বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টজুড়ে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরেও এক অদ্ভুত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আর্জেন্টিনা। একের পর এক রুদ্ধ্বশ্বাস জয় এবং টানা দ্বিতীয় শিরোপার হাতছানির পাশাপাশি দলটিকে প্রতিনিয়ত তাড়া করেছে নানা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। সম্প্রতি ফিফা সোশ্যাল মিডিয়া প্রটেকশন সার্ভিসের (এসএমপিএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিরই প্রতিফলন দেখা গেছে।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ঘৃণাসূচক বার্তার শিকার হয়েছে আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, লিওনেল স্কালোনির নেতৃত্বাধীন এই দলের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক বার্তার পরিমাণ তত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

সিগনিফাই গ্রুপ ও থ্রেট ম্যাট্রিক্স নামক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান দুটি এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। বিশ্বকাপ চলাকালীন ৯ জুন থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ১ কোটি ৭১ লাখের বেশি পোস্ট ও মন্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৭৭ হাজার ২১৭টি পোস্ট ও মন্তব্য মানবীয় পর্যালোচনার জন্য আলাদা করা হয়। চূড়ান্ত পর্যালোচনার পর ২ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৬টি পোস্ট ও মন্তব্যকে আপত্তিকর হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে আর্জেন্টিনাকে ‘সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত জাতীয় দল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রধান তিনটি ধরন ছিল সাধারণ গালিগালাজ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং জেনোফোবিয়া বা বিদেশিবিদ্বেষ। অনেক ব্যবহারকারী বারবার দাবি করেছেন যে, ফিফা, ম্যাচ অফিশিয়াল এবং ভিএআর আর্জেন্টিনাকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে।

ঘৃণাসূচক বার্তার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। এই দুটি দেশই উল্লেখযোগ্যভাবে বর্ণবাদ ও জাতিগত বিদ্বেষের শিকার হয়েছে। এরপরের তালিকায় রয়েছে স্পেন, ব্রাজিল ও নরওয়ে।

জাতীয় দলের বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন ফ্রান্সের খেলোয়াড়েরা। তাঁদের লক্ষ্য করে ১৮ হাজারের বেশি আপত্তিকর মন্তব্য ও পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের খেলোয়াড়েরা। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা এই তালিকায় চতুর্থ স্থানে আছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা এ ধরনের আক্রমণের শিকার হয়েছেন ‘পক্ষপাতমূলক আচরণের সুবিধা পাওয়ার ধারণা’ থেকে। তবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হওয়া নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের নাম ও পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

পক্ষপাতের এই অভিযোগের প্রভাব পড়েছে ম্যাচ অফিশিয়াল বা রেফারিদের ওপরও। পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকা ১ হাজার ৬০৬ জনের মধ্যে ম্যাচ অফিশিয়াল ছিলেন ১৭০ জন, যা মোট সংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। তবে সবচেয়ে গুরুতর আক্রমণের ২১ শতাংশের লক্ষ্য ছিলেন এই রেফারিরাই। তাঁরা মারাত্মক শারীরিক হুমকি, সাইবার নিপীড়ন এবং ডক্সিংয়ের (ব্যক্তিগত ফোন নম্বর বা ঠিকানা ফাঁস) শিকার হয়েছেন।

বিশ্বকাপজুড়ে শনাক্ত হওয়া আপত্তিকর মন্তব্যের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ ছিল সাধারণ গালাগালি। বর্ণবাদী মন্তব্য ছিল ১২ শতাংশ, দুর্নীতির অভিযোগ ৯ শতাংশ, সহিংসতার আহ্বান বা হুমকি ৮ শতাংশ এবং বিদেশিবিদ্বেষী মন্তব্য ছিল ৭ শতাংশ। এছাড়া সমকামিতাবিদ্বেষী আক্রমণ ৪ শতাংশ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা আক্রমণ ৩ শতাংশ এবং রাজনৈতিক আক্রমণ ও শরীর নিয়ে বিদ্রূপের হার ছিল ২ শতাংশ করে।

ফিফা কেবল অনলাইন আক্রমণের তথ্য সংগ্রহ করেই থেমে থাকেনি, বরং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে। সংস্থাটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সুরক্ষা সেবা (এসএমপিএস) আপত্তিকর ও হুমকিমূলক মন্তব্য শনাক্ত করার পাশাপাশি সেগুলো স্প্যাম হিসেবে আড়াল করেছে। এছাড়া গুরুতর ঘটনাগুলো তদন্তের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে।