নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে, আনুমানিক ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে (১৮ হিজরি পূর্ব), মক্কার কেন্দ্রীয় উপাসনালয় কাবা শরিফ এক গভীর সংকটের মুখে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে জীর্ণ হয়ে পড়া এই প্রাচীন স্থাপনাটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এই উদ্যোগটি কোরাইশ গোত্রগুলোর মধ্যে এমন তীব্র বিরোধের জন্ম দেয় যে, পরিস্থিতি প্রায় সশস্ত্র সংঘাতের পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স তখন ৩৫ বছর। নবুয়ত পাওয়ার ৫ বছর পূর্বের এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি একটি সহজ অথচ বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান প্রদান করেন। তাঁর এই বিচক্ষণতার ফলে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর হয় এবং এই ঘটনাই তাঁকে মক্কার সব গোত্রের কাছে এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, ইসমাইল (আ.)-এর সময় থেকে কাবার উচ্চতা ছিল মাত্র নয় হাত (প্রায় ৪.৫ মিটার বা ১৩.৫ ফুট)। এর চারপাশের দেয়ালগুলো মর্টার ছাড়া শুকনো পাথরের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি ছিল এবং কোনো ছাদ ছিল না। (আল-আজরাকি, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ, আখবারু মাক্কা, ১/১৫৭, দারুল আন্দালুস, বৈরুত, ১৯৮৩)
পুনর্নির্মাণের কিছুকাল আগে এক কোরাইশ নারীর অসাবধানতায় ধূপের স্ফুলিঙ্গ লেগে কাবার চাদর ও কাঠামোয় আগুন ধরে যায়। এর ফলে পাথরের ভারবহন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯২, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)
এর পাশাপাশি আরও দুটি প্রধান সংকট তৈরি হয়। প্রথমত, ভেঙে পড়া কাবা নতুন করে গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও খোদায়ি অসন্তুষ্টির ভয়ে প্রথমে কেউ সেখানে হাত দিতে সাহস পাননি। এছাড়া কাবার ভেতরে একটি বিশাল বিষধর সাপ বাস করত, যা নিয়মিত দেয়ালের পাথরে উঠে ফণা তুলে হিসহিস করত। ফলে কাবার দেয়ালের কাছে কেউ ঘেঁষতে পারত না।
দ্বিতীয়ত, মক্কা নগরী একটি গভীর অববাহিকায় (বাতহা) অবস্থিত হওয়ায় ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে আকস্মিক অতিবৃষ্টির ফলে উত্তর দিকের উচ্চভূমি ‘আল-মালা’ থেকে নেমে আসে বিধ্বংসী পাহাড়ি ঢল, যাকে বলা হয় সাইলুল জুহাফ। এই ঢল কাবার চত্বরে প্রবেশ করে এবং কাবার দক্ষিণ ও পশ্চিম দেয়ালে গভীর ফাটল ধরিয়ে দেয়। (আল-আজরাকি, আখবারু মাক্কা, ১/১৫৬–১৫৭)
পাশাপাশি কাবার ভেতরে একটি শুকনো অন্ধকূপ ছিল, যাকে বলা হতো ‘বিরু কাবা’। সেখানে কাবার জন্য নিবেদিত স্বর্ণ, মূল্যবান উপহার ও সুগন্ধি সংরক্ষিত থাকত। কাবার ছাদ না থাকায় এবং দেয়াল নিচু হওয়ায় সেই স্বর্ণভাণ্ডার চুরি হয়ে যায়।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতি কোরাইশদের বাধ্য করে একটি নতুন নকশায় কাবা নির্মাণ করতে, যাতে সুরক্ষিত ছাদ এবং বাইরের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে উঁচু দরজা থাকবে। এর আগে দরজাটি ছিল মেঝের মাটির সমতলে। (আল-বালাজুরি, আনসাবুল আশরাফ, ১/৯৯, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৫৯)
ভাঙা কাবা নতুন করে গড়ার সিদ্ধান্ত হলেও খোদায়ি অসন্তুষ্টির ভয়ে প্রথমে কেউ হাত দিতে সাহস করেনি, আর কাবার ভেতরের একটি বিশাল বিষধর সাপ এই ভীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। সাপটি নিয়মিত দেয়ালের পাথরে উঠে ফণা তুলে হিসহিস করত, ফলে কাবার দেয়ালের কাছে কেউ ঘেঁষতে পারত না।
