উন্মাদনা হলো একই জিনিস বারবার করে ভিন্ন ফলাফলের প্রত্যাশা করা, কথাটি আলবার্ট আইনস্টাইনের। বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার সরকারি কার্যক্রম দেখলে মনে হয়, আমরা বছরের পর বছর সেই উন্মাদনারই চর্চা করে যাচ্ছি।
আজকের মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন হচ্ছে, এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীদের মেঝে ও সিঁড়িতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিসংখ্যান ও ঘোষণা নিছক তথ্য নয়, একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দলিল।
বিগত সবগুলো সরকারের সময় আমরা ডেঙ্গুর কাছে তাদের অসহায়ত্ব দেখেছি। এখন সরকার বদলেছে, মন্ত্রী বদলেছে, সিটি করপোরেশনের নেতৃত্ব বদলেছে, তবু ফলাফল বদলায়নি। প্রশ্ন হলো, এই ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে আমরা আর কত দিন কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা বলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখব?
একজন আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি, সময় এসেছে বিষয়টিকে সাংবিধানিক ও আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করার।
সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের অধিকার নিশ্চিত করে এবং আমাদের সর্বোচ্চ আদালত বহু রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে এই অধিকার কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকার। ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের মান উন্নয়নকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই দুই অনুচ্ছেদ একত্রে পড়লে দাঁড়ায়, প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে বছরের পর বছর শত শত নাগরিকের মৃত্যু ঘটতে দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আসল প্রশ্নটা মশা নয়, বড় প্রশ্নটা আসলে সুশাসনের। মশা তো সিঙ্গাপুরে আছে, ইন্দোনেশিয়ায় আছে, পৃথিবীর বহু উষ্ণ দেশে এডিস মশা আছে। তারা বিজ্ঞান, নজরদারি, উৎসেই মশা নিধন এবং জবাবদিহির মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হচ্ছে। একজন কীটতত্ত্ববিদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে থাকলে গত বছর ৬২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হতেন না, এ বছরও মশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে। অর্থাৎ রোগ নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে তা হয়নি।
আমাদের উচ্চ আদালত ইতিমধ্যে দেখিয়েছেন যে মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বিচারযোগ্য বিষয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য হাইকোর্ট ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে ভর্ৎসনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ধরনের হস্তক্ষেপ এখনো বিচ্ছিন্ন ও সুনির্দিষ্ট স্থানকেন্দ্রিক থেকে যাচ্ছে, অথচ সংকট জাতীয়।
সরকারি জরিপেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, মশার প্রজননস্থল হিসেবে সিমেন্টের পানির ট্যাংক ও জলমগ্ন মেঝেকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সমস্যার মানচিত্র হাতে থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া নিছক অবহেলা নয়, দায়িত্বে চরম ঔদাসীন্য, যা আইনের চোখে জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত।
প্রতিবছর মশা নিধনে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে, কীটনাশক কেনা হয়, ফগিং হয়, ধোঁয়ায় রাস্তা অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু কত শতাংশ মশা কমল, ওয়ার্ডভিত্তিক মশার মানচিত্র কোথায়, কীটনাশকের কার্যকারিতা ও প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষার ফল কোথায়, স্বাধীন নিরীক্ষা কোথায়—এসব প্রশ্নের জবাব নেই। এই স্বচ্ছতার অভাব একা প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অনিয়মের প্রমাণও মেলে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দরপত্র ছাড়াই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে লাখ লাখ টাকার ওষুধ কেনার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
সরকার বদলের পরও ছবিটা বদলায়নি, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম সিটিতে মশার ওষুধ কেনা হয়েছে একজন উপদেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় একটি কীটনাশক নিষিদ্ধ করলেও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একই ওষুধ ব্যবহার চালিয়ে গেছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কীটনাশক ভান্ডারে অভিযান চালিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ পেয়েছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, জনস্বাস্থ্যের নামে বরাদ্দকৃত অর্থে অনিয়ম কোনো একটি সরকার বা দলের একচেটিয়া সমস্যা নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি, যা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় না।
জনস্বাস্থ্যে দুর্নীতি অন্য যেকোনো দুর্নীতির চেয়ে ভয়ংকর। রাস্তার কাজে দুর্নীতি হলে রাস্তা ভাঙে; মশা মারার কাজে দুর্নীতি হলে মানুষ মরে। ফৌজদারি আইনের দৃষ্টিতে, সরকারি অর্থ ব্যয় করে নিম্নমানের বা অপরীক্ষিত কীটনাশক কেনা এবং তা জেনেবুঝে ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া, বিশেষত যখন তার ফলে প্রাণহানি ঘটে, তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, দায়িত্বে অবহেলাজনিত অপরাধের সীমায় পড়তে পারে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী এসব ঘটনার তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলকভাবে, কেবল প্রতিবেদন প্রকাশ ও সাময়িক তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে।
