ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম হয়েছে। বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের সুপারিশে একটি মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মো. আব্দুর রউফ খান। সংসদ সদস্যের পাঠানো ডিও লেটার বা সুপারিশপত্রের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনীত করেছে।
মো. আব্দুর রউফ খান বোয়ালমারী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি উপজেলার কাজী সিরাজুল ইসলাম দাখিল মাদ্রাসার এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
গত ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের বরাবরে একটি ডিও লেটার পাঠিয়েছিলেন সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান। ওই চিঠিতে বোয়ালমারীর ঘোষপুর ইউনিয়নে অবস্থিত কাজী সিরাজুল ইসলাম দাখিল মাদ্রাসার এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে মো. আব্দুর রউফ খানকে মনোনয়ন দেওয়ার জোরালো সুপারিশ করা হয়।
ডিও লেটারে হেলেন জেরিন খান লিখেছেন, “ফরিদপুর-১ আসনের মধ্যে বোয়ালমারী উপজেলার ১ নং ঘোষপুর ইউনিয়নে কাজী সিরাজুল ইসলাম দাখিল মাদ্রাসা অবস্থিত। উক্ত মাদ্রাসার এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে মো. আব্দুর রউফ খান, পিতা-মৃত মো. ইয়ারউদ্দীন খান, মাতা- মোসা. আছিয়ারা, গ্রাম: রাখালগাছী, ডাকঘর: গোয়ালবাড়ী, উপজেলা: বোয়ালমারী, জেলা: ফরিদপুরকে মনোনয়ন প্রদানের জন্য আমি জোর সুপারিশ করছি।”
সুপারিশপত্রের আরও এক অংশে তিনি উল্লেখ করেন, “মো. আব্দুর রউফ খান, কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের একজন সম্মানিত শিক্ষক। তিনি একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন বলে আমি মনে করি।”
হেলেন জেরিন খানের পাঠানো ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, “এমতাবস্থায়, প্রচলিত আইন বিধিবিধান ও প্রযোজ্য যোগ্যতা সাপেক্ষে মো. আব্দুর রউফ খানকে উক্ত মাদ্রাসার এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন প্রদানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। বিষয়টি সদয় বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন মর্মে প্রত্যাশা করছি।”
পরবর্তীতে গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের রেজিস্ট্রার প্রফেসর এস এম তৌহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় মাসের মেয়াদে মো. আব্দুর রউফ খানকে সভাপতি করে চার সদস্যের একটি এডহক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে আব্দুর রউফ খান মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া তার একটি পোস্টারে তাকে বোয়ালমারী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টারে শেখ হাসিনা এবং সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আব্দুর রহমানকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছিল। এছাড়া বর্তমানে কার্যক্রমনিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদারের এক নির্বাচনি সভায় আব্দুর রউফ খানকে সামনের সারিতে দেখা গেছে এমন কিছু ছবিও সামনে এসেছে।
এই পুরো বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে আব্দুর রউফ খান দাবি করেন, “কোনো পদ-পদবিতে ছিলাম না। আমি শিক্ষকতা করি। আমার কোনো প্রোগ্রামে যাওয়ার ঘটনা নেই। যেসব ছবি ছড়ানো হচ্ছে, আমার প্রতিপক্ষ ছড়াচ্ছে।”
বিএনপির এমপি হেলেন জেরিন খানের সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আমার মেমোরিতে নেই। সুপারিশ কেউ করেছে কি না জানা নেই, আমার ভাই বলতে পারবে।”
আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি আরও জানান, “আমার সার্টিফিকেট দিয়ে আমি আমার মতো করে ইউএনও স্যারের কাছে আবেদন করেছি। ইউএনও স্যার পরে ডিসি স্যারের মাধ্যমে বোধ হয় শিক্ষা বোর্ডে গেছে, আমি এতটুকু জানি।”
এই ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নেরও কোনো উত্তর মেলেনি।