সিরাতের বিবরণে এসেছে, কোরাইশরা যখন পাথর ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন একদিন হঠাৎ আকাশ থেকে একটি বিশাল শিকারি পাখি (ঈগল বা বাজপাখি) ছোঁ মেরে সাপটিকে নখরে তুলে নিয়ে জাবালে আজইয়াদের দিকে উড়ে যায়। কোরাইশরা এই দৃশ্য দেখে স্বস্তি পায় এবং একে শুভ লক্ষণ ধরে নিয়ে নির্মাণে এগিয়ে আসে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ৩/১২২, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
কোরাইশদের শীর্ষ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা নিজ হাতে প্রথম আঘাত করে ভাঙার কাজ শুরু করেন এবং একটি রাত নিরাপদে পার হওয়ার পর বাকিরা নিশ্চিন্ত হয়ে কাজে যোগ দেন।
তৎকালীন মরু মক্কায় ছাদ নির্মাণের উপযোগী কাঠ বা দক্ষ রাজমিস্ত্রি ছিল না। এই সময়ে লোহিত সাগরের উপকূলীয় শুআইবা বন্দরে (মক্কা থেকে প্রায় ৮০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে) একটি বাইজেন্টাইন বাণিজ্যিক জাহাজ ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়। সেই জাহাজে শামের কোনো গির্জার জন্য প্রস্তুত করা কাঠ ও মার্বেল ছিল। কোরাইশ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে গিয়ে সেই কাঠ কিনে মক্কায় আনেন।
জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে বাকুম নামে একজন বাইজেন্টাইন রোমান স্থপতি ও কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। তাঁকে কাবার মূল স্থপতি ও কাঠমিস্ত্রি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনিই প্রথম রোমান ধাঁচে কাঠ ও পাথরের স্তরীভূত গাঁথুনি দিয়ে কাবার ছাদ ও দেয়ালের নকশা প্রস্তুত করেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৪৫, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাহ নিজ হাতে প্রথম কোদাল চালিয়ে ভাঙার কাজ শুরু করেন। গভীর পর্যন্ত খনন করার পর সেখানে উটের কুঁজের মতো পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে খাঁজকাটা সবুজ পাথরের আদি ভিত্তি উন্মোচিত হয়। (আল-আজরাকি, আখবারু মাক্কাহ, ১/১৬০)
নির্মাণ শুরুর আগে বনু মাখজুমের এক প্রবীণ নেতা আবু ওয়াহাব ইবনে আমর (মতান্তরে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাহ) শর্ত দেন, এই পবিত্র গৃহ নির্মাণে কেবল হালাল উপার্জন ব্যয় করা যাবে—পতিতাবৃত্তি, সুদ বা জুলুমের অর্থ এতে এক দিরহামও প্রবেশ করানো যাবে না। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯৩)। এই কঠোর শর্তের কারণে তহবিলে ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে কোরাইশরা উত্তর দিকের প্রায় ছয় হাত জায়গা মূল দেয়ালের বাইরে রেখে দেয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮৩)
খননকালে কাবার রুকন ও মাকামে ইবরাহিমের তলদেশ থেকে প্রাচীন পাথরের কয়েকটি ফলক উদ্ধার করা হয়, যাতে প্রাচীন সুরিয়ানি (বা মুসনাদ) লিপিতে খোদাই করা কিছু ঐতিহাসিক বাণী লিপিবদ্ধ ছিল। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯৫–১৯৬)
কাবার দেয়াল তোলার দায়িত্ব কোরাইশদের চারটি প্রধান গোত্রজোটের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। পূর্ব দেয়াল (দরজা সংলগ্ন) দায়িত্ব পায় বনু আবদে মানাফ ও বনু জুহরাহ; দক্ষিণ দেয়াল (রুকনে ইয়ামানি ও আসওয়াদ) বনু মাখজুম ও বনু তাইম; পশ্চিম দেয়াল (পেছনের অংশ) বনু জুমাহ ও বনু সাহম এবং উত্তর দেয়াল (হাতিমের অংশ) বনু আসাদ, বনু আবদুদ দার ও বনু আদি। এই নির্মাণকাজে মুহাম্মদ (সা.) নিজে কাঁধে পাথর বহনের কায়িক শ্রমে অংশ নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮২)
