২০২৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ফিনটেক দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে আর্থিক ধারণাকে বদলে দিচ্ছে এআই। এআইসহ নতুন নতুন প্রযুক্তি বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বাংলাদেশের সামনেও এআই–নির্ভর ফিনটেক খাতে নতুন সম্ভাবনার সুযোগ রয়েছে। গত শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশ ফিনটেক সামিটের ষষ্ঠ সংস্করণে এসব তথ্য জানানো হয়।
বাংলাদেশ ফিনটেক ফোরামের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম আয়োজিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ, নগদবিহীন লেনদেন, ডিজিটাল আর্থিক খাতের রূপান্তর, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ এবং এ খাতের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের গ্রুপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী সম্পাদক সাজিদ মাহবুব বলেন, ‘বাংলাদেশের ফিনটেক খাতের অগ্রগতি নির্ভর করবে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে আমরা কতটা স্থায়ী আর্থিক সক্ষমতায় রূপ দিতে পারি তার ওপর। উদ্ভাবনের মাধ্যমে আর্থিক সেবাকে মানুষের জন্য আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে এসব সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে কাজ করে ভবিষ্যতের আর্থিক সেবার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মান গড়ে তুলতে হবে।
র্যাপটাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশে মাইক্রোসফটের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুপ ফারুক বলেন, দ্রুত বর্ধনশীল ফিনটেকশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, মানুষের নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। ফিনটেক খাতে এআই যেভাবে লেনদেন ও মূল ব্যবসায়িক প্রভাব ফেলছে, তা সার্বক্ষণিক তদারকি করা জরুরি। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য, সংবেদনশীল আর্থিক তথ্য এবং গোপনীয় রেকর্ড যেন কোনো অননুমোদিত এআই এজেন্ট হাতিয়ে নিতে না পারে, তার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। বিশেষ করে ঋণ-ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কেওয়াইসি যাচাইকরণের মতো অতিসংবেদনশীল কাজে এআই যেন কোনো ভুল বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত না নেয়, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
ট্রান্সফাই গ্লোবালের প্রধান ব্যাংকিং ও নেটওয়ার্ক কর্মকর্তা নওশাদ হুসেইন বলেন, আসিয়ান ও দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকিং খাতে পরিবর্তন আসছে। এসব পরিবর্তন নতুন গ্রাহক ও বাজারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে ফিনটেক খাত বিভিন্ন মডেলে এগোচ্ছে। সুপার অ্যাপ, ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে শুরু করে নিয়মে বাঁধা ডিজিটাল ব্যাংক ও পেপমেন্ট পরিকাঠামো এর অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন সুপার অ্যাপগুলো দৈনন্দিন সেবার সঙ্গে ব্যাংকিং, সঞ্চয়, ঋণ ও বিনিয়োগ যুক্ত করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় বিপ্লব এনেছে।
কিউব মানি ইউকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী ইয়ার মোহাম্মদ বলেন, গ্রাহকদের দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদা মেটাতে ও ডিজিটাল ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে ব্যাংকগুলোকে ডিজিটাল চিন্তাধারা গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে মূল চাবিকাঠি হলো গ্রাহক অভিজ্ঞতার জন্য নিরবচ্ছিন্ন অ্যাপ সেবা, দ্রুত ঋণ অনুমোদন এবং ২৪/৭ সমর্থন নিশ্চিত করা। ফিনটেক ও ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালন খরচ কমিয়ে এসএমই ঋণ সম্প্রসারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছাতে অনন্য ভূমিকা রাখছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ফিনটেক খাতের টেকসই অগ্রগতির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। আর্থিক জালিয়াতি শনাক্ত, ঋণ মূল্যায়ন ও বিমা সেবায় এআই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে। তবে এর জন্য প্রশাসনিক জবাবদিহি ও মানবের পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য।
সম্মেলনে আর্থিক সেবার মানোন্নয়ন, আরও বেশি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতের অগ্রগতিতে অবদান রাখা ২১টি ফিনটেক উদ্যোগকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। সম্মাননার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ফিনটেক উদ্ভাবনের মূল্য নির্ভর করে তা মানুষ ও ব্যবসার জন্য কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তার ওপর। আর্থিক সেবাকে আরও সহজলভ্য, নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর করতে যেসব দল কাজ করছে, এই সম্মাননা তাদের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি। আমরা আশা করি, তাদের অর্জন মানুষের বাস্তব প্রয়োজন মেটাতে পারে এমন নতুন ধারণায় বিনিয়োগ বাড়াবে এবং বাংলাদেশের আর্থিক ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করবে।’