুকে ও পেটে ব্যথা নিয়ে এক রোগী জরুরি বিভাগে আসেন। প্রথমে তার ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) করা হয়। পরীক্ষা, রক্তচাপসহ অন্যান্য শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণে তাৎক্ষণিকভাবে হৃদযন্ত্রের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। পরে গ্যাসের সমস্যার জন্য ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।”
চিকিৎসকের বর্ণনা অনুযায়ী, ইনজেকশন দেওয়ার জন্য রোগীর শরীরে ক্যানুলা পরাতে গিয়ে একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক প্রথমবার ব্যর্থ হন। এরপর একজন ওয়ার্ড বয় চেষ্টা করেন, যা দেখে রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ক্যানুলা পরানোর কাজে অভিজ্ঞ শিশু বিভাগের নার্সদের ডেকে আনার জন্য হাসপাতালের কর্মীরা যখন বাইরে যান, তখনই ওই ব্যক্তিরা মারমুখী আচরণ শুরু করেন।
ডা. সাকিয়া বলেন, “তারা আমার কক্ষে ঢুকে গালাগাল শুরু করেন এবং বারবার মারতে তেড়ে আসেন। রোগীর সঙ্গে আসা কয়েকজন বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন। তারা গায়ে হাত দেননি, তবে পরিস্থিতি এমন ছিল যে তারা গায়ে হাত দিতেন কি না, তা বলা কঠিন। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে হাসপাতালের কর্মী ও অন্য রোগীর স্বজনেরা এগিয়ে আসেন। পরে হাসপাতালের কর্মীরা তাদের কক্ষ থেকে সরিয়ে দেন।”
চিকিৎসক আরও উল্লেখ করেন, রোগীকে ইনজেকশন দেওয়ার পর ২০ মিনিট পর্যবেক্ষণে রাখতে বলা হয়েছিল। তিনি বলেন, “ক্যানুলা পরানোর সময় কখনো কখনো ব্যর্থতা আসতে পারে। সেখানে অনেক মানুষের ভিড়ও বাড়তি চাপ তৈরি করে। রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিদের দাবি ছিল, চিকিৎসককেই ক্যানুলা পরাতে হবে। কিন্তু একজন চিকিৎসকের পক্ষে একা সব কাজ করা সম্ভব নয়। হাসপাতালের নার্স ও ওয়ার্ড বয়দেরও এ কাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকে গালাগাল করা বা মারতে তেড়ে আসা গ্রহণযোগ্য নয়।” তিনি জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাগেরহাট জেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি সরদার লিয়াকত আলী বলেন, “তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তা দুঃখজনক।” তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় শ্রমিক দল লিয়াকত আলীর নেতৃত্বাধীন কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেছিল, যেখানে আবু হানিফ হানু সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তবে পাঁচ দিনের মাথায় সেই কমিটিও বিলুপ্ত করা হয় এবং এরপর থেকে জেলায় দলটির নতুন কোনো কমিটি গঠিত হয়নি বলে জানা গেছে।
বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। কোনো হাসপাতালেই এমন পরিবেশ মেনে নেওয়া যায় না। হাসপাতালে পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছেন, অথচ প্রয়োজনীয় জনবলের এক-তৃতীয়াংশও নেই। এর মধ্যেও সবাই সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমন ঘটনা দুঃখজনক।”
তিনি আরও জানান, দুপুর পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করেনি, তবে পরবর্তী সভায় এই বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। অন্যদিকে, বাগেরহাট সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিন জানান, “এখনও কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”