দেয়াল যখন হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের উচ্চতায় পৌঁছায়, তখনই আরবের গোত্রীয় অহমিকার চরম বিস্ফোরণ ঘটে। প্রতিটি গোত্র দাবি করে এই সম্মান একান্তই তাদের প্রাপ্য। উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দুই পক্ষ রক্তপাতের শপথ নেয়। বনু আবদুদ দার ও বনু আদি ইবনে কাব এই সম্মানের একটি পাত্রে তাজা রক্ত ভর্তি করে আনে এবং সেই রক্তে হাত চুবিয়ে একে অপরের হাত চাটে। আরবের ইতিহাসে এটি ‘লা’কাতুদ দাম’ ‘রক্ত চাটার জোট’ নামে পরিচিত। টানা কয়েক দিন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকে এবং তলোয়ার উন্মুক্ত করে গোত্রগুলো পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। (ইবনে হিশাম, আস–সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯৬)
এই সংকটময় মুহূর্তে প্রবীণ নেতা আবু উমাইয়া ইবনে মুগিরা আল-মাখজুমির (নবীজির স্ত্রী উম্মে সালামার পিতা) প্রস্তাব অনুযায়ী ঠিক হয়, হারাম সীমানার ফটক দিয়ে পরদিন যে ব্যক্তি সবার আগে প্রবেশ করবেন, তিনিই হবেন চূড়ান্ত সালিশ। পরদিন ভোরে সেই ব্যক্তি হন মুহাম্মদ (সা.)। তাঁকে দেখামাত্র উপস্থিত নেতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠেন, ‘ইনিই আল-আমিন, তাঁর ফয়সালায় আমরা সন্তুষ্ট।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৫৫০৪)
মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পরনের ইয়েমেনি চাদর বিছিয়ে তার মাঝে হাজরে আসওয়াদ রাখেন এবং প্রতিটি গোত্রজোটের একজন প্রতিনিধিকে চাদরের এক কোণ ধরে একযোগে পাথরটি তুলতে বলেন। চাদর নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে তিনি নিজ হাতে পাথরটি দেয়ালের নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে দেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৪৬; ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৬০)
চাদরের চার কোণ কারা ধরেছিলেন সে বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনায় ভিন্ন ভিন্ন নাম এসেছে। এক বর্ণনা মতে, চার প্রধান গোত্রজোটের শীর্ষ চার নেতা ছিলেন: উতবা ইবনে রাবিআহ (বনু আবদে মানাফ ও জুহরাহ জোটের পক্ষে), আমর ইবনে হিশাম (আবু জাহেল) / ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাহ (বনু মাখজুম ও তাইম জোটের পক্ষে), হাকিম ইবনে হিজাম (বনু আসাদ ও আবদুদ দার জোটের পক্ষে) এবং উমাইয়া ইবনে খালাফ / আস ইবনে ওয়ায়েল (বনু সাহম ও জুমাহ জোটের পক্ষে)। আবার কোনো সূত্রে উতবা ইবনে রাবিআহ, আসওয়াদ ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আবু হোজাইফা আর কায়েস ইবনে আদির কথা বলা হয়েছে।
প্রাক-ইসলামি আরবে মক্কার রাজনীতি পরিচালিত হতো কোনো একক রাজতন্ত্র দিয়ে নয়; বরং বিভিন্ন কুরাইশ বংশীয় সামন্তদের একটি অলিখিত পরিষদ ‘আল-মালা’র মাধ্যমে। ফিজার যুদ্ধ ও হিলফুল ফুজুলের পর আবদুল মুত্তালিব এবং প্রবীণ হারব ইবনে উমাইয়ার মতো প্রভাবশালী নেতারা মারা গিয়েছিলেন। প্রবীণ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে তরুণ ও মধ্যবয়সী গোত্রপ্রধানরা—যেমন আবু জাহেল (বনু মাখজুম), উতবা ইবনে রাবিআহ (বনু আবদে শামস), উমাইয়া ইবনে খালাফ (বনু জুমাহ)—ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান। কাবা পুনর্নির্মাণে হাজরে আসওয়াদ বসানোর সুযোগটি ছিল মক্কার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার লড়াই।
এর আগে কোরাইশরা মুহাম্মদ (সা.)-কে জানত কেবল বনু হাশিম গোত্রের এক বিশ্বস্ত ও সৎ তরুণ হিসেবে। কিন্তু এই ঘটনার আগ পর্যন্ত তাঁর কোনো সর্ব-গোত্রীয় বা সর্ব-মাক্কী আইনি বা রাজনৈতিক এখতিয়ার ছিল না। চাদর কূটনীতির মাধ্যমে তিনি বনু মাখজুম, বনু আবদে শামস, বনু আসাদ ও বনু সাহমের মতো পরস্পরবিরোধী পরাশক্তিগুলোকে একটিমাত্র চাদরের সুতোয় বেঁধে ফেলেন।
