ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা ২০২৪ ও ২০২৫ পেয়েছেন কবি, কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্যজগতের আট বিশিষ্টজন। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় দুই বছরের এই সম্মাননা পদক দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয় ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে। আর ২০২৫–এ আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

তরুণ সাহিত্য বিভাগে বৈতরণী প্রকাশনীর ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’ গ্রন্থের জন্য ২০২৪ সালের পুরস্কার পেয়েছেন নিজাম বিশ্বাস। প্রবন্ধ, আত্মজীবনী ও অনুবাদ বিভাগে অন্যপ্রকাশের প্রবন্ধ সংকলন ‘বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’-এর জন্য পুরস্কার পেয়েছেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। প্রথমা প্রকাশনের ‘সময় বহিয়া গেল’ উপন্যাসের জন্য কবিতা ও সাহিত্য বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন আনোয়ারা সৈয়দ হক।

একইভাবে তরুণ সাহিত্য বিভাগে ২০২৫ সালের জন্য অন্যপ্রকাশের ‘সায়ানাইড ফুল’ উপন্যাসের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন মাহবুব ময়ূখ রিশাদ। তাঁর পক্ষে তাঁর স্ত্রী পুরস্কার গ্রহণ করেন।

প্রবন্ধ, আত্মজীবনী ও অনুবাদ বিভাগে ‘পালকের চিহ্নগুলো (আত্মজৈবনিক স্মৃতিকথা)’ গ্রন্থের জন্য নাসরীন জাহান এবং কবিতা ও কথাসাহিত্যে ‘মানচিত্র’ গ্রন্থের জন্য শাহীন আখতার পুরস্কার পেয়েছেন। নাসরীন জাহানের বইটি বেঙ্গল বুকস আর শাহীন আখতারের বইটি প্রকাশিত হয়েছে বাতিঘর থেকে।

শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান। পুরস্কার গ্রহণ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নিজের অসুস্থতা, মৃত্যু-ভাবনা ও বেঁচে থাকার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গত বছর সমকাল সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের দিন বিকেলেই জানতে পারি, আমার ক্যানসার হয়েছে। এই একটা বছর মৃত্যু নিয়ে ভেবেছি। চিকিৎসকেরা বলছেন, অপারেশন করে আমার গলব্লাডার ফেলে দিতে হবে এবং দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। মৃত্যুকে অনেকটা মেনে নিয়েছিলাম। ভাবছিলাম, হয়তো আগামী বছর আর এখানে আসতে পারব না। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, মৃত্যু আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা করে কি না? আমরা তো তা শুনতে পাই না। কিন্তু আমরা রাজি হয়ে যাই, তারপর চলে যাই। আমি রাজি হচ্ছি না, দেখা যাক কী হয়।’

পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি–সাহিত্যিকদের ব্যক্তি ও কর্মজীবন নিয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এবং পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ধারণ করা ভিডিও ক্লিপ অনুষ্ঠানে বড় পর্দায় দেখানো হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার জগতে চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, সাহিত্যচর্চায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও জরুরি। তবে সেই পৃষ্ঠপোষকতা হতে হবে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে।

আজীবন সম্মাননা পাওয়া অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অবদান তুলে ধরে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সারা জীবন নিজের আদর্শে অবিচল থেকেছেন সিরাজ স্যার। একই সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে লিখে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সচেতন করেছেন। প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ, শিশুসাহিত্যসহ তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত। তাঁর মতো মানুষেরা জ্ঞানমনস্ক ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ গঠনে আজীবন অবদান রেখেছেন।

অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি–সাহিত্যিকদের অভিনন্দন জানান টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সমকালের প্রকাশক এ কে আজাদ। তিনি বলেন, সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ব্যাংকসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগে অবদান রাখতে হবে। দেশের নানা প্রান্তে অনেক প্রতিভা ছড়িয়ে আছে, কিন্তু সুযোগের অভাবে তারা সামনে আসতে পারে না। উৎসাহ ও স্বীকৃতি পেলে এসব মানুষ আরও মূল্যবান কাজ করতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মইনউদ্দীন বলেন, একসময় বেসরকারি উদ্যোগে অনেক সাহিত্য পুরস্কার চালু হলেও সেগুলোর বেশির ভাগই টেকেনি। এ ধরনের উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। পুরস্কার সাহিত্যকে বড় করে না, তবে সাহিত্যিকদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া সমাজ ও করপোরেট খাতের দায়িত্ব। ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার যেন কখনো বন্ধ না হয়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

পুরস্কার নির্বাচনের প্রক্রিয়া তুলে ধরে বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, দুই বছরের পুরস্কারের জন্য মোট ৩৬টি বই মূল্যায়ন করা হয়েছে। বইয়ের ধরন অনুযায়ী মূল্যায়নের মানদণ্ডও আলাদা ছিল। ভালো বই বিচারকমণ্ডলীর কাছে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রকাশকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। কবিতার বই তুলনামূলকভাবে কম জমা পড়েছে বলেও জানান ফয়জুল লতিফ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, আমন্ত্রিত অতিথি এবং আয়োজনের সঙ্গে ১৫ বছর ধরে যুক্ত ব্র্যাক ব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি পুরস্কার পাওয়া বইগুলোর প্রকাশকদেরও অভিনন্দন জানান।

অনুষ্ঠানে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।