বন্যা বা জলবায়ু দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই যদি নির্দিষ্ট করে জানা যেত কোন এলাকায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, কোথায় দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং সীমিত বাজেটের মধ্যে কোন কাজটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, তবে দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কার্যকর হতো। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর একটি বিশেষ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের দুই মেধাবী শিক্ষার্থী ফারিয়া ইসলাম ও মো. হাবিবুর রহমান। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন কোপাইলট’ প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়ে ‘এআই ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’–এর চূড়ান্ত পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছে।
ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি) টেকনোলজি এক্সিকিউটিভ কমিটি এবং ক্লাইমেট টেকনোলজি সেন্টার অ্যান্ড নেটওয়ার্ক (সিটিসিএন) যৌথভাবে এই সম্মানজনক পুরস্কারটি প্রদান করবে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় স্বল্পোন্নত দেশ এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উদ্ভাবনী ও কার্যকর সমাধানগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়াই এই পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য।
প্রকল্পের উদ্ভাবকদের পরিচয় দিতে গিয়ে জানা যায়, ফারিয়া ইসলাম ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে (ইউল্যাব) কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী এবং মো. হাবিবুর রহমান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী। আগামী ১৩ ও ১৪ অক্টোবর কম্বোডিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘এআই ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম’-এ শীর্ষ পাঁচটি প্রকল্পের বিশেষ দিকগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে দলের নেতৃত্ব দিতে ১১ অক্টোবর কম্বোডিয়া যাবেন ফারিয়া ইসলাম। সেখানেই চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার পর চলতি বছরের বিজয়ী প্রকল্পের নাম ঘোষণা করা হবে। আর যে প্রকল্পটি বিজয়ী হবে, সেটি আগামী নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১–এ উপস্থাপনের সুযোগ পাবে। এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশের প্রকল্পের পাশাপাশি আরও চারটি প্রকল্প স্থান পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার ‘এআই–মোরিস’, তানজানিয়ার ‘ফায়ারপ্রেডিক্ট’ ও ‘ক্লাইমেইড’ এবং মালির ‘ক্লাইমেটভয়েস এআই’।
ফারিয়া ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ ঘটার পর কেবল প্রতিক্রিয়া জানানোর চেয়ে আগে থেকেই জেনে নেওয়া যে কোথায় সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা সীমিত সম্পদকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করে। এই চিন্তা থেকেই ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন কোপাইলট’ প্রকল্পের জন্ম। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনটি নদীর পানি পরিমাপ স্টেশনের পরবর্তী তিন দিনের সম্ভাব্য উচ্চতা জানার পাশাপাশি চরম পরিস্থিতির আগাম পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হবে।
চূড়ান্ত পর্বে নির্বাচিত হওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে ফারিয়া ইসলাম জানান, এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়। বাংলাদেশের মতো একটি স্বল্পোন্নত দেশের তরুণেরাও যে বৈশ্বিক জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান তৈরি করতে পারেন, এই স্বীকৃতি তার প্রমাণ।
অন্যদিকে, মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পটিতে আমরা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করেছি এবং নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছি। আমি গবেষণা, উপাত্ত ও ধারণার পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহের দিকে মনোযোগ দিয়েছি। আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সীমিত সম্পদ, অল্প সময় এবং একই সঙ্গে পড়াশোনার দায়িত্ব সামলানো। আমাদের প্রকল্প সেরা পাঁচে জায়গা করে নেওয়ায় আমি গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। এটি আমার প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। তাই এই স্বীকৃতি আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।’
উল্লেখ্য যে, ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন কোপাইলট’ প্রকল্পের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক নাসির উদ্দিন আহমেদ।