বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ খাত, বন্দর এবং নগর পরিবহনের ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এসেছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বাজারে প্রবেশাধিকারকে সহজতর করেছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বড় এবং জটিল অবকাঠামো প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা মাথায় রেখে আরও অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—সরকারি বিনিয়োগ কতটা দক্ষতার সাথে, যৌক্তিক ব্যয়ের মাধ্যমে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর অবকাঠামোয় রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।
সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই প্রশ্নটি এখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকারি অর্থের ব্যাপক চাহিদা, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা। যখন কোনো প্রকল্প অপরিকল্পিত প্রস্তুতি বা দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে, তখন অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং এটি সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতার কিছু স্পষ্ট লক্ষণ আমরা দেখতে পাই। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির আর্থিক বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এই হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। যদিও কেবল অর্থ ব্যয়ের হার দিয়ে প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রগতি বা কাজের গুণগত মান পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না, তবুও বাস্তবায়নের এই ধীরগতি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে প্রকল্প অনুমোদনের পূর্ববর্তী পর্যায়ে একটি বড় ধরনের দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। যদি সম্ভাব্যতা যাচাই মানসম্মত না হয়, নকশা অসম্পূর্ণ থাকে, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ না হয় কিংবা ইউটিলিটি স্থানান্তরের যথাযথ ব্যবস্থা না করেই প্রকল্প শুরু করা হয়, তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হয়। এর ফলে পরবর্তীতে নকশা ও চুক্তি সংশোধন, সময় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন পড়ে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সীমিত সম্পদের বিপরীতে অত্যধিক সংখ্যক প্রকল্প গ্রহণ। যখন অনেক প্রকল্পের মধ্যে অর্থ ভাগ করে দেওয়া হয়, তখন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পায় না। এর ফলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় এবং অসমাপ্ত প্রকল্পগুলো ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
তবে সব ধরনের ব্যয় বৃদ্ধিকে কেবল দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল বলা ঠিক হবে না। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতির দাম বাড়ার কারণেও প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। এই বাহ্যিক কারণগুলোকে দুর্বল নকশা, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার ত্রুটি বা সমন্বয়ের অভাবজনিত ব্যয় বৃদ্ধি থেকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আরেকটি বড় বাধা হলো পেশাগত দক্ষতার অভাব এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের ঘাটতি। বড় ও জটিল প্রকল্পের ক্ষেত্রে কেবল প্রকৌশল বিদ্যাই যথেষ্ট নয়; বরং সরকারি ক্রয়, অর্থ ব্যবস্থাপনা, চুক্তি সম্পাদন, আইন, পরিবেশ রক্ষা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন দিক সামলাতে হয়। এই ক্ষেত্রগুলোতে সক্ষমতার অভাব প্রকল্পের গতি ও মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একইভাবে জমি অধিগ্রহণ বা ইউটিলিটি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে একটি সংস্থার বিলম্ব পুরো প্রকল্পের গতিকে থামিয়ে দিতে পারে।
এই সমস্যাগুলো সমাধানে বাংলাদেশকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না, কারণ বেশ কিছু নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ইতিমধ্যে বিদ্যমান। সরকারের পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট রিফর্ম স্ট্র্যাটেজি ২০২৫-২০৩০-এ সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ, প্রকল্প প্রস্তুতি ও তদারকির দুর্বলতা এবং ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনও সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাতেও সংস্কার আনা হয়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫-এর মাধ্যমে ই-জিপিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে, যার ফলে স্বচ্ছতা ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ বেড়েছে। সুতরাং, মূল সমস্যাটি নিয়মের অভাব নয়, বরং বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান নিয়ম ও নির্দেশিকাগুলো প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কতটা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বড় প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত ব্যয়, নির্ধারিত ও সংশোধিত সমাপ্তির সময় এবং বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা উচিত। বড় ধরনের ব্যয় বা সময় বৃদ্ধি হলে তার কারণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। যেখানে সমস্যা এড়ানো সম্ভব ছিল, সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রকল্প পরিচালনা এবং ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর প্রকল্প অর্থায়ন এবং তার যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য আরও সংবেদনশীল হবে। উত্তরণের সাথে সাথেই সব ধরনের স্বল্প সুদের উন্নয়ন অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের ঋণের শর্ত মাথাপিছু আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং ঋণের টেকসই অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
তবে বাংলাদেশের আয় ও অর্থায়নের অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশকে ধীরে ধীরে কম রেয়াতি এবং বাজারভিত্তিক অর্থায়নের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। এতে সুদের হার বাড়বে এবং ঋণ পরিশোধের শর্তগুলো হবে আরও কঠিন। ফলে কোন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, কোন কাজগুলো অগ্রাধিকার পাবে?
প্রথমত, সঠিক প্রকল্প বাছাই এবং অনুমোদনের আগে পূর্ণ প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই, বিস্তারিত নকশা, জমির প্রয়োজন, পরিবেশগত বিষয়, অর্থায়ন এবং ক্রয় পরিকল্পনা যথেষ্ট প্রস্তুত না হলে বড় প্রকল্প অনুমোদন করা উচিত নয়। শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নতুন প্রকল্পের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে গুরুত্বপূর্ণ চলমান প্রকল্প শেষ করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সীমিত অর্থ অনেক প্রকল্পে ছড়িয়ে না দিয়ে উচ্চ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফলসম্পন্ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কম গুরুত্বপূর্ণ, দুর্বলভাবে প্রস্তুত বা দীর্ঘদিন অকার্যকর প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।
তৃতীয়ত, প্রকল্প ও চুক্তি ব্যবস্থাপনাকে আরও পেশাদার করতে হবে। বড় প্রকল্পে যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাসম্পন্ন দল থাকতে হবে। প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ঘন ঘন পরিবর্তনও এড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঠিকাদার ও পরামর্শকদের আগের কাজের মান, সময়ানুবর্তিতা ও চুক্তি বাস্তবায়নের রেকর্ড সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ কাজ দেওয়ার সময় তা বিবেচনা করা উচিত।
চতুর্থত, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত করতে হবে। জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং বিভিন্ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোন সংস্থা কখন কী করবে, তা প্রকল্প শুরুর আগেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বড় প্রকল্পে সমন্বয় সমস্যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পঞ্চমত, ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বড় প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত ব্যয়, নির্ধারিত ও সংশোধিত সমাপ্তির সময় এবং বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। বড় ধরনের ব্যয় বা সময় বৃদ্ধি হলে তার কারণ মূল্যায়ন করতে হবে। যেখানে সমস্যা এড়ানো সম্ভব ছিল, সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রকল্প পরিচালনা ও ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে।
সবশেষে, নতুন নিয়ম তৈরির চেয়ে বিদ্যমান নীতি ও নিয়মের কার্যকর প্রয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রকল্প মূল্যায়ন, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, ক্রয় এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের অনেক ব্যবস্থা ইতিমধ্যে রয়েছে। এখন প্রয়োজন এগুলোর ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং প্রকল্পের ফলাফলের সঙ্গে জবাবদিহিকে যুক্ত করা।
বাংলাদেশে আরও অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তবে সামনে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা এবং ঋণ নেওয়া প্রতিটি ডলার থেকে আরও বেশি উন্নয়ন সুফল নিশ্চিত করা।
— ফাহমিদা খাতুন, অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)