ঢাকার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী নাফিজের গণিত অলিম্পিয়াড-যাত্রা শুরু হয় পঞ্চম শ্রেণিতে। প্রথমবার অংশ নিয়েই সে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হয় এবং গণিত ক্যাম্পে আসার সুযোগ পায়। সেই থেকে প্রতিবছর সে এই ক্যাম্পের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। এ পর্যন্ত ছয়বার জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হয়েছে নাফিজ। ২০২৪ সালে সে জাতীয় পর্যায়ে 'চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস' হয় এবং আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (IMO) বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। এ ছাড়া এশিয়া প্যাসিফিক গণিত অলিম্পিয়াডে (APMO) সে ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে। ইরানিয়ান কম্বিনেটরিক্স অলিম্পিয়াডের অ্যাডভান্সড ক্যাটাগরিতে সে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে রৌপ্যপদক জিতেছে, যা এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম। প্রাইমারি ও জুনিয়র ক্যাম্প থেকে শুরু করে আইএমও ক্যাম্প পর্যন্ত সব ক্যাম্পেই অংশ নিয়েছে নাফিজ। জীবনের সেরা কিছু মুহূর্তও কেটেছে এই ক্যাম্পগুলোতে। গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়, আজ সেটি নিয়েই লিখেছে সে।

এই পর্যায়ে প্রস্তুতি শুরুর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বিগত বছরের প্রশ্নগুলো বাসায় নিজে নিজে সমাধানের চেষ্টা করা। আটকে গেলে বড় ভাই-বোন বা শিক্ষকের সাহায্য নেওয়া যায়। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের ওয়েবসাইটেই বিগত বছরের সব প্রশ্ন পাওয়া যায়। পাশাপাশি নিজের ক্লাসের গণিত বই শেষ করা যেতে পারে। সম্ভব হলে এক-দুই ক্লাস উপরের গণিত বইও শেষ করা যায়। 'বিডিএমও প্রস্তুতি', 'নিউরনে অনুরণন'-এর মতো বইগুলোও পড়া যেতে পারে।

বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করতে গিয়ে দেখা যাবে, অনেক কিছুই আগে থেকে জানা নেই। তখন সমাধানটা দেখার পর সংশ্লিষ্ট টপিকগুলো সঙ্গে সঙ্গে শিখে ফেলা যায়।

বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এই পর্যায়েই গণিত অলিম্পিয়াড-যাত্রা শুরু করে। এ সময় নিজের ক্লাসের গণিত বই শেষ করে ফেলা উচিত। সম্ভব হলে নবম-দশম শ্রেণির গণিত বইও শেষ করতে পারলে ভালো।

তবে বই পড়ার পাশাপাশি এ সময় প্রচুর প্র্যাকটিস করতে হবে। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের বিগত বছরের প্রশ্ন তো আছেই। এর পাশাপাশি অন্য দেশের অলিম্পিয়াডের প্রশ্নও চেষ্টা করা উচিত। যেমন আমেরিকার AMC ও AIME, কিংবা আর্জেন্টিনা, পোল্যান্ড, আজারবাইজান, বেলজিয়াম, বেলারুশ, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন। এসব প্রশ্ন Art of Problem Solving (AoPS) ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।

প্রবলেমগুলো নিজে চেষ্টা করার পর ওয়েবসাইটে অন্যদের সমাধানও পড়তে হবে। এতে একটি প্রবলেম ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে কীভাবে সমাধান করা যায়, তা শেখা যায়। কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা গ্রুপ খুলে নিয়মিত প্র্যাকটিস করাও খুব ভালো একটি আইডিয়া।

এ সময় অনেকে কিছু বইও পড়ে। যেমন 'গণিতের স্বপ্নযাত্রা: গণিত অলিম্পিয়াডের প্রথম ধাপ', 'কম্বিনেটরিক্সের হাতেখড়ি', 'প্রমাণ কর যে' ইত্যাদি।

