মানব পাচার নির্মূল করার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি অর্জন করতে সক্ষম হয়নি বাংলাদেশ সরকার। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে।
গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
উক্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মানব পাচার প্রতিরোধে গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশ সরকারের সামগ্রিক উদ্যোগের পরিধি বেড়েছে। তা সত্ত্বেও এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত থেকে দ্বিতীয় ধাপেই (টিয়ার-২) রয়ে গেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাও বর্তমানে এই একই ধাপে অবস্থান করছে।
প্রতিবেদনে টিয়ার বা ধাপগুলোর মানদণ্ড ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করেছে, এমন দেশগুলোকে প্রথম ধাপে (টিয়ার-১) রাখা হয়। যেসব দেশ নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো দ্বিতীয় ধাপে (টিয়ার-২)। দ্বিতীয় ধাপে আবার নজরদারির একটি তালিকা (টিয়ার-২ ওয়াচ লিস্ট) রাখা হয়েছে। যেসব দেশ ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি, আবার উল্লেখযোগ্য চেষ্টাও চালাচ্ছে না, সেগুলোকে তৃতীয় ধাপে (টিয়ার-৩) রাখা হয়।
বাংলাদেশ সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মানব পাচার প্রতিরোধে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৬ পাস করেছে। এছাড়া মানব পাচারের ঘটনায় তদন্ত এবং মামলা পরিচালনার কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। মানব পাচারসংক্রান্ত অপরাধ শনাক্তকরণ এবং ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করার নির্দেশিকাও হালনাগাদ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে। পাশাপাশি মানব পাচারের ঝুঁকি কমাতে অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় সরকার বিশেষ জোর দিয়েছে।
তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আগের তুলনায় কমসংখ্যক মানব পাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে মানব পাচার দমনে সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট ছিল না এবং এ ধরনের অপরাধের বিস্তার এখনও ব্যাপক রয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগের তুলনায় কমসংখ্যক ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা প্রদান এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগগুলোও যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং দেশে ফিরে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিবাসী শ্রমিকরা যাতে নিজেদের পকেট থেকে নিয়োগ ফি না দেন, সেই ব্যবস্থা সরকার বন্ধ করতে পারেনি। এর ফলে অনেক শ্রমিক চরমভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, যা তাঁদের মানব পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।