সিরাতকারদের ভাষায়, “এর মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা.) কেবল বনু হাশিমের প্রতিনিধি রইলেন না; বরং তিনি সমগ্র মক্কার গোত্রগুলোর যৌথ আস্থাভাজন একমাত্র জাতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন।” (ড. মাহদি রিজকুল্লাহ, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাউইল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৩৪–১৩৫, কেন্দ্রিক গবেষণা প্রকাশনা, রিয়াদ, ১৯৯২)
এভাবে মক্কার রাজনীতিতে নৈতিক চরিত্রই প্রথমবার কোনো সামরিক শক্তি বা সম্পদের দাপট ছাড়াই ক্ষমতার সর্বোচ্চ সালিশি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। এটিকে বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন ও সফল ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব’র উদাহরণ বলা যায়। কাবার পুনর্নির্মাণের ঠিক পাঁচ বছর পর (৪০ বছর বয়সে) যখন তিনি নবুয়তের ঘোষণা দেবেন এবং পরবর্তীকালে মদিনা রাষ্ট্র গঠন করবেন—তার মূল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল এই ৩৫ বছর বয়সে।
পুনর্নির্মাণের পর কাবার উচ্চতা নয় হাত থেকে বেড়ে আঠারো হাতে (প্রায় ২৭ ফুট) দাঁড়ায়। প্রথমবারের মতো একটি কাঠের ছাদ বসানো হয়, যা ভেতরের দুটি সারিতে তিনটি করে মোট ছয়টি কাঠের স্তম্ভের ওপর স্থাপিত ছিল। পশ্চিম দেয়ালের দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পূর্ব দেয়ালের দরজা মাটির সমতল থেকে প্রায় ২ মিটার (৬ ফুট) উঁচুতে স্থাপন করা হয় যাতে কোরাইশের অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে না পারে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৩৩)
তহবিলে ঘাটতির কারণে কোরাইশরা উত্তর দিকের যে ছয় হাত জায়গা দেয়ালের বাইরে রেখেছিল, তার চারপাশে একটি অর্ধচন্দ্রাকার নিচু দেয়াল তুলে দেয়। এই অংশই আজকের ‘হিজরে ইসমাইল’ বা হাতিম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮৩)
বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রথমবারের মতো একটি কাঠের নালা বসানো হয়, যা পরবর্তীকালে ‘মিজাবুর রাহমাহ’ নামে পরিচিতি পায়। (আল–আজরাকি, আখবারু মাক্কা, ১/১৬৫)
স্থপতি বাকুমের তত্ত্বাবধানে কাবার অভ্যন্তরেও বাইজেন্টাইন ধাঁচের কিছু চিত্রকর্ম আঁকা হয়েছিল বলে সিরাতের উৎসে উল্লেখ আছে। সেখানে ফেরেশতাদের ছবি, বৃক্ষরাজি, হাতে ভাগ্যগণনার তিরসহ নবী ইব্রাহিম, মরিয়ম ও কোলে শিশু ইসা (আ.)-এর ছবি অঙ্কিত ছিল। যা মক্কা বিজয়ের দিন (৮ হিজরি) নবীজির নির্দেশে জমজমের পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মুছে ফেলা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৫১)
কাবার এই কোরাইশ সংস্করণ নিয়ে নবীজির আক্ষেপ করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের অনেক পরে নবীজি আয়েশা (রা.)-কে কাবা ভেঙে আগের মতো ইব্রাহিমি ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করার কথা বলেছিলেন। নবদীক্ষিত মুসলিমদের হৃদয়ে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কায় জীবদ্দশায় তিনি তা করেন নি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮৩)
নবীজির ওফাতের কয়েক দশক পর, ৬৪ হিজরিতে খলিফা আবদুল্লাহ ইবনুজ জুবায়ের হাদিসের ভিত্তিতে কাবা ভেঙে ইব্রাহিমি নকশায় পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি হাতিমকে মূল কাবার ভেতরে রাখেন এবং সমতলে দুটি দরজা তৈরি করেন। কিন্তু ৭৩ হিজরিতে উমাইয়া সেনাপতি হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ মক্কা দখল করে খলিফা আবদুল মালিকের নির্দেশে জুবায়েরের নির্মাণ ভেঙে পুনরায় কোরাইশের আদি কাঠামোয় ফিরিয়ে আনেন, যা আজও বহাল আছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৩৩)