আমাদের উচ্চ আদালত ইতিমধ্যে দেখিয়েছেন যে মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বিচারযোগ্য বিষয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য হাইকোর্ট ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে ভর্ৎসনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ধরনের হস্তক্ষেপ এখনো বিচ্ছিন্ন ও সুনির্দিষ্ট স্থানকেন্দ্রিক থেকে যাচ্ছে, অথচ সংকট জাতীয়।
এখন প্রয়োজন ব্যাপক আকারে জনস্বার্থে মামলা দায়েরের মাধ্যমে দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বিরুদ্ধে একটি সামগ্রিক নির্দেশনা আদায় করা, যেখানে আদালত সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেবেন, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেবেন, এবং ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেবেন। পরিবেশদূষণ বা সড়ক নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিষয়ে অতীতে যেমন আদালত থেকে ব্যাপক নির্দেশনা এসেছে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও তেমন একটি জাতীয় বিচারিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে।
একটি মশা যদি সরকার বদলের পরও রাষ্ট্রকে বারবার পরাজিত করতে থাকে, তাহলে সমস্যাটা আর মশা নয়, সমস্যাটা আমাদের শাসনব্যবস্থায়। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই আসলে অদক্ষতা, অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি সুশাসনের জন্য লড়াই। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যাঁর হাতে, জবাবদিহিও তাঁর। প্রতিটি ডেঙ্গু মৃত্যু কেবল একটি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান নয়, তা সাংবিধানিক অঙ্গীকার ভঙ্গের দৃষ্টান্ত।
মেয়র, সচিব ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একাধিক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডকে উপ–অঞ্চলে ভাগ করে সমন্বিত কার্যক্রম চালানো হবে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসনিক আইনের একটি মৌলিক নীতি এখানে প্রাসঙ্গিক, ক্ষমতা যেখানে অর্পিত, দায়ও সেখানে বর্তায়।
সিটি করপোরেশন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচিত প্রশাসনিক জবাবদিহি তলব করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
তুলনামূলক আলোচনায় প্রায়ই আসে কলকাতার উদাহরণ, যারা ফগার মেশিন দিয়ে সাময়িক মশা তাড়ানোর বদলে বৃষ্টির মৌসুম শুরুর আগেই নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত আট মাস উৎসেই মশা নিধনে ধারাবাহিক কাজ চালিয়ে সফল হয়েছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি, প্রাক–মৌসুম পরিকল্পনাকে বাংলাদেশেও আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করা সম্ভব, সিটি করপোরেশন আইনে বার্ষিক মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা দাখিল ও অনুমোদন বাধ্যতামূলক করে, অবাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রেখে।
সমাধান হিসেবে প্রথমত, ডেঙ্গুকে মৌসুমি সমস্যা না ভেবে স্থায়ী জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দিতে হবে, যাতে সারা বছরের বাজেট, জনবল ও জবাবদিহির কাঠামো নির্ধারিত থাকে।
দ্বিতীয়ত, সংক্রামক রোগ আইন ও স্থানীয় সরকার আইনে পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক যুক্ত করতে হবে, যাতে ব্যর্থতা প্রমাণসাপেক্ষ ও শাস্তিযোগ্য হয়। তৃতীয়ত, কীটনাশক ক্রয় প্রক্রিয়ায় বাধ্যতামূলক স্বাধীন পরীক্ষা ও প্রকাশ্য নিরীক্ষার বিধান রাখতে হবে, যাতে নিষিদ্ধ বা অপরীক্ষিত ওষুধ কেনার সুযোগ না থাকে।
চতুর্থত, প্রমাণিত প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার কারণে মৃত্যু ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ কাঠামো তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, আইনজীবী সমিতি ও সুশীল সমাজের উচিত সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা দায়ের করে একটি জাতীয় নির্দেশনা আদায় করা।
একটি মশা যদি সরকার বদলের পরও রাষ্ট্রকে বারবার পরাজিত করতে থাকে, তাহলে সমস্যাটা আর মশা নয়, সমস্যাটা আমাদের শাসনব্যবস্থায়। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই আসলে অদক্ষতা, অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি সুশাসনের জন্য লড়াই। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যাঁর হাতে, জবাবদিহিও তাঁর। প্রতিটি ডেঙ্গু মৃত্যু কেবল একটি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান নয়, তা সাংবিধানিক অঙ্গীকার ভঙ্গের দৃষ্টান্ত।
আইন আছে, বিচারিক নজিরও আছে, প্রয়োজন কেবল তার কঠোর ও ধারাবাহিক প্রয়োগ। আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান সরকার, প্রশ্নটা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, প্রশ্নটা রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহির সক্ষমতার। এবার সত্যিই সময় এসেছে আয়নাটা নিজেদের দিকে ফেরানোর, নইলে আগামী বছরও আমাদের হয়তো একই সংখ্যা, একই আর্তনাদ নিয়ে বসতে হবে।
ওমর সাদাত নগর অধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
*মতামত লেখকের নিজস্ব