ভবিষ্যতে কর্মজীবনের ধারণা আমূল বদলে যেতে পারে। এমনকি শুক্রবারের মতো নির্দিষ্ট কার্যদিবসগুলোও হয়ে উঠতে পারে অপ্রাসঙ্গিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাবে পৃথিবী এমন এক মোড় নিতে পারে বলে মনে করছেন অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস।

প্রযুক্তি বিশ্বের অনেক শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, যেমন ওপেনএআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান কিংবা অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই এআই-এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। তবে বেজোস এই প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকটি দেখছেন। তাঁর মতে, এআই-এর কল্যাণে উৎপাদনশীলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে, মানুষের জীবনধারণের জন্য দীর্ঘ সময় কাজ করার প্রয়োজন হবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, এই পরিবর্তন খুব বেশি দূরে নয়।

সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ে কথা বলেন বেজোস। তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ সিদ্ধান্ত নেবেন, সপ্তাহে তিন দিন কাজ করেই পরিবারের ভরণপোষণ সম্ভব। এটাই হলো অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অর্থ।’

বেজোসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই-এর যুগে সম্পদ ও উপকরণের প্রাচুর্য তৈরি হলে শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি বদলে যাবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে, পরিবারের একজন সদস্যের আয়েই পুরো সংসার চলে যাচ্ছে, ফলে অন্য সদস্যের জন্য কাজ করাটা ঐচ্ছিক হয়ে দাঁড়াবে।

এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেজোস বলেন, ‘পরিবারের দুজনেরই আয় করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা থাকবে না। চাইলে দুজনেই কাজ করতে পারেন। আবার না চাইলে একজন কাজ ছেড়ে দিতে পারেন। অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা বাড়লে মানুষকে দুটি চাকরি করতে হবে না। ফলে কর্মী নিয়োগ করাও কঠিন হয়ে উঠবে।’

এআই খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও বাস্তবতা

দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনায় আশাবাদী হলেও এআই-এর কারণে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক বেজোস। তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তনের ফলে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে আরও বেশি অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হতে পারেন।

এআই খাতে বিনিয়োগের এই তীব্র গতিকে ‘বুদবুদ’ বা বাবল বলা যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি বেশ জটিল। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তি এখন বাস্তব এবং এর সম্ভাবনা অপরিসীম। তবে মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় এমন অনেক ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যেগুলোর সফল হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

বিনিয়োগকারীদের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বেজোস বলেন, ‘আমি মনে করি, এই প্রযুক্তি সমাজের জন্য ভালো। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিষয়টি জটিল। ভালো-মন্দ সব ধরনের উদ্যোগেই অর্থায়ন হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে কোন ধারণাটি ভালো আর কোনটি খারাপ, তা বিনিয়োগকারীদের পক্ষে বোঝা কঠিন।’

১৯৯৫ সালে নিজের গ্যারেজে অ্যামাজন শুরু করেছিলেন বেজোস। বর্তমানে তাঁর এই প্রতিষ্ঠানটি এআই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। চলতি বছরে তথ্যকেন্দ্রের উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে মূলধনী ব্যয় বাবদ ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি খরচের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

তবে এই প্রযুক্তির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনার পাশাপাশি কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। গত বছরের শেষ দিক থেকে অ্যামাজন করপোরেট পর্যায়ে প্রায় ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সাজাতে গিয়ে কর্মীসংখ্যা কমিয়ে আনছে, যা এআই-এর প্রভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।

অন্যদিকে, মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিনের মাধ্যমেও এআই-এর উত্থান থেকে লাভবান হতে পারেন বেজোস। ব্লু অরিজিন মহাকাশে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি চাঁদ ও তার বাইরে মানুষের কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। জানা গেছে, ব্লু অরিজিনের সর্বশেষ অর্থায়ন পর্বে ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলার সংগৃহীত হয়েছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছে ১৪০ বিলিয়ন বা ১৪ হাজার কোটি ডলার। এর ফলে বেজোসের মোট সম্পদ বেড়ে ৩৬৫ বিলিয়ন বা ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

কাজের দিন কমানোর বিষয়ে অন্যান্য নেতার মতামত

কর্মীদের কাজের স্বাধীনতা বাড়বে এবং কর্মদিবস কমবে—এই ধারণা শুধু বেজোসের নয়। তবে কর্মসপ্তাহ ঠিক কতটা কমবে বা কাজ কি পুরোপুরি ঐচ্ছিক হবে, তা নিয়ে প্রযুক্তি নেতাদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে।

এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং মনে করেন, এআই-এর প্রভাবে সপ্তাহে চার দিন কাজের রীতি চালু হতে পারে। জেপি মরগ্যান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমনের পূর্বাভাস হলো, ভবিষ্যতে সপ্তাহে সাড়ে তিন দিন কাজ করেই চলবে। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস আরও সাহসী পূর্বাভাস দিয়ে সপ্তাহে দুই দিন কাজের কথা বলেছেন।

সবচেয়ে চমকপ্রদ পূর্বাভাস দিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক। তাঁর মতে, এআই ও রোবট প্রযুক্তির সমন্বয়ে এমন এক যুগ আসবে যখন সবার জন্য উচ্চ আয়ের ব্যবস্থা থাকবে এবং অর্থের গুরুত্ব কমে যাবে। ফলে জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

গত বছরের শেষ দিকে মাস্ক বলেছিলেন, ‘২০ বছরের কম সময়ে এমন সময় আসতে পারে, যখন এআই ও রোবট প্রযুক্তির অগ্রগতির কল্যাণে কাজ করা আর বাধ্যতামূলক থাকবে না। এমনকি ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেও তা হতে পারে।’