প্র্যাকটিসের জন্য gonitzoggo.com ওয়েবসাইটটিও খুব কার্যকর। সেখানে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের অনেক প্রবলেম আছে। এ ছাড়া গণিতযজ্ঞ ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের বিগত বছরের প্রশ্নের জাতীয় পর্যায়ের প্রশ্ন গুলোর একটি সমাধান-আর্কাইভ আছে। সেখান থেকে জুনিয়র ও সেকেন্ডারি ক্যাটাগরির প্রবলেমগুলো প্র্যাকটিস করা যায়। সেগুলোর সমাধান পড়ে কিভাবে জাতীয় পর্যায়ের Proof-based প্রশ্নের সমাধান করা যায় ও সমাধান লিখতে হয় তা শেখা যাবে।

এই পর্যায়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধানের চেষ্টা শুরু করা উচিত। যেমন:

●     আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (IMO) ও IMO শর্টলিস্ট

●     এশিয়া প্যাসিফিক গণিত অলিম্পিয়াড (APMO)

●     বলকান গণিত অলিম্পিয়াড (Balkan MO) ও Balkan MO শর্টলিস্ট

●     ইউরোপিয়ান গার্লস ম্যাথমেটিক্যাল অলিম্পিয়াড (EGMO)

●     ইরানিয়ান জিওমেট্রি অলিম্পিয়াড (IGO)

●     ইরানিয়ান কম্বিনেটরিক্স অলিম্পিয়াড (ICO)

এ সময় অনেকে টপিকভিত্তিক বইও পড়ে:

●     জ্যামিতি: Euclidean Geometry in Mathematical Olympiads (EGMO), অথবা আমার লেখা 'জ্যামিতির অন্তরালে'।

●     কম্বিনেটরিক্স: 'কম্বিনেটরিক্সের হাতেখড়ি', Olympiad Combinatorics, অথবা Problem-Solving Strategies।

●     সংখ্যাতত্ত্ব: Modern Olympiad Number Theory (MONT)।

●     বীজগণিত: 'বীজগণিতের সূত্রপাত'। ফাংশনাল ইকুয়েশন, পলিনমিয়াল ইত্যাদি টপিকের জন্য অনলাইনে আলাদা আলাদা বইও পাওয়া যায়।

কম্বিনেটরিক্স, সংখ্যাতত্ত্ব ও বীজগণিত একসঙ্গে শেখার জন্য খুবই ভালো একটি বই হলো OTIS Excerpts। বইটির পিডিএফ অনলাইনে পাওয়া যায়।

প্রথমবার পড়লে এই বইগুলো অনেকের কাছেই কঠিন মনে হতে পারে। কেউ কেউ ঘাবড়েও যেতে পারে। সত্যি বলতে, আমি নিজেও প্রথমবার পড়েই সব বুঝে ফেলেছিলাম, এমন নয়। তবে আমি একটা কৌশল মেনে চলতাম। কোনো বই একবার পড়ার পর, সব না বুঝলেও, দুই-তিন মাসের জন্য সেটা সরিয়ে রাখতাম। দুই-তিন মাস পর যখন আবার শুরু থেকে পড়তাম, তখন মনে হতো, "আরে, এই জিনিসটা তো এখন বুঝি! ও আচ্ছা, এটা দিয়ে এটা বোঝানো হয়েছে, এটা এখান থেকে এসেছে।" দ্বিতীয়বার পড়ার সময় অনেক কিছুই পরিচিত মনে হয়। ফলে বোঝাও সহজ হয়।

তবে যত বই-ই পড়ি না কেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের প্রবলেম সলভিং স্কিল। আর সেটা তখনই ভালো হবে, যখন আমরা প্রচুর প্রবলেম প্র্যাকটিস করব এবং সেগুলোর সমাধান পড়ব।

এই পর্যায়ে এসে খুব কম শিক্ষার্থীই নতুন করে অলিম্পিয়াড-যাত্রা শুরু করে। তবে দেরিতে শুরু করেছি ভেবে পিছিয়ে থাকলে চলবে না। সেকেন্ডারি ক্যাটাগরির জন্য যে বইগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো এই পর্যায়েও পড়তে হবে। পাশাপাশি প্রচুর প্রবলেম প্র্যাকটিস করতে হবে। বিশেষ করে ওপরে উল্লেখ করা আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডগুলোর প্রশ্ন সমাধান করা শিখতে হবে।