১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর। সকাল সাতটার কাছাকাছি। বলিভিয়ার ছোট গ্রাম লা হিগেরার স্কুলঘর। ছোট, অন্ধকার এক শ্রেণিকক্ষের কোণে মেঝেতে বসে আছেন আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। দুই হাতে মুখ ঢাকা। কবজি আর পা বাঁধা। সামনে মেঝেতে পড়ে আছে দুই কিউবান গেরিলার মরদেহ। পায়ে গুলির ক্ষত, তাতে ব্যান্ডেজ।

দৃশ্যটির বর্ণনা আছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর তৎকালীন পরিচালক রিচার্ড হেলমসের এক মেমোতে। ঘটনাস্থলে থাকা এক ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তিনি ১৩ অক্টোবর মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান। মেমোতে ওই ব্যক্তির নাম এখনো ঢেকে রাখা।

মার্কিন সরকারের গোপন নথি অবমুক্ত ও প্রকাশ করা নিয়ে কাজ করেছে ওয়াশিংটনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ। তাদের বিশ্লেষণ বলছে, ওই ব্যক্তি সিআইএর কিউবান বংশোদ্ভূত কর্মী ফেলিক্স রদ্রিগেজ। আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া এই বিপ্লবীর বয়স তখন ৩৯ বছর। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে হত্যা করা হবে।

চে কেন বলিভিয়ায়

কিউবার বিপ্লবে চে ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রোর ডান হাত। কিন্তু বিপ্লবের পর সরকার চালানোর রোজকার কাজে তিনি নিজেকে বেমানান মনে করতেন। পরে কঙ্গোর বিদ্রোহে যোগ দেন, সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের ২০২০ সালের বিশ্লেষণ বলছে, ১৯৬৬ সাল নাগাদ চে নতুন অভিযানে নামতে চাইছিলেন, এবার লাতিন আমেরিকায়।

নিজের দেশ আর্জেন্টিনায় লড়াই করাই চের বেশি পছন্দ ছিল। কিন্তু সেখানকার পরিস্থিতি উপযুক্ত ছিল না। আর্কাইভের বিশ্লেষণে, বলিভিয়ার অবস্থা তুলনামূলক ভালো মনে হয়েছিল। দেশটিতে বামপন্থার ঐতিহ্য ছিল, ছিল সক্রিয় কমিউনিস্ট পার্টি।

১৯৬৫ সালে নতুন করে ক্ষমতায় আসা সামরিক একনায়ক ধর্মঘটি খনিশ্রমিকদের নির্মমভাবে দমন করেছিলেন। চের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নজর ক্যারিবীয় অঞ্চল আর মধ্য আমেরিকায়। আন্দিজের স্থলবেষ্টিত ছোট এই দেশের দিকে তারা হয়তো তেমন মনোযোগ দেবে না।

যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক রিচার্ড গট ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় ছিলেন। ৯ অক্টোবর বলিভিয়ার পাহাড়ি শহর ভায়েগ্রান্দেতে তিনি চের মরদেহ দেখেছিলেন। ১৯৯৭ সালে লন্ডন রিভিউ অব বুকসে তিনি সেই অভিজ্ঞতা আর চের জীবন নিয়ে লেখেন। তাঁর লেখায় আরেকটি দিক উঠে এসেছে।

কঙ্গো থেকে ফেরার পরও চের লক্ষ্য ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু কিউবার নেতৃত্বের মত ছিল, আর্জেন্টিনায় অভিযান বিপর্যয় ডেকে আনবে। লাতিন আমেরিকায় পরের লড়াই হওয়া উচিত প্রতিবেশী বলিভিয়ায়। গটের ভাষ্যে, চেকে সেভাবেই রাজি করানো হয়।

বলিভিয়া ছিল শুরু, শেষ নয়। চের পরিকল্পনা ছিল সেখানে একটি বিপ্লবী কেন্দ্র গড়ে তোলা, যেখান থেকে পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়বে গোটা লাতিন আমেরিকায়।

আটক আর্জেন্টাইন বিপ্লবী সিরো রোবের্তো বুস্তোসের লিখিত বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি সিআইএর এক প্রতিবেদনে চের কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। সেই কৌশলের মূল কথা, কোনো একটি দেশ একা বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে পারবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত মোকাবিলায় লাতিন আমেরিকার সব দেশের শক্তি এক করতে হবে।

১৯৬৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে চে ভিন্ন নামে, জাল পাসপোর্ট নিয়ে লাপাজে পৌঁছান। শুরুতে তাঁর দলে যোদ্ধা ছিলেন ৬০ জনের মতো। তাঁদের সবাই বলিভিয়ার নাগরিকও নন। নববর্ষের আগের রাতে বলিভিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মারিও মনহের সঙ্গে নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ হয়।

চে লিখেছিলেন, সামরিক প্রধান থাকবেন তিনিই। দুজনের পথ আলাদা হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের এপ্রিলের শেষে চে হিসাব কষে দেখেন, বলিভিয়ার একজন কৃষকও তাঁর আন্দোলনে যোগ দেননি।

ডায়েরির শেষ পাতা

বলিভিয়ায় চে নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। ডায়েরিতে তাঁর ৭ অক্টোবরের লেখা। সেদিন গেরিলারা নিজেরাই জানতেন না, তাঁরা ঠিক কোথায় আছেন। লা হিগেরাসহ আশপাশের তিনটি গ্রাম কত দূরে, তা জানতে এক রাখাল নারীর ওপর ভরসা করতে হয়েছিল তাঁদের। গ্রামগুলো তখন মাত্র তিন মাইলের মতো দূরে।

ডায়েরির শেষ লাইনগুলো লেখা ৮ অক্টোবরের প্রথম প্রহরে। চে লিখেছেন, রাত দুইটায় তাঁরা বিশ্রামের জন্য থামেন। আর হাঁটা অর্থহীন ছিল। উরুগুয়ে-ব্রিটিশ আলোকচিত্রী-সাংবাদিক জুলিও এচার্টের ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে সেই কথা উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে আছে, দলের সদস্য ‘চিনো’ রাতে হাঁটতে গিয়ে সবার জন্য বোঝা হয়ে উঠছিলেন।

দলের অবস্থা তখন শোচনীয়। সেপ্টেম্বরের সারসংক্ষেপে চে লিখেছিলেন, এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ পালানো, আরও অনুকূল এলাকা খোঁজা আর যোগাযোগ ফিরিয়ে আনা। ১ অক্টোবর তিনি দেখতে পান, বলিভিয়ার সেনারা তাঁর পিছু নিয়েছে। কয়েক দিন পর রেডিওতে শোনেন, তাঁকে ধরতে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।

ইউরো গিরিখাত

আগের রাতে এক আলুচাষি গেরিলাদের দেখে ফেলেছিলেন। ভোর হওয়ার আগেই সেনারা গিরিখাতের ওপরের উঁচু জায়গাগুলো দখল করে নেয়। গিরিখাতটির নাম কেব্রাদা দেল ইউরো।

টহলরত রেঞ্জারদের একটি দল জানতে পারে, ভেতরে ১৭ জন গেরিলা আছেন। বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন গ্যারি প্রাডো সালমন মর্টারসহ বাড়তি সেনা ডেকে আনেন। বেলা একটার দিকে লড়াই শুরু হয়। চলে চার ঘণ্টা।

চে তাঁর ছোট দলটিকে কয়েক ভাগে ভাগ করেছিলেন। দুই সঙ্গীকে নিয়ে তিনি আহত সহযোদ্ধাদের পিছু হটার সময় আড়াল দিচ্ছিলেন। তাঁর এম-২ কারবাইন আটকে যায়, নাকি গুলি লেগে অকেজো হয়, তা স্পষ্ট নয়। পিস্তলে কোনো গুলি ছিল না।

এক সঙ্গী চেকে শৈলশিরার ঢাল বেয়ে উঠতে সাহায্য করছিলেন। তখনই একটি গুলি লাগে তাঁর পায়ে। ঢালের মাঝপথে রেঞ্জাররা তাঁকে ঘিরে ধরে আত্মসমর্পণ করতে বলে। লড়াই শুরুর এক ঘণ্টা না পেরোতেই চে ধরা পড়েন।

প্রাডো পরে জেনারেল হন। ২০২৩ সালে ৮৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর ভাষ্যে, চে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘গুলি করবেন না। আমি চে গুয়েভারা। মেরে ফেলার চেয়ে জীবিত অবস্থায় আমার দাম আপনাদের কাছে বেশি।’

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির ২০০১ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, চেকে প্রথম স্পর্শ করেন হিমেনেস নামের এক সৈনিক। প্রাডো ছিলেন প্রথম কর্মকর্তা, যিনি তাঁকে চিনতে পারেন। পরে বইয়ে প্রাডো লিখেছেন, ‘চের ক্ষত ছিল গুরুতর। হাঁপানির কারণে তিনি শ্বাস নিতে পারছিলেন না।’

ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের হিসাবে, সেই লড়াইয়ে তিন গেরিলা নিহত হন।

লা হিগেরায় রাত

প্রাডোর ভাষ্য অনুযায়ী, পায়ে গুলি নিয়েই চে হেঁটে লা হিগেরায় যান। পাশে খচ্চরের পিঠে ছিলেন আরও গুরুতর আহত সঙ্গী সিমিওন কুবা, গেরিলাদের মধ্যে যিনি উইলি নামে পরিচিত ছিলেন।

স্কুলঘরে প্রাডো আর চের মধ্যে কথা হয়। এএফপির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সংলাপে দেখা যায়, প্রাডো জানতে চান, মানুষ মেরে কি এখানকার সমস্যার সমাধান হবে? চে জবাব দেন, ‘নিজের দিকে তাকান। আপনি মার্কিন অস্ত্র আর উর্দি ব্যবহার করছেন।’ প্রাডো পাল্টা প্রশ্ন করেন, রুশ অস্ত্র হলে কি অন্য রকম হতো?

প্রাডো চেকে একটি সিগারেট দেন। চেকে চিনাবাদামের স্যুপ খেতে দেওয়া হয়। স্কুলের শিক্ষিকা হুলিয়া কোর্তেস পরে দাবি করেছেন, এ স্যুপ তিনিই দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, চেকে জীবিত দেখা শেষ স্থানীয় মানুষ তিনি।

এএফপি সে সময়ের এক বিবরণের বরাতে জানায়, লা হিগেরায় প্রাডো বন্দী চেকে সেনা কর্মকর্তা আন্দ্রেস সেলিচের হাতে তুলে দেন।

সেই সন্ধ্যায় সান্তা ক্রুজের এক ক্যাফেতে বসে ছিলেন রিচার্ড গট। এক মার্কিন কর্মকর্তা তাঁকে জানান, শর্টওয়েভ রেডিওতে খবর এসেছে, চে ধরা পড়েছেন। ‘তিনি আহত। রাত না-ও পার করতে পারেন।’ পরদিন সিআইএর মাঠপর্যায়ের প্রথম প্রতিবেদনেও বলা হয়, বন্দীদের একজন হয়তো চে। তিনি হয় গুরুতর আহত, নয়তো খুব অসুস্থ। মারা যেতে পারেন।

ওয়াশিংটনেও খবর পৌঁছে যায়। ৯ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনকে লেখা এক মেমোতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ওয়াল্ট রস্টো জানান, অনিশ্চিত তথ্য বলছে, যে বলিভীয় ব্যাটালিয়নকে ‘আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলাম’, তারাই চেকে ধরেছে।

একই দিনের আরেক মেমোতে রস্টো জানান, রাত নেমে আসায় বন্দী ও আহত ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়া যায়নি। ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাদের মতে, সেনারা আসলে অপেক্ষা করছিলেন একটি নির্দেশের জন্য—বন্দীদের হত্যা করা হবে কি না।

স্কুলঘরে দুই ঘণ্টা

ফেলিক্স রদ্রিগেজ কিউবান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, সিআইএর কর্মী। বলিভিয়ায় তিনি ‘ফেলিক্স রামোস’ ছদ্মনামে বলিভীয় সেনা কর্মকর্তা সেজে কাজ করতেন। চে ধরা পড়ার পর তিনি উড়োজাহাজে চেপে লা হিগেরায় উড়ে যান। স্বল্পপাল্লার রেডিওতে সেনাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন, বন্দী সত্যিই চে। পরদিন সকালে রেঞ্জার কমান্ডারের সঙ্গে তিনি গ্রামে পৌঁছান।

হেলমসের মেমো বলছে, চে জিজ্ঞাসাবাদে রাজি হননি। তবে আলাপে আপত্তি করেননি। কথা বলেন কিউবার অর্থনীতি নিয়ে, ফিদেল কাস্ত্রো, কঙ্গো অভিযান আর বলিভিয়ায় গেরিলা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

কিউবায় গেরিলা বন্দীদের প্রসঙ্গে বলেন, দেশের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশকারী সব গেরিলা নেতার মৃত্যুদণ্ড কিউবার সরকার কার্যকর করেছে। বলেই থেমে যান। মুখে ফুটে ওঠে প্রশ্নের ভাব। বলিভিয়ার মাটিতে নিজের অবস্থান কী, তা বুঝতে পেরে চে হেসে ফেলেন।

চে বলেন, বলিভিয়ার কৃষকদের সাড়া না পেয়ে তিনি হতাশ। তবু শেষ পর্যন্ত তাঁর আদর্শই জিতবে। ব্যর্থ হলে বলিভিয়া ছেড়ে যাওয়ার কোনো পথ তিনি আগে থেকে ঠিক করে রাখেননি। হয় জিতবেন, নয়তো মৃত্যুবরণ করবেন। এ সিদ্ধান্ত তাঁর নেওয়া ছিল।

ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের হিসাবে, রদ্রিগেজ চের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা কথা বলেন। ১৯৭৫ সালে সিআইএর মহাপরিদর্শকের দপ্তরকে তিনি জানান, চেকে রক্ষা করতে পারবেন বলে তাঁর মনে হয়নি।

চেকে জীবিত রাখতে দূতাবাস যেন বলিভীয় সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করে, এই অনুরোধ জানিয়ে রদ্রিগেজ সিআইএর লাপাজের স্টেশনপ্রধান জন টিলটনের কাছে একটি বার্তা লেখেন। বার্তা পাঠাতে দেরি হয়ে যায়। তার আগেই বলিভিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা চের মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

৫০০, ৬০০, ৭০০ সংকেত

হেলমসের মেমো অনুযায়ী, আটকের পর বলিভিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সদর দপ্তর বন্দীদের কিছু সময় জীবিত রাখার নির্দেশ দেয়। লাপাজ আর লা হিগেরার মধ্যে টেলিগ্রাফে বার্তা পাঠানোর জন্য একটি সংকেত ঠিক করা হয়। ৫০০ মানে গুয়েভারা। ৬০০ মানে ‘জীবিত রাখো’। ৭০০ মানে ‘হত্যা করো’। রদ্রিগেজ অবশ্য পরে ৬০০ আর ৭০০-এর অর্থ উল্টো বলেছেন।

বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে লাপাজ থেকে চেকে হত্যার আদেশ আসে। ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ বলছে, ছদ্মপরিচয়ে বলিভীয় কর্মকর্তা হিসেবে থাকা রদ্রিগেজই আদেশটি গ্রহণ করেন। আর্কাইভের বিবরণে, দৃশ্যত সিআইএর নির্দেশ ছিল চেকে ‘জীবিত রাখতে সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে’।

তবু রদ্রিগেজের দাবি, হত্যার আদেশ তিনিই সেনাদের কাছে পৌঁছে দেন। সেনাদের বলেন, চের মুখে গুলি করা যাবে না, যাতে ক্ষতগুলো লড়াইয়ের ক্ষত বলে মনে হয়। চেকে মৃত্যুর খবরও তিনি নিজেই জানান।

চেকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন কে? এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে। ১১ অক্টোবর রস্টো প্রেসিডেন্ট জনসনকে জানান, সিআইএর তথ্য অনুযায়ী বলিভিয়ার সামরিক প্রধান জেনারেল আলফ্রেদো ওভান্দোর আদেশে চেকে হত্যা করা হয়। সেদিন ভায়েগ্রান্দেতে থাকা গট পরে লিখেছেন, আদেশটি ছিল বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর হাইকমান্ডের।

পাশের ঘরে গুলির শব্দ

চের সঙ্গে আলাপ চলার সময় পাশের ঘরে আটক ছিলেন আরও দুই বন্দী। হেলমসের মেমো অনুযায়ী তাঁদের নাম সিমিওন কুবা ও আনিসেতো রেইনাগা গোর্দিয়ো। একপর্যায়ে পাশের কক্ষে একঝাঁক গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে জানা যায়, সিমিওন কুবাকে হত্যা করা হয়েছে। একটু পর শোনা যায় একটি গুলির শব্দ। রেইনাগাকেও হত্যা করা হয়।

চের মৃত্যুদণ্ড যত দেরিতে সম্ভব কার্যকর করা হচ্ছিল। কিন্তু স্থানীয় কমান্ডারকে জানানো হয়, বেলা দেড়টার দিকে মরদেহ নিতে হেলিকপ্টার আসবে। এরপর বেলা ১টা ১৫ মিনিটে একঝাঁক গুলি চালিয়ে চেকে হত্যা করা হয়। হেলমসের ১১ অক্টোবরের আরেক মেমো বলছে, গুলি চলে একটি এম-২ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে।

চেকে গুলি চালানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন সৈনিক মারিও তেরান। এএফপির প্রতিবেদনে তাঁর ভাষ্য উদ্ধৃত হয়েছে এভাