দাখিল পরীক্ষায় জীববিজ্ঞানে অকৃতকার্য হওয়া রংপুরের গঙ্গাচড়ার এক শিক্ষার্থীর ফলাফল এখন বদলে গেছে। ওএমআর শিট বদলে দিয়ে হাবিবুল বাশারের ফল পরিবর্তন করে তাঁকে অকৃতকার্য করার অভিযোগে চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই ঘটনার ২০ দিন পর বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এখন সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করেছে। নতুন এই ফলাফলে জীববিজ্ঞানে এ প্লাস পাওয়ায় হাবিবুলের চূড়ান্ত ফলাফল দাঁড়িয়েছে সব বিষয়ে জিপিএ-৫।

গতকাল বৃহস্পতিবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এই সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। হাবিবুল বাশার গঙ্গাচড়ার কোলকোন্দ তাকিয়া শরীফ আলিম মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তিনি গঙ্গাচড়া ডিগ্রি কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।

হাবিবুল জানান, ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের পর দেখা যায় তিনি জীববিজ্ঞানে অকৃতকার্য হয়েছেন। এরপর তিনি পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করলেও ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অবশেষে ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি তাঁর চাচাকে সাথে নিয়ে বোর্ডে যান এবং খাতা দেখার আবেদন করেন। সেখানে তিনি লক্ষ্য করেন যে, বহুনির্বাচনী অংশের ওএমআর শিটটি তাঁর নয়। এছাড়া বোর্ডের কন্ট্রোলারের স্বাক্ষর এবং সিরিয়াল নম্বরেও গরমিল ছিল।

এই গুরুতর ঘটনার তদন্ত করতে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত চলাকালীন কমিটি জানতে পারে যে, হাবিবুলের জীববিজ্ঞান বিষয়ের বহুনির্বাচনী অংশের পরীক্ষার ওএমআর শিটটি পরিকল্পিতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিদর্শক মোশারফ হুসেন বাদী হয়ে চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে গঙ্গাচড়া মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন—গঙ্গাচড়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ও সহকারী কেন্দ্র সচিব মো. আবদুল বাকী ওরফে লিটন, সাউদপাড়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও হল সুপার মো. রোকনুজ্জামান, গঙ্গাচড়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব অলিউল্লাহ এবং ধনতোলা বাজার দাখিল মাদ্রাসার সুপার ইব্রাহিম খলিল।

মামলার এজাহারে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০ মে জীববিজ্ঞান পরীক্ষা চলাকালীন এক কক্ষে টাকার বিনিময়ে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়। হাবিবুল এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে টাকা দিতে অস্বীকার করলে আবদুল বাকীর সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা তৈরি হয়। এর প্রতিশোধ হিসেবে হাবিবুলের আসল ওএমআর শিট বদলে অন্য একটি শিট বোর্ডে পাঠানো হয়। হাজিরা শিটে থাকা ওএমআর শিটের সিরিয়াল নম্বর এবং বোর্ডে জমা দেওয়া শিটের নম্বরের মধ্যে পার্থক্য ছিল। এজাহারে আরও বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটির কাছে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ আসামি লিখিত বক্তব্য জমা দিলেও আবদুল বাকী বোর্ডে এসে কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেননি।

মামলা দায়েরের পর ১৮ সেপ্টেম্বর রোকনুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, “ওএমআর পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না, এতে তাঁর কোনো দোষ নেই।” তিনি দাবি করেন, কেবল হল সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কারণেই তাঁকে আসামি করা হয়েছে। তবে অন্য আসামিদের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, রোকনুজ্জামান বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

সংশোধিত ফলাফল পাওয়ার পর হাবিবুল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কষ্ট হয়েছে অনেক। তবু আমি খুশি। মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান স্যার আমার অভিযোগে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছেন। এ কারণে আমি সঠিক বিচার পেয়েছি। এই জালিয়াতির সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের সবাইকে শাস্তি দিতে হবে। যেন ভবিষ্যতে আর কেউ কোনো শিক্ষার্থীর এমন ক্ষতি করার সাহস না পায়।’

বোর্ডের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিদর্শক মোশারফ হুসেন মুক্তকণ্ঠকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, হাবিবুলের ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো মাদ্রাসায় আলিমে ভর্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বোর্ড।

অন্যদিকে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গঙ্গাচড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মশিউর রহমান জানান, মামলার পর থেকে আসামিরা পলাতক রয়েছেন। বর্তমানে তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে এবং তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।