পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গিয়েছেন মাওলানা নাসরুল্লাহ বদরপুরি (৩৫)। তবে পবিত্র মক্কায় পৌঁছানোর আগেই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। তাঁর এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে তাঁর পরিবার।
নাসরুল্লাহ কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামের ওলামাবাড়ির বাসিন্দা। তিনি মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ ও জাহানারা বেগমের চার ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তৃতীয় সন্তান। পেশায় তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক; রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় অবস্থিত জামিয়া আরাবিয়া রবিউল উলুম মাদ্রাসায় সহকারী প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তাঁর সুখী সংসার ছিল।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে আজ রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ২০ মিনিটে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের টার্মিনাল-৩–এর ওপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে। সেই মুহূর্তে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অনেক যাত্রী সেখানে অবস্থান করছিলেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় দুই বাংলাদেশিসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহত বাংলাদেশিদের একজন হলেন মাওলানা নাসরুল্লাহ এবং অপরজন বগুড়ার বাসিন্দা মো. শাহেদ আহম্মেদ।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন নাসরুল্লাহ। প্রথমে তিনি রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে তাঁর গন্তব্য ছিল জেদ্দা, যেখান থেকে তিনি পবিত্র মক্কায় গিয়ে ওমরাহ পালন করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু রিয়াদের বিমানবন্দরে ট্রানজিটের সময়ই ঘটে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
নাসরুল্লাহর ভগ্নিপতি মাওলানা মো. নাসির উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে জানান, রিয়াদের বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটির দুই ঘণ্টার ট্রানজিট ছিল। সেখান থেকে তাঁর জেদ্দায় যাওয়ার কথা ছিল। ট্রানজিট শেষ করে বোর্ডিং পাস নিয়ে যখন তিনি উড়োজাহাজে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে উড়োজাহাজে ওঠার সুযোগ পাননি তিনি।
ছেলের ওমরাহ পালনের সফরটি মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহর কাছে ছিল অত্যন্ত আনন্দের। কিন্তু সেই আনন্দময় সফর যে এমন গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। ছেলের মৃত্যুর খবরে বিলাপ করছেন বাবা-মা। একদিকে সন্তান হারানোর তীব্র বেদনা, অন্যদিকে প্রিয় সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দীর্ঘ অপেক্ষা। নাসরুল্লাহর বাবার আকুতি, অন্তত একবার যেন তিনি তাঁর ছেলের মুখটি দেখতে পারেন।
মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, “আমার ছেলেটা আল্লাহর ঘরে গিয়েছিল। কিন্তু সে ওমরাহটা করতে পারেনি। তার এমন মৃত্যু আমরা কখনো কামনা করিনি। কত নির্মমভাবে আমার ছেলেটা মারা গেছে, আল্লাহ ভালো জানেন। হয়তো আল্লাহপাক তাকে এভাবেই কবুল করেছেন।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাসরুল্লাহর বাবা আরও বলেন, “আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত আমার ছেলের লাশ যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। আমার আদরের সন্তানকে একবার দেখতে চাই।”
নাসরুল্লাহ তাঁর স্ত্রী মাহবুব আক্তার ও সন্তানদের নিয়ে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাঁদের সংসারে সাত বছর বয়সী ছেলে জামিল হাসান, পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে নাবিলা আক্তার ও দুই বছর বয়সী ছেলে মো. জাওয়াদ রয়েছে। নাসরুল্লাহর অকাল মৃত্যুর পর স্ত্রী ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে তাঁরা বদরপুর গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন।