বাংলাদেশের ক্রিকেটে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব তাঁর। হয়ে উঠেছেন গতির সমার্থক। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গতিময় বোলারের উঠে আসার গল্প ও তাঁর ক্রিকেট–দর্শন নিয়ে কথা বলতে নাহিদ রানার সঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাঁর ক্রিকেট–জীবন শুরুর দিকের কোচ আলমগীর কবিরকেও। ‘সঙ্গে উৎপল শুভ্র’ নামে সেই পডকাস্ট শনিবার রাতে পাবলিশ হয়েছে মুক্তকণ্ঠের ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে। সেটির লিখিত রূপ কয়েকটি পর্বে প্রকাশিত হচ্ছে ওয়েবসাইটে। এখানে থাকল প্রথম পর্ব।
‘সঙ্গে উৎপল শুভ্র’র আরেকটি পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি উৎপল শুভ্র। আজ আমার অতিথি বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্রুততম বোলার। নাম না বললেও আপনারা অনুমান করে ফেলেছেন, লোকটি কে। তাঁর নাম নাহিদ রানা। নাহিদ রানা, আপনাকে আমার অনুষ্ঠানে স্বাগত। নাহিদ রানার পাশে যিনি বসে আছেন, তিনিও বাংলাদেশের পক্ষে টেস্ট খেলেছেন। আমি তাঁর খেলা অনেক কাভার করেছি। আলমগীর কবিরকে এখানে আনার কারণ এই নয় যে উনি তিনটা টেস্ট খেলেছেন। কারণ হলো, উনি নাহিদ রানার ছেলেবেলার কোচ। সেই ছেলেবেলা অবশ্য বেশ বড় বেলা, ১৮ থেকে ১৯ বছর বয়সে, তাই না? আলমগীর কবির, আপনাকে যদি মনে করতে বলি, নাহিদ রানাকে প্রথম যেদিন দেখলেন...এটা নিয়ে আপনি অনেক জায়গায় কথা বলেছেন। অনেক সময় এমন হয় না যে একটা কথা বলার পর মনে হয়, না না, আমি তো আসলে এর আগের দিন দেখেছিলাম? নাহিদ রানাকে প্রথম দেখার স্মৃতি।
আলমগীর কবির: না, প্রথম দেখার কথাই বলছি। প্রথম দেখা হয়েছিল মহিলা কমপ্লেক্সে। সেটা আমার কাছে আশ্চর্যজনক ছিল।
ঢাকা মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে?
আলমগীর কবির : না না, আমাদের রাজশাহীর মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে। বিষয়টা আমার জন্য আশ্চর্যজনক ছিল। তাকে পাওয়াটা আমার জন্য সৌভাগ্যের ছিল। তখন ভাবিনি যে নাহিদ রানাকে ঠিক এভাবে পাব। ওই সময় যখন নাহিদ রানাকে পেয়েছি, সে পুরো র বললেই চলে। সবাই যেভাবে বলে, র প্লেয়ার পেয়েছি, তাকে রেডি করতে সুবিধা হবে, বোঝাতে সুবিধা হবে। ঠিক এভাবেই নাহিদ রানাকে পাওয়া ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে। আমরা সবাই মিলে তখন ওখানে একটা ক্রিকেট ম্যাচ খেলছিলাম। ওখানকার কোচ বা প্লেয়ারদের মধ্য থেকে আমাদের একটা বোলার দরকার ছিল। সেভাবেই নাহিদ রানাকে পাওয়া। তারপরের গল্প না হয় পরে বলি।
নাহিদ রানার প্রসঙ্গে আসার আগে আপনাকে এই প্রসঙ্গে আরেকটু এলাবোরেট করতে বলব। সেটা হচ্ছে র নাহিদ রানা। নাহিদ রানা, আপনাকেও কিন্তু অনেক প্রশ্ন করা হবে, ভাববেন না যে শুধু স্যারকেই প্রশ্ন করছি। স্যারের কাছে আগে শুনে নিই। ‘র’-এর সঙ্গে আরেকটা শব্দ মানুষের মুখে খুব চলে আসে, সেটা হচ্ছে র পেস। যেটা আসলে আপনি কখনো তৈরি করতে পারেন না। আপনি নিজে পেস বোলার ছিলেন। আপনি লাইন-লেন্থ শেখাতে পারবেন, ইনসুইং-আউটসুইং শেখাতে পারবেন, বাউন্সার দেওয়া শেখাতে পারবেন। কিন্তু পেস জন্মগত। কেউ কেউ সেই ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। নাহিদ রানাকে দেখে ডেফিনেটলি আপনাকে সেটাই বোধ হয় স্ট্রাইক করেছিল যে এ তো অনেক জোরে বল করে, তাই না? সেটা কি একটু বলবেন, ওর সঙ্গে যারা ছিল, ক্লেমন একাডেমির অন্য বোলাররা, তাদের তুলনায় কতটা জোরে আসলে?
আলমগীর কবির: নাহিদ রানা এতটাই জোরে বল করত যে ওখানে আমরা যারা খেলছিলাম, মেইন উইকেটকিপার যে ছিল, তার ওর বল ধরতে সমস্যা হচ্ছিল। আমি তখন লাইনে, মানে পাশে ফিল্ডিং করছিলাম। ওরা বল ধরতে না পারলে আমি বললাম, তাহলে আমি ধরে দেখি। আমি নিজে উইকেটকিপিংয়ে গিয়ে দেখতে চাইলাম, কেন ধরতে পারছে না। আমি দুটো বলই মিস করলাম।
আপনি তো উইকেটকিপার ছিলেন না। মিস করারই কথা।
আলমগীর কবির: ছিলাম না, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, আমি তো ভালো ফিল্ডিং করতাম, তাহলে গ্লাভস নিয়ে ধরে দেখি না, কতটা জোরে আসে আর কেন ধরতে পারছি না। বল বাউন্ডারি হয়ে যাচ্ছিল, বাই বাউন্ডারি। তখন বলটা যখন ধরলাম, বুঝলাম, এর ভেতরে কিছু একটা আছে। আপনি কিছুক্ষণ আগে যেটা বললেন, কোনো কোচ কখনো কোনো পেস বোলারের পেস বাড়াতে পারে না, এটা সত্যি কথা। সেই জিনিসটাই আমি ওর মধ্যে পেয়েছিলাম। এত জোরে পেস, এটা তো প্রায় অসম্ভব। একে নিয়ে যদি আমি স্কিল আর বাকি যেসব কাজ আছে, সেগুলো করি, তাহলে হয়তো নাহিদ রানার মাধ্যমে কিছু একটা হবে।
এবার একটু নাহিদ রানার কাছে আসি। আপনার পেস বোলিং, এখন পর্যন্ত যা অ্যাচিভ করেছেন, যা করতে চান, এসব নিয়ে আমরা আস্তে আস্তে আলাপ করব। যেহেতু আপনাদের দুজনকে পাশাপাশি বসিয়েছি, আপনার এই ইন্টারভিউটা একা না করার পেছনে আমার একটা উদ্দেশ্য আছে। আমি চাই, আপনারা দুজন মিলে আজ থেকে চার-পাঁচ-ছয় বছর আগের একটা সময়ে ফিরে যান। ওই স্মৃতিগুলো তো আর কোনো দিন হবে না। আপনার ওই সময়কার কোচ আর কেউ হতে পারবে না, পৃথিবীতে যত বড় কোচই আসুক। একইভাবে আলমগীর কবিরেরও সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র আপনি…ওহ আচ্ছা, শরীফুলও তো আছেন। শরীফুল মনে হয় নাহিদের একটু কম্পিটিটর, না? বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে ওরা দুজন।
আলমগীর কবির: দুজনই ভালো, এটাই বলতে হবে। আমার কাছে দুজনই সমান, কারণ আমি তো বাবা-মায়ের মতো। দুজনই ভালো। তবে এটা আমার চেয়ে মনে হয় আমার ওয়াইফ ভালো বলতে পারবে।
কে আপনার বেশি প্রিয়?
আলমগীর কবির: না, কে প্রিয়, সেটা না। আপনি কম্পিটিটর যেটা বলছেন, সেটাও আমার চেয়ে আমার ওয়াইফ ভালো বলতে পারবে। তবে কোন সময় কী হয়, কার সঙ্গে মন খারাপ হয়ে আছে এখন, এই মুহূর্তে হয়তো আমার ওয়াইফ আমাকে বলতে পারবে।
ইশ্, আপনি আমাকে আগে বললে তো ভাবিকেও এখানে আসতে বলতাম।
আলমগীর কবির: হয়তো আমার ওয়াইফ ভালো বলতে পারবে।
শরীফুলের কথাটা আসল এই কারণে যে আলমগীর কবির নাহিদ রানার কোচ হিসেবে এখানে এসেছেন। আলমগীর কবিরের আরেকজন বিখ্যাত ছাত্র শরীফুল ইসলাম বাংলাদেশ জাতীয় দলেও খেলেন। আসলে নাহিদ রানার আগেই বোধ হয় খেলেছেন। এ জন্যই কথাটা বললাম যে শরীফুল ও নাহিদ রানা এখন পর্যন্ত আলমগীর কবিরের সবচেয়ে বিখ্যাত দুই ছাত্র। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই আরও অনেকে আসবেন। নাহিদ, স্যারকে প্রথম দেখার স্মৃতি? স্যার কেমন মানুষ? প্রথম দিকে কী মনে হয়েছিল, পরে কী মনে হয়েছে?
নাহিদ রানা: স্যারের বিষয়ে বলি। আমি যখন প্রথম এক মাস প্র্যাকটিস করছি, তখন স্যার প্রিমিয়ার লিগের জন্য ঢাকা এসেছিলেন। আমি তখন নতুন নতুন প্র্যাকটিসে এসেছি। আমার মাইন্ড ছিল জাস্ট নরমাল, প্র্যাকটিস করব, নিজের ভেতরে আসলে অ্যাবিলিটি কী আছে, সেটা দেখব। সবাই আমাকে বলত, আলমগীর স্যার তোমাকে দেখলে তোমাকে নিয়ে প্র্যাকটিস করাবেন, তোমাকে নিয়ে কাজ করবেন। তখন শুনতাম, স্যার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে ঢাকায় এসেছেন। তো ঢাকা থেকে তিনি
আপনি তখন রাজশাহীতে?
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, আমি তখন রাজশাহীতে ক্লেমনে প্র্যাকটিস করি। স্যারের অপেক্ষায় আছি, স্যার ঢাকা থেকে ফিরবেন। স্যার এলে তখন স্যারের সঙ্গে কথা হবে। পরে যখন শুনলাম, স্যারের বাসা চাঁপাইয়ে, তখন স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। প্রথমে স্যার আমার বল দেখেছেন। স্যার যেটা বললেন, মহিলা কমপ্লেক্সে ওখানে টেপ টেনিস বলে খেলা হচ্ছিল। টেপ টেনিস বলে খেলা হচ্ছিল, তাই সবার টিমে বোলার লাগবে। স্যারদের টিমে বোলার ছিল না। স্যারদের টিমে আরেকজন কোচ ছিলেন, তিনি স্যারকে বললেন, আপনার এলাকার একজন নতুন বোলার আছে। স্যার বললেন, ঠিক আছে, তাহলে আমাদের টিমে নাও। স্যারদের টিমে নেওয়ার পর স্যার যেটা বললেন, দু-তিনটা বল অন্য কেউ ধরতে পারল না, ধরতে অসুবিধা হয়েছে, পরে স্যার উইকেটকিপিংয়ে এলেন, আমি বোলিং করলাম। সেখান থেকেই স্যারের সঙ্গে আমার যাত্রা শুরু। ক্রিকেট বলে স্যারের সঙ্গে কাজ করা বলুন, কিংবা আমার লাইফের শুরু বলুন, স্যারের সঙ্গে সম্পর্কের শুরু বলুন, কিংবা ক্রিকেটে হাতেখড়ি বলুন, সবকিছু সেখান থেকেই।
এখন তো আপনি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটার। সারা পৃথিবী আপনার নাম জানে। এটা একটু বাড়িয়ে বলা নয়। দুনিয়ার কেউ বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটারের নাম জানলেও সেটা মোটামুটি নাহিদ রানারই, গত দেড়-দুই বছর ধরে। অনেক কোচের সান্নিধ্যে আপনি এসেছেন। এখনো কি কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা বা মেন্টালি কোনো ইস্যু থাকলে আপনি স্যারের কাছে যান?
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি মনে করি, একটা গাছ যতই ওপরে যাক, তার শিকড় কখনো ভোলা উচিত না। এটা ম্যান টু ম্যান ভ্যারি করে, কিন্তু আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, আপনি যতই ওপরে যান, শিকড় কখনো ভোলা উচিত না। তাই ক্রিকেটে আমার যখনই কোনো কিছু মনে হয়, আমার অসুবিধা হচ্ছে বা কিছু চেঞ্জ হচ্ছে, তখন অবশ্যই আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলি। স্যার বাইরে থাকলে ফোনে কথা বলি। সব সময়ই ওনার সঙ্গে আমার কথা হতে থাকে।
এটা কি শুধু এ জন্য যে আপনি অনেক বড় হয়েছেন, এখন স্টার, তবু ছেলেবেলা ভোলেননি? সেটা একটা ব্যাপার। আরেকটা হলো, উনি আপনাকে যেমন বুঝতে পারবেন, কারণ আপনার আস্তে আস্তে নাহিদ রানা হয়ে ওঠাটা দেখেছেন। অনেক কিছুই উনি জানেন, আপনি কোনটাতে ক্লিক করেন, কোনটাতে আপনার মন খারাপ হয়। এটা তো ফাইনালি একটা মেন্টাল গেমও। আপনি মেন্টালি কেমন ফিল করছেন, ওটা কি একটা বড় ব্যাপার, আলমগীর? আপনি হয়তো টেলিভিশনে নাহিদ রানার খেলা দেখছেন, বুঝতে পারছেন যে ওর এই সমস্যাটা হচ্ছে। সব সময় এটা টেকনিক্যাল না–ও হতে পারে। ওর ক্যারিয়ারে, ধরুন, প্রায় দুই বছরের মতো, ২০২৪ সালে ডেব্যু, এই দুই বছরের মধ্যে এমন কি হয়েছে যে আপনি টেলিভিশনে খেলা দেখছেন, ও বল করছে, সেটা মিরপুরে হোক, রাওয়ালপিন্ডিতে হোক বা বাইরে কোথাও, আর আপনার দেখে মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, এভরিথিং ইজ অল রাইট, অথবা সামথিং রং, এটা ওর হয়তো ঠিক করা দরকার? আপনি ফোন করে বলছেন, এ রকম হয়?
আলমগীর কবির: না, যেটা বললেন, টেকনিক্যাল যেগুলো বলছেন, ঠিক আছে। কিছু জিনিস আছে, যেগুলোতে আমার মনে হয়েছে, এই টাইমে যদি এই লেন্থে বোলিং করত, তাহলে রিভার্স সুইং আরও বেশি ভালো হতে পারত। যেটা আপনারা বোল্ড দেখেছেন, পাকিস্তানের যে ব্যাটসম্যান লিভ করে বোল্ড হলো।
রিজওয়ান। মোহাম্মদ রিজওয়ান।
আলমগীর কবির: হ্যাঁ, ওই লেন্থটা। মাঝে মাঝে মনে হয়, রিভার্সের সময় যদি এ রকম লেন্থে বোলিং করে, তাহলে ব্যাটসম্যান পরাস্ত হবে। তখন এসব জিনিস নিয়ে ওর সঙ্গে কথা হয়। মাঝে মাঝে বলি, খুব ভালো বল হয়েছে, তবে আরেকটু ওপরে করলে মনে হয় প্রত্যেক ব্যাটসম্যানের জন্যই ডিফিকাল্ট হবে। এই জিনিসগুলো নিয়ে ওর সঙ্গে কথা হয়, ডিসকাস হয়ে থাকে।
ওপরে করলে তো ব্যাটসম্যানদের আউট হয়ে যাওয়ার ভয়, আবার একটু পেছনে করলে অন্য ভয় আছে। ও তো ওটাও খুব ভালো পারে। বাউন্সারটা তো ভালো পারে।
আলমগীর কবির: হ্যাঁ, পেছনে করলে যে ভয় আছে, সেটা তো ব্যাটসম্যান পাবেই, ঠিক আছে। কিন্তু উইকেট তো নিতে হবে। এই বিষয়টা নিয়ে মাঝে মাঝে কথা হয়।
না, এটা আমি দুষ্টুমি করে বললাম। ব্যাটসম্যানরা বলে, ওপরেই কর ভাই, আউট হয়ে যাই, তা-ও ভালো, বাউন্সার দেওয়ার চেয়ে। আপনার কোনটা পছন্দ, ইয়র্কার না বাউন্সার?
নাহিদ রানা: আসলে শুরুতে যখন এসেছিলাম, তখন বাউন্সার মারতে ভালো লাগত। কিন্তু এখন সব সময় সিচুয়েশন ডিমান্ড অনুযায়ী বোলিং করতে ভালো লাগে। কারণ, যেকোনো একটা জিনিস প্র্যাকটিস করে বোলিং করা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে হয় না যে আমার এই জিনিসটা ভালো লাগে। হ্যাঁ, একটা চয়েস থাকে, আমার বাউন্সার মারতে ভালো লাগে, এটা নরমাল জিনিস। কিন্তু একটা জিনিসই আমি করে যাব, এটা কখনো হয় না। তাই সিচুয়েশন ডিমান্ড অনুযায়ী, টিম প্ল্যান অনুযায়ী, মূল কথা হচ্ছে প্ল্যান করা।
কিন্তু শুরুর দিকে তো বোধ হয়...আমি যেটা বললাম, বাংলাদেশে এত জোরে বল করা বোলার কেউ আসেননি। আলমগীর, আপনাকে যদি বলি, আমি যখন খেলা কাভার করা শুরু করলাম বা দেখা শুরু করলাম, হাসিবুল হোসেন শান্ত একটা সময় বাংলাদেশের ফাস্টেস্ট বোলার ছিলেন। সজল চৌধুরী কিছুদিনের জন্য, এখন বোধ হয় কোচ। এরপর মাশরাফি যখন শুরু করলেন, হি ওয়াজ ভেরি ফাস্ট। তখন তো স্পিডোমিটার ছিল না, আমরা অনুমান করি ১৪০-এর কাছাকাছি হবে হয়তো। এরপর আমি ওই জেনারেশনের কথা বলছি। রানা, আপনার তো রেকর্ডই আছে, অন রেকর্ড ফাস্টেস্ট বল ঘণ্টায় ১৫২ কিলোমিটার। বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত আপনার চেয়ে জোরে কেউ বল করেননি। এত পেস নিয়ে বাংলাদেশের একজন বোলার আসছে। মাশরাফির ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিল, বাংলাদেশের একটা বোলার প্রথমে জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে, এটা অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ারদের জন্য একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। আমি যে কারণে এই কথাটা বলছি, ওই সময় আমার এত পেস, আমি বাউন্সার দিলে একটা ব্যাটসম্যান নরমালি ফ্রন্ট ফুটে গিয়ে খেলে বাংলাদেশের বোলারদের। সেই ব্যাটসম্যানই যখন এ রকম এ রকম করছে, ওটার তো একটা মজা আছে। ওই নেশাটা বোধ হয় শুরুর দিকে থাকে, তাই না?
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, অবশ্যই। এটা প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ম্যান টু ম্যান ভ্যারি করে, কারণ বোলাররা একেকজন একেক রকম চিন্তা করে। চিন্তার ওপর ডিপেন্ড করে একেক বোলারের মাইন্ডসেট। আমার কাছে মনে হয়, শুরুতে এটা আমার ভালো লাগত। কিন্তু যখন আপনি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে চলে আসবেন, তখন পেসের চেয়ে স্কিল আর লাইন-লেন্থ, এই দুটো বেশি ম্যাটার করে। পেস অবশ্যই ম্যাটার করে, কিন্তু লাইন-লেন্থ ঠিক না থাকলে সেই পেস কাজে আসে না। ওয়ার্ল্ড ক্লাস ব্যাটসম্যানদের দেখলে বুঝবেন, ওদের কাছে পেস অতটা ম্যাটার করে না, যতটা ম্যাটার করে লাইন অ্যান্ড লেন্থ। কিছু ব্যাটসম্যান আছে, যাদের আপনি পেস দিয়ে ডমিনেট করতে পারবেন। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ক্লাস ব্যাটসম্যানের সামনে গেলে পেসের চেয়ে আপনার স্কিল, মাথার খেলাটা জরুরি। তাই আমার কাছে মনে হয়, পেস তো আছেই, কিন্তু পেসের সঙ্গে লাইন-লেন্থটা ইম্পর্ট্যান্ট।
একদম ঠিক কথা। সেটা কি আপনি প্রথম যে টেস্ট খেললেন, ২০২৪ সালের মার্চে সিলেটে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে…১৪ ওভার, ২ মেডেন, ৮৭ রানে ৩ উইকেট। ২০ ওভার, ১ মেডেন, ১২৮ রানে ২ উইকেট। ডেব্যুতে দুই ইনিংস মিলে ৫ উইকেট, খারাপ না। কিন্তু প্রথম ইনিংসে ইকোনমি রেট ৬.২১, দ্বিতীয় ইনিংসে ৬.৪। আমি এই টেস্টে লিখেছিলাম, ওয়েস্ট ইন্ডিজে কেউ যখন এ রকম অনেক জোরে বল করে কিন্তু লাইন-লেন্থ ঠিক থাকে না, তাকে বলে ‘দ্য ওয়াইল্ড থিং’, মানে বন্য একটা জিনিস। ওই টেস্টে আপনাকে দেখে মনে হয়েছিল, দু-একটা বল শ্রীলঙ্কার জন্য ভালোই ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওদের দুজন জোড়া সেঞ্চুরি করে ফেলেছে। ওই টেস্টও মনে হয় আপনাকে প্রথমেই এই জিনিসটা ভালো করে শিখিয়ে দিয়েছিল যে শুধু পেস দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে সফল হওয়া যায় না। ওই টেস্টের কথা কি মনে পড়ে আপনার?
নাহিদ রানা: সত্যি কথা বলতে, ওই টেস্ট খেলার পর আমি নিজেকে নিয়ে অনেক চিন্তা করতাম। অনেক সিনিয়র ভাই অনেক কথা বলতেন। কিন্তু অনেকে যখন অনেক কথা বলেন, তখন কনফিউশন হয়ে যায়। আর উনি যে কথাটা বলছেন, হয়তো আমার এজটা পার করে গেছেন, উনি ফেল করেছেন, এ জন্য আমাকে বলছেন। হয়তো আমি ওই জিনিসটা তখন বুঝছিলাম না, কারণ আমার বয়সটা ওই লেভেলের ছিল, ম্যাচিউরিটিটা আসেনি। কিন্তু ডে বাই ডে, এখন থেকে দুই বছর পেছনের কথাগুলো যখন মনে পড়ে, তখন মনে মনে বলি, না, ভাইয়েরা সব ঠিকই বলেছিলেন।
দুই বছরের কথা আগে বললেন না, ওই ম্যাচটা খেলার পর আমি একটা জিনিসই চিন্তা করেছিলাম, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে পেস দিয়ে আপনি হয়তো মানুষের মন জয় করতে পারবেন, কিন্তু নিজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে আপনার স্কিল ডেভেলপ করতে হবে। লাইন-লেন্থ বলুন, কিংবা যেকোনো জায়গায় আপনি খেলতে যান, দেখবেন, স্কিল যে বোলারের মধ্যে আছে, তাঁকে খেলতে গেলে কিংবা প্রেডিক্ট করতে গেলে ব্যাটসম্যান একটা শট খেলতে গিয়েও দুবার চিন্তা করেন। কিন্তু যাঁরা শুধু পেস দিয়ে চালান, লাইন-লেন্থ ঠিক নেই, সব সময় দেখবেন তাঁরা এক্সপেনসিভ থাকেন, রান লিক করেন। হয়তো একটা স্পেল ভালো করে দেবেন, ওই স্পেলে ম্যাচ জিতে যাবে। এটা ঠিক আছে, এটা আমি মানি, যাঁদের এক্সপ্রেস পেস, তাঁরা এমন একটা স্পেল করে দেবেন, যে স্পেল পুরো ম্যাচ ডিসাইডিং হয়ে যাবে। কিন্তু আমার চিন্তাটা আলাদা। আমি পেস দিয়ে একটা স্পেল করে একটা ম্যাচ জেতাতে চাই না। আমি কনসিস্টেন্টলি ম্যাচ জেতাতে থাকব বাংলাদেশকে, এটাই আমার চিন্তা। এই জিনিসটা চিন্তা করেই আমি অফলাইনে প্র্যাকটিস করি। আমি সব সময় চেষ্টা করি, আমার যে জিনিসগুলো ইমপ্রুভ করা দরকার, সেগুলো অফ সিজনে করব, কারণ খেলা চলাকালীন এগুলো ইমপ্রুভ করা হয় না। একটা সিরিজ খেলে আসার পর আমি দেখি, এই সিরিজে আমার ভুলগুলো কী। পরের সিরিজে আসার আগে ওই ভুলগুলো নিয়ে নিজে কাজ করি, কোচের সঙ্গে কাজ করি, যখন উনি সময় পান। কারণ আমার কাছে মনে হয়, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে খেলতে গেলে ইমপ্রুভ করার শেষ নেই। যত দিন ক্রিকেট খেলবেন, কিছু না কিছু নতুন স্কিল আপনাকে নিয়ে আসতেই হবে। নইলে এখন তো ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে অনেক অ্যানালিস্ট আছেন। আপনি একটা স্কিল দিয়ে হয়তো দুই থেকে ছয় মাস ডমিনেট করবেন, তারপর দেখবেন ব্যাটসম্যান আপনাকে ওয়ার্ক আউট করে ফেলেছে। কারণ, ওয়ার্ল্ডে এখন প্রচুর অ্যানালিস্ট আছেন, প্রত্যেক টিমে দু-একজন করে। তাঁরা আগে থেকেই আপনার স্কিল নিয়ে ভিডিও প্রত্যেক টিমে পাঠিয়ে দেন। তাই আমার মনে হয়, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে যদি ডমিনেট করে খেলতে চান, তাহলে অবশ্যই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটের চেয়ে আপনাকে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে।
সেটা কি পেসে কম্প্রোমাইজ করে? মানে আপনি যখন শুরু করেছিলেন, যেটা বললাম, ওই সিলেট টেস্টের নাহিদ রানা আর আপনার সর্বশেষ টেস্ট, যদি আমরা লাস্ট পাকিস্তান সিরিজই ধরি...পাকিস্তানে গিয়েই তো সেই অর্থে মানুষ আপনাকে চিনল। প্রথমে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, পরে রাওয়ালপিন্ডি সেকেন্ড টেস্ট, বাংলাদেশেও যে সিরিজটা। ওই নাহিদ রানার মধ্যে অনেক তফাত। আপনি যেটা বললেন, আপনার বোলিংয়ে অনেক কিছু যোগ হয়েছে। কিন্তু অনেক সময় হয় যে একজন পেস বোলার অনেক জোরে বল করছে, সে তো মার খেয়ে গেল, তখন ওর মধ্যে ডাউট তৈরি হয়। অনেকে বুদ্ধি দেয়, আরে এত জোরে করার দরকার নেই, বরং তুই কন্টেইন করে কর। আমি আমার নিজের ভয় থেকে বলছি, শুরুতে যেটা বললাম, লাইন-লেন্থ কন্টেইন করে মোটামুটি ১০ ওভারে ৪০ রান দিয়ে ২ উইকেট নিয়ে বাড়ি চলে যাওয়া বোলার বহু পাওয়া যায়। এই জিনিস তো সহজে পাওয়া যায় না। ওই জায়গায় তো আপনার কোনো কম্প্রোমাইজ নেই, নাকি ওটা আপনার ন্যাচারাল?
নাহিদ রানা: আসলে পেস জিনিসটা কিছুটা গড গিফটেড, আর কিছুটা আপনার ওপর ডিপেন্ড করে। গড গিফটেড মানে আল্লাহ যেটা দিয়েছেন, সেটা হচ্ছে আপনি চার ওভার বল করবেন ১৪৫-এ। চার ওভারের পর একই পেসটা যে কন্টিনিউ করবেন, এটা আপনার হার্ড ওয়ার্ক। আপনি ১০ ওভারের স্পেল করেছেন, ১০ ওভারই ১৪৫, ১৪০ প্লাস গতিতে বল করেছেন, এটা কখনো ন্যাচারাল হয় না। ওয়ার্ল্ডে কোনো পেস বোলারকে দেখতে পাবেন না যে ন্যাচারাল পেসে কন্টিনিউ ১৪০ করে যাচ্ছেন। ন্যাচারাল পেস দিয়ে ১৪০ কন্টিনিউ করা ডিফিকাল্ট। ন্যাচারাল জিনিসটা গড গিফটেড। এটা কীভাবে কন্টিনিউ করবেন, তা আপনার ওপর ডিপেন্ড করে। আপনি নিজেকে বুঝছেন কি না। আমি মনে করি, পেস বোলারদের নিজেকে বোঝাটা জরুরি, কারণ পেস বোলারদের বডির ওপর অনেক প্রেশার যায়। পেস বোলারের নিজের বডি বোঝা অনেক জরুরি। সে যদি তার বডি না বোঝে, তাহলে অনেক ইনজুরিতে পড়বে। আমার বডি যদি আমি না বুঝি, তাহলে অন্য একজন বুঝবে কীভাবে? আমার বডি এখন কী চায়, খাওয়া-খাবার কিংবা পেস কেমন চায়, কোন সময় কী চায়, এই জিনিসটা আমি ভালো বুঝব। আমাকে গাইড করার জন্য কোচ আছেন, ট্রেনার আছেন, ফিজিও আছেন, তাঁরা গাইড করবেন, কারণ তাঁরা প্রসেসের মধ্যে আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ওটার বাইরে আমার বডি কী চাচ্ছে, এটা আমি ছাড়া তাঁরা বুঝবেন না। তাই এই জিনিসটা পেস বোলারদের বোঝা অনেক জরুরি।
আপনার সম্পর্কে তো আমাকে একটু পড়াশোনা করতে হয়েছে, খোঁজখবরও নিতে হয়েছে। আলমগীরের কাছে খোঁজ নিইনি, আমি যা বলব, এটা আপনার স্যার বলেননি। ভালো ভালো কথা অবশ্য, স্যার তাই বলতে পারেন যে আমিই বলেছি। সেটা হলো, আপনি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে এসেছেন, অনেক জোরে বল করেন, সবাই আপনাকে চেনে, আপনি একজন স্টার, সারা পৃথিবী চেনে। তখন একটু মাথা কেমন কেমন করেই। তারপর হচ্ছে, না, দেখা গেছে, জীবন তো এ রকমই, বয়স কম, আমি যা চাই, তা-ই করতে পারি। কিন্তু শরীর তো অলরেডি জানান দিচ্ছে। আর আপনি ইনজুরি নিয়ে খুব ইন্টারেস্টিং একটা কথা বলেছিলেন একবার, ‘যুদ্ধে যখন নেমেছি, গুলি খাওয়ার ভয় করলে কি হয়?’ কথাটা আমার কাছে ক্ল্যাসিক লেগেছে। এই কয়েক দিন আগে আপনার একটা ইন্টারভিউ দেখলাম, ওখানেও আপনি বলেছেন, ‘ইনজুরি আমার বন্ধু।’ মানে ফাস্ট বোলারের কোনো না কোনো সময় ইনজুরি আসবে। এই যে অল্প বয়সেই, শুরুতেই এই একসেপটেন্স। কারণ, নরমালি আমি অনেক বোলার দেখেছি, যাঁদের প্রথম যখন ইনজুরিটা এসেছে, যেমন মাশরাফি। বাংলাদেশের ইতিহাসে মাশরাফির কথা কত লক্ষবার বলে ফেলেছি। আবেগে ইনজুরি হয়েছে, আবার ফিরে এসেছেন। কিন্তু প্রথমবার যখন হয়েছিল, হি ওয়াজ ভেরি ডাউন, আপসেট। তো এই জিনিসটা আপনার মধ্যে কীভাবে এল? এখানে কি স্যারের কোনো ভূমিকা আছে, নাকি আপনি নিজে থেকেই বুঝেছেন, ইতিহাস দেখেছেন যে যত বড় বোলার আছেন, বিশেষ করে যাঁরা এক্সপ্রেস বোলার, তাঁদের আগে হোক পরে হোক, কখনো না কখনো ইনজুরি আসবে?
নাহিদ রানা: জাস্ট আমি একটা জিনিস অ্যাড করতে চাই। আপনি বললেন, পেস বোলারদের পেস কমিয়ে লাইন-লেন্থ ঠিক করা উচিত কি না। যে ইয়াং পেস বোলাররা আছেন, কিংবা আমার মতো যাঁরা এসেছেন, আমি তাঁদের একটা জিনিসই বলব, তাঁরা যেন কখনো পেস কমিয়ে লাইন-লেন্থ ঠিক করতে না যান। কারণ, যখনই পেস কমিয়ে লাইন-লেন্থ ঠিক করতে যাবেন, আপনার মাসল অটোমেটিক্যালি স্লো হবে। তখন আবার যখন জোরে বল করবেন, চাইলেও আর পারবেন না, চাইলেও ওই একই জায়গায় পড়বে না। তাই আপনার যে পেস, ওই পেসেই লাইন-লেন্থ ঠিক করুন। কারণ, আপনি স্লো করলে আপনার মাসলও স্লো হচ্ছে। তাই আপনার ন্যাচারাল পেসের ওপরই লাইন-লেন্থ ঠিক করতে হবে। এখন কীভাবে করবেন, এটা পেস বোলারের ওপর ডিপেন্ড করবে, কোচ আছেন।
আর ইনজুরির কথা যেটা বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। পেস বোলিং লাইফ কীভাবে লিড করতে হয়, আমার কোচ আলমগীর স্যারই আমাকে শিখিয়েছেন। ইনজুরিতে পড়ব, এটা স্বাভাবিক। কারণ উনি অবশ্যই আমাকে, যখন ছোট, ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করি, আস্তে আস্তে এনসিএল খেলি, তখন বলেছেন, ইনজুরিতে তো পড়বেই। কিন্তু শুরু থেকেই যখন একজন মানুষ আপনাকে শেখাবেন, পেস বোলিং লাইফ আসলে কী, তখন সামনে গিয়ে আপনার জন্য ইজি হয়ে যায়। আমার জন্যও সামনে এসে এটা ইজি হয়ে গেছে, কীভাবে পেস বোলিং লাইফ লিড করতে হয়। খাওয়াদাওয়া, ঘুম, সবকিছু। এই জিনিসগুলো উনি আমাকে ছোট থেকেই বলেছেন। আমি তখন কম বুঝতাম, অল্প বুঝতাম, কিন্তু কাজগুলো করার চেষ্টা করতাম। আস্তে আস্তে ডমেস্টিক খেললাম, বিপিএল খেললাম, ন্যাশনাল টিমে খেললাম, যত ওপরের লেভেলে খেলছিলাম, তত ওই জিনিসগুলোর মূল্য বুঝছিলাম যে না, আসলে পেস বোলারের লাইফ কীভাবে লিড করা জরুরি। এই জিনিসটা ছোট থেকে শিখেছি, বড় হয়ে জাস্ট কন্টিনিউ করছি, আর যা অ্যাড করা লাগে, সেটা আমার লাইফে অ্যাড করছি।
কিন্তু অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয় না? একটা জিনিস খেতে খুব ইচ্ছা করছে বা মনে হচ্ছে সিনেমা খুব ভালো লাগছে, রাত তিনটা-চারটা বেজে গেছে, কিন্তু মনে হচ্ছে, আবার ঘুমাতে হবে। অনেক কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হয় তো। আসলে কী করতে হয়েছে? শুধু কি কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকতে হয়? এটা একটু জানতে চাই, ওর মুখ থেকে শুনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে যখন আপনি উঠে এসেছেন, নাহিদ রানা, তখন আপনার পছন্দের যে খাবার ছিল, এখন হয়তো সেটা খাওয়াই হয় না, এমন কিছু হয়েছে?
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, অবশ্যই হয়। কারণ স্যাক্রিফাইস ছাড়া আপনি লাইফে কিছুই অ্যাচিভ করতে পারবেন না। কিছু অ্যাচিভ করতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে স্যাক্রিফাইস করতে হবে। এটা যদি না পারেন, তাহলে রুমে বসে থাকেন। কোনো লাভ নেই। হয়তো আপনার মধ্যে ট্যালেন্ট আছে, কিন্তু আপনি ডিসিপ্লিনের মধ্যে থাকেন না, কিংবা স্যাক্রিফাইস করতে চান না। তাহলে বেশি দিন নিজেকে কন্টিনিউ করতে পারবেন না। হয়তো একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখবেন, ওই পর্যায়েই থেকে গেছেন, কিংবা নিচের লেভেলে, যেখানে ছিলেন, সেখানে চলে গেছেন। তাই আমি মনে করি, ট্যালেন্টের চেয়ে হার্ড ওয়ার্ক বেশি জরুরি। ট্যালেন্ট অবশ্যই আছে, ট্যালেন্ট আপনাকে নিয়ে যাবে, কিন্তু ট্যালেন্টের সঙ্গে হার্ড ওয়ার্ক না থাকলে আপনি কখনোই ওপরের লেভেলে যেতে পারবেন না। আমি আমার ফ্রেন্ড সার্কেলে অনেক ট্যালেন্টেড প্লেয়ার দেখেছি, কিছুদিন ভালো পারফর্ম করেছে, তারপর আস্তে আস্তে আবার আগের জায়গায় চলে গেছে। ট্যালেন্টকে বিট করতে পারে হার্ড ওয়ার্ক। এটা আমি সব সময় বিলিভ করি। যে প্লেয়ার হার্ড ওয়ার্ক করে আর যে ট্যালেন্টেড কিন্তু হার্ড ওয়ার্ক করে না, আমি মনে করি, হার্ড ওয়ার্ক করা প্লেয়ারটাই একদিন ট্যালেন্টেডের চেয়ে এগিয়ে যাবে। কারণ, ট্যালেন্ট একটা বয়স পর্যন্ত কাজ করে। ইয়াং বয়সে আপনার বডিতে কোনো কিছু ফিল হয় না। কিন্তু যখন একটা বয়স হয়ে যায়, ২৭, ২৮, ৩০, ৩২ বছর, তখন আর ট্যালেন্ট কাজ করে না। তখন আপনি অতীতে কী কাজ করেছেন, হার্ড ওয়ার্ক কী করেছেন, এই জিনিসগুলো আপনাকে সামনের দিকে নিয়ে যায়। তাই আমি মনে করি, ট্যালেন্টের চেয়ে হার্ড ওয়ার্কই বড়।
নাহিদ রানা, আমি অনুষ্ঠানের শেষে হাত মেলাব, কিন্তু আগেই একটু হাত মিলিয়ে নিই। ওরে বাবা, হাত তো ভয়ংকর, হ্যাঁ? পুরো খসখসে হয়ে গেছে, না? বল ধরতে ধরতে? না, আমি হাতটা মেলালাম এই কারণে, আপনি কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলেন ডাক্তার দেখাতে। ওখানে আমার অনেক পুরোনো এক বন্ধুর সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল, নাম বাবু। এখন পার্থে সেটল, আগে মেলবোর্নে থাকতেন। বাংলাদেশের যত ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়া যান চিকিৎসার জন্য, বাবু তাঁদের হেল্প করেন। তো বাবু আপনার সম্পর্কে এত ভালো ভালো কথা বলেছেন, আমি বলেছি, নাহিদ রানা এত ভালো? ভালো বলতে, আপনার চিন্তাভাবনাটা, মাথাটা। এই যে আপনি যে কথাটা বললেন, আমার যেটা খুব স্ট্রাইক করল, আলমগীর, এটা একটু বোঝার ইচ্ছা। নাহিদ রানাকে বোঝার জন্য আমি আপনার শরণাপন্ন হচ্ছি। ও শুধু এই সময়ের কথা বলল না, সে বলল ২৮ বছর বয়সে, ৩০ বছর বয়সে, ৩২ বছর বয়সে। এর চেয়ে সত্যি কথা আর হয় না। যখন যৌবন আছে, বয়স আছে, আমি আমার ট্যালেন্ট দিয়ে একটা পর্যায়ে চলে যাব। কিন্তু ওই সময় তো আমাকে পুরো স্কিলনির্ভর হতে হবে। আমার জীবন, আমার শরীর, আট বছর আগে শরীরে কী করেছি, ওটা তখন জানান দেবে। ওর কি শুরু থেকেই চিন্তাভাবনাটা এ রকম ছিল, অন্যদের চেয়ে একটু ডিফারেন্ট?
আলমগীর কবির: আমি বলব, শুরুতে এ রকম হয়তো ছিল না। এই কারণে যে ওর রুমমেটরা যারা ছিল ওই সময়, আমি একটা জিনিস বলতাম, যেহেতু আমি জানি ওর ভেতরে ট্যালেন্ট একটা আছে, সে জোরে বল করতে পারে। ওর রুমমেটদের আমি সব সময় বলতাম, ও কখন কী করে না করে, এগুলো আমাকে একটু ইনফর্ম করিস।
স্পাইং।
আলমগীর কবির: হ্যাঁ। অনেক সময় বলত, স্যার, ও আজকে অনেক রাত জেগেছিল, আজকে মোবাইল অনেকক্ষণ দেখেছে। ও কিন্তু ঠিকই আসত, হয়তো আস্তে আস্তে এমনভাবে হেঁটে আসত, যেন আমি বুঝতে না পারি যে রাতে ঘুমায়নি। আমি দেখতাম, তখন ওকে বলতাম, রাত জেগে থাকলে কী হবে, মাসল মেমোরি আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যাবে। এখন ইয়াং বয়স, এটা বুঝবি না। কিন্তু একটা সময় আসবে, মাসল মেমোরি আর জীবনে তোকে হেল্প করবে না। এগুলো যদি হ্যাবিট করতে থাকিস, একটা সময় আমি তোকে যে জায়গায় দেখতে চাই, ওই জায়গায় আর পাব না। কারণ তুই যেভাবে আছিস, আল্লাহ তোকে এভাবেই পাঠিয়েছেন। আমি শুধু তোকে একটু ঘষামাজা করব, কথা বলব, তুই তোর কাজ করবি, আমার আর কিছু করার নেই। তুই নিজেকে যদি হেল্প না করিস, আমি তোকে জীবনে হেল্প করতে পারব না।
তো দেখেন, ও ডে বাই ডে আস্তে আস্তে যখন নিজেই একটা লেভেলে খেলছে, ওয়াইসিএল খেলছে, ন্যাশনাল লিগ খেলছে, ও নিজে নিজেই বুঝে গেছে। আর এক সময় প্রিমিয়ার লিগে আমি ওকে কল করেছিলাম, সঙ্গে করে প্রাইম ব্যাংকে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন হয়তো খেলানোর সুযোগ করে দিতে পারিনি, কারণ একটাই, করোনা তখন শুরু হয়েছিল, ২০২১ সালে। তারপর সবাই সবার মতো বাসায় চলে গেল। তারপর যখন আবার টি-টুয়েন্টি শুরু হয়, তখন তো ৫০ ওভার ছিল। ৫০ ওভারের খেলা শেষ হওয়ার পর টি-টুয়েন্টি শুরু হয়। লিমিট করে দিয়েছিল, প্রত্যেক হোটেলে এতজন মেম্বার থাকবে। এ জন্য তাকে ইনক্লুড করতে পারিনি। যা-ই হোক, ওই পরিবেশগুলো দেখে যখন অভ্যস্ত হয়েছে, তখন বোঝার চেষ্টা করেছে, আসলে কী করা উচিত। তবে একটা জিনিস ভালো লেগেছে, ওর আর শরীফুলের একটা জিনিস, ওরা নিজেরা নিজেদেরকে কীভাবে কী করতে হবে, সেটা বুঝে নিয়েছে। একটা সময় ছিল ইয়াং, ও যেটা বলছে, হয়তো সে সময় বোঝেনি। কিছুক্ষণ আগেও বলেছে, যখন টেস্ট খেলেছে, অনেক রান দিয়েছে, অনেকেই যাঁরা ওই জায়গাটা ছুঁয়ে এসেছেন, আসলে কী করা উচিত, তখন ও রিয়ালাইজ করেনি। যখন রিয়ালাইজ করেছে, এই জায়গাগুলো বুঝেছে বলেই ও আজকে এত দূর খেলছে। বোঝার পর আজকে এখন নাহিদ রানা ভালো করছে। ওই জিনিসগুলো আস্তে আস্তে বুঝতে খুব একটা বেশি সময় লাগেনি, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ওরা জিনিসগুলো ধরে ফেলেছে। অনেকে ধরতে পারেনি। ও কিছুক্ষণ আগে বলেছে, ওর ফ্রেন্ড সার্কেলে যারা ভালো ক্রিকেটার ছিল, ওরা বোঝার পরও ধরার চেষ্টা করেনি বলে আজকে হয়তো টপ লেভেলে নেই। এই জিনিসটা খুব তাড়াতাড়ি ওরা ধরেছে।
এখানে দুটো জিনিস আছে। একটা হলো বোঝা। শুধু সব সময় বুঝলেই হয় না, ওটা তো একটা মানুষের মন। আমার তো ওই জিনিসগুলো করতে ভালো লাগে, তাই না? আমার রাত জাগতে ভালো লাগে, গল্প করতে ভালো লাগে, আমি হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে
নাহিদ রানা: না, এই জিনিসটা টোটালি ম্যান টু ম্যান ভ্যারি করে। একদম। আপনি দেখেন, আমি যদি ক্রিকেট না খেলতাম, তাহলে কী করতাম? লম্বা ছিলাম, হয়তো চেষ্টা করতাম কোনো সরকারি জব করার। লম্বা হওয়ায় হয়তো ডিফেন্সে কিংবা অন্য কিছুতে চেষ্টা করতাম। কিংবা বাবার হয়তো জমি ছিল, কৃষিতে কাজ করতাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিশাল আমের বাগান। বাবার জমিতে কাজ করলে সারা দিন কাজ করতাম। কোনো জব করলে সাত-আট ঘণ্টা ডিউটি করতাম। তাই আসলে হার্ড ওয়ার্ক না করার কারণ কী আমার? এটা ছাড়া তো আমার কোনো আর্নিং সোর্স নেই। যদি এখানেই হার্ড ওয়ার্ক না করি, তাহলে কোথায় করব? বাইরে তো করতেই হতো, আর এখানে আমি একটা প্রসেসের মধ্যে আছি, দেশের হয়ে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছি। তাহলে দেশকে কিংবা নিজেকে অন্য লেভেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি কেন হার্ড ওয়ার্ক করব না? এই অপরচুনিটি পেতে চান, এমন মানুষ দেশে বহু আছেন। সবাইকে তো আর মেলে না, সবাইকে আল্লাহ এই চান্স দেন না। যেহেতু আমার সুযোগটা এসেছে, আমি সুযোগটা কেন কাজে লাগাব না? আমি মনে করি, প্রত্যেক প্লেয়ারেরই নিজে চিন্তা করা উচিত। মানুষ আসলে যা চিন্তা করে, ওই চিন্তা অনুযায়ী মানুষের বডি কাজ করে। মানুষ যা ভাবে, একদিন ওই জায়গাতেই যায়, যদি সে সঠিক প্ল্যানে এগোয়, সঠিক চিন্তা করে, সঠিকভাবে হার্ড ওয়ার্ক করে এবং সঠিক প্ল্যানে সেই কাজগুলো এক্সিকিউট করতে পারে।
খুবই ভালো লাগল শুনে। এখন ন্যাশনাল বাংলাদেশ টিমে আপনার মাত্র বছর দুয়েক হয়েছে। কিন্তু আপনার যে চিন্তাভাবনাটা, এটা বাংলাদেশ টিমের মধ্যে একটু ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ, এটা তো আপনার দায়িত্ব না। আপনি এখনো ক্যাপ্টেন না, লিডারশিপ গ্রুপেও যাননি, সিনিয়রও নন। কিন্তু এই দলের মধ্যে কি আপনি মনে করেন, এই চিন্তাটা আগের তুলনায় একটু বেশি আসছে? এখন আপনার টেস্ট ক্যাপ্টেনের কথায় আসি, নাজমুল হোসেন শান্ত। আলমগীর যেটা বললেন, শান্তও নাকি আপনার পেছনে চর লাগিয়ে রাখতেন, মানে স্পাই। আপনি কোথায় যান, কী করেন, যখন দেখেছেন যে আপনি স্পেশাল, তখন লাগিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ টিমের মধ্যেও কি আগের তুলনায় সচেতনতা এসেছে? আলমগীর ভালো বলতে পারবেন, উনি যখন খেলেছেন, ২০০৩-০৪ সালের দিকে, তখন আমরা হয়তো অনেক কিছু বুঝতাম না, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট, টেস্ট ক্রিকেট। ওই জায়গায় একটা সচেতনতা হয়তো এসেছে, মনে হয় না?
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনি দেখেন, এখন প্লেয়ারদের মধ্যে অবশ্যই চিন্তায় চেঞ্জ এসেছে। কিন্তু এটা টোটালি ম্যান টু ম্যান ভ্যারি করে, আমি যেটা বললাম। আমার যেভাবে চিন্তাধারা, হয়তো আরেকজনের হবে না। একেকজনের কাছে জীবনটা একেক রকম। একেকজন একেকভাবে জীবন এনজয় করে। আমি হয়তো চেষ্টা করছি, যত দিন ক্রিকেট খেলব, আমার ১০০ পারসেন্ট এফোর্ট দিয়ে খেলব। যাতে ক্রিকেট থেকে রিটায়ারমেন্টে যাওয়ার পর আমার এটা ফিল না হয় যে আমি যদি পাঁচ বছর আগে এই কাজটা করতাম, তাহলে হয়তো আমার লাইফটা অন্য রকম হতো। ভবিষ্যতে যেন আমার এই ফিলটা কখনো না আসে। কারণ, এই ফিলটা যদি ভবিষ্যতে আসে, তাহলে মানে আমি লাইফে শুধু ফাঁকি মেরেছি। আমি চাই, লাইফে আমি যতটুকু অর্জন করব, আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে সেটা অ্যাচিভ করার চেষ্টা করব।