ভারতের মণিপুর রাজ্যের পাহাড়ি জেলাগুলোতে নতুন করে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গত শুক্রবার রাত থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বিভিন্ন এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত নয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই সহিংসতায় ১৪টি বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। রাজ্যের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাজ্যে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় শুক্রবার রাতে কামজং জেলার চাসাদ গ্রামে। সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে কথিত গোলাগুলির ঘটনায় কুকি সম্প্রদায়ের ডমখোনেই তোথাং নামের এক নারী নিহত হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের দেওয়া তথ্যানুসারে, চাসাদ গ্রামে অবৈধ বাংকার উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে মণিপুর পুলিশ, ইন্ডিয়া রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি) এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা একটি যৌথ অভিযান পরিচালনা করেন। পুলিশ দাবি করেছে, ওই সময় স্থানীয় নারীরা এই অভিযান ব্যাহত করার চেষ্টা করেন এবং অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এর জবাবে পাল্টা গুলি চালায় নিরাপত্তা বাহিনী।
সেই রাতেই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা বেশ কিছু বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। পরবর্তীতে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে পুনরায় গোলাগুলি শুরু হয়। এই সংঘাতের ফলে নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মোট ১৪টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চাসাদ গ্রামের স্বেচ্ছাসেবকদের গ্রেপ্তার ও আটকাদেশের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালীন রাত সাড়ে নয়টার দিকে এই সহিংসতা শুরু হয়। কুকি উইমেন ইউনিয়নের দাবি, "এ ঘটনায় ২৩ বছর বয়সী মাইকেল গামিনলেন হাওকিপ নামের এক তরুণও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নাগা বিদ্রোহীরা তাঁকে হত্যা করেছেন।"
গতকাল শনিবার সকালে রাজ্যে পুনরায় সহিংসতা শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে, অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা চাসাদ থানায় আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন। ভোর পাঁচটার দিকে পুনরায় গোলাগুলি শুরু হয়, যা সকাল সাতটা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে কামজং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থানার চারপাশের ৪০০ মিটার এলাকায় মানুষের জড়ো হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
কামজং জেলার আরেকটি পৃথক ঘটনায় দুই নাগা গ্রামরক্ষক নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন ৩০ বছর বয়সী গাচানসো নিংশেন এবং ৫০ বছর বয়সী লেইশিশান হুঙিয়ো। তাঁরা উভয়েই নিংচৌ গ্রামের বাসিন্দা। গতকাল সকাল সাড়ে নয়টার দিকে চাসাদের প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নিংচৌ চিনডং গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। সরকারি সূত্রগুলোর মতে, সীমান্তের ওপার থেকে তৎপর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই ঘটনার পেছনে জড়িত থাকতে পারে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি।
এর আগে গতকাল ভোর পাঁচটার দিকে মাকুই গ্রামে এক হামলায় তিন নাগা গ্রামরক্ষক নিহত হন। অভিযোগ উঠেছে, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠী তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছে। নিহতরা হলেন মাচুংগাম্মাম, আজিনপৌ রিংকাংমাই ও রবার্ট।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, "নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আজিনপৌ রিংকাংমাইয়ের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে।"
avigator সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নৃশংসতার ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত ওই এলাকায় গুলিবর্ষণ চলছিল, যার ফলে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।
গতকাল সকাল ছয়টার দিকে কাংপোকপি জেলার তাপোন গ্রামেও হামলার ঘটনা ঘটে। মাকুই গ্রামের কাছে ইম্ফল-তামেংলং সড়কে সন্দেহভাজন সশস্ত্র কুকিদের অতর্কিত হামলায় এক নাগা গ্রাম স্বেচ্ছাসেবক নিহত এবং দুজন আহত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহত ব্যক্তির নাম মাচুংওয়াংবৌ (৩৫), তিনি থালোন গ্রামের বাসিন্দা। আহতরা হলেন নাহাসন (২৯) ও মাথাংগামবৌ (৩০)। ওই এলাকায় দুপুর পর্যন্ত গোলাগুলি অব্যাহত ছিল।
অন্যদিকে, উখরুল জেলার কনজাং গ্রামের কাছে ২০২ নম্বর জাতীয় মহাসড়কে এক অতর্কিত হামলায় সন্দীপ রাই (৩০) নামের এক যাত্রী নিহত হয়েছেন। তিনি সেনাপতি জেলার তাফৌ সেনাপতি নেপালি গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে গাড়িতে করে যাওয়ার সময় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাঁর ওপর হামলা চালান। তবে হামলার উদ্দেশ্য এবং হামলাকারীদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও উদ্যোগের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।