সরকারি চাকরির বাজারে নবম ও দশম গ্রেডের পদগুলো বরাবরই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধরন বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, সাধারণ স্নাতক ডিগ্রিধারীদের তুলনায় বিশেষায়িত বা কারিগরি ডিগ্রিপ্রাপ্তদের জন্য এই দুই গ্রেডে নিয়োগের সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন বড় সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রবণতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশেষায়িত ৫১তম বিসিএস (স্বাস্থ্য), পেট্রোবাংলা, ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, বর্তমানে টেকনিক্যাল, মেডিক্যাল, প্রকৌশল ও আইটি ডিগ্রিধারীদের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।
২০২৬ সালের সরকারি নিয়োগের তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডাক্তারদের জন্য ঘোষিত ৫১তম বিশেষ বিসিএস। এই বিশেষায়িত বিসিএসের আওতায় সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) পাঁচ হাজার সহকারী সার্জন ও সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে সরাসরি নবম গ্রেডে নিয়োগ প্রদান করছে। স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের শূন্য পদ পূরণ এবং দক্ষ চিকিৎসকদের ক্যাডার সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
অন্যদিকে, জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা পেট্রোবাংলা এবং এর অধীনে থাকা ১২টি কোম্পানিতে ১৯টি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ৭৫৩ জন কর্মকর্তা নিয়োগের একটি বড় বিজ্ঞপ্তি চলমান রয়েছে। আগ্রহী প্রার্থীদের ১৮ অক্টোবর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগের মধ্যে নবম গ্রেডের ১ থেকে ১২ নম্বর পদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪,০০০–১,০৫,৯০০ টাকা এবং দশম গ্রেডের ১৩ থেকে ১৯ নম্বর পদের বেতন স্কেল রাখা হয়েছে ৩২,০০০–৭৭,৩০০ টাকা।
ব্যাংক খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির (বিএসসি) অধীনে অগ্রণী, সোনালী ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় ৩২০টি বিশেষায়িত পদ খোলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিনিয়র অফিসার (আইটি), অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ও অফিসার (আইটি/এমআইএস) পদ। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অধিদপ্তর, রেলওয়ে এবং শক্তি সম্পদ খাতের বিভিন্ন নবম ও দশম গ্রেডের সার্কুলারেও টেকনিক্যাল দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সরকারি চাকরির সুযোগের পাল্লা এখন বিশেষায়িত ডিগ্রিধারীদের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। ৫১তম বিশেষ বিসিএসের পাঁচ হাজার পদের পুরোটাই এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারীদের জন্য সংরক্ষিত। একইভাবে পেট্রোবাংলার ৭৫৩টি পদের মধ্যে প্রায় ৫৮৩টি পদই ভূতত্ত্ব, রসায়ন, পরিবেশ, আইন, কেমিক্যাল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সিভিল, সিএসই ও পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিষয়ের স্নাতকদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির বিশেষায়িত ৩২০টি পদের সবকটিতেই কম্পিউটার সায়েন্স, আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের চাওয়া হয়েছে।
তবে সাধারণ বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করা প্রার্থীরা পুরোপুরি সুযোগহারা হননি। পেট্রোবাংলায় সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও সহকারী কর্মকর্তা (প্রশাসন) মিলিয়ে ১৭০টি পদ সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার প্রার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির অধীনে ৯টি ব্যাংক ও ২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নবম গ্রেডের ‘সিনিয়র অফিসার (সাধারণ)’ পদে ৯০৩টি এবং ৭টি ব্যাংক ও ২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দশম গ্রেডের ‘অফিসার (সাধারণ)’ পদে ৭২৫টি শূন্যপদে যেকোনো বিষয়ের স্নাতকেরা আবেদনের সুযোগ পাচ্ছেন। বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় সাধারণ পদের বিজ্ঞপ্তিতেও প্রশাসনিক দক্ষতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সাধারণ পদগুলোতে আবেদনের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে ২১ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টি আবেদন জমা পড়েছিল। এমনকি ১৬তম গ্রেডের ৩১২টি ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদের জন্যই আবেদন ছিল ১২ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। অন্যান্য সাধারণ নিয়োগেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি পদের জন্য গড়ে হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন।
শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষিত বেকারদের একটি বড় অংশই সাধারণ মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ থেকে স্নাতক পাস করা শিক্ষার্থী। তাঁদের তুলনায় কারিগরি, প্রকৌশল ও মেডিক্যাল ডিগ্রিধারী স্নাতকদের সরকারি ও আধা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট এবং সংরক্ষিত। এই তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে বিশেষায়িত ডিগ্রিধারীরা নিজেদের খাতের সার্কুলারগুলোতে তুলনামূলক কম প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই করে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি পাচ্ছেন।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালে নবম ও দশম গ্রেডের চাকরিতে ইতিবাচক প্রবাহ থাকলেও, কেবল সাধারণ ডিগ্রি দিয়ে সেই সুযোগ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা যাঁদের রয়েছে, সরকারি চাকরির এই বিশাল বিজ্ঞপ্তিতে তাঁদের সাফল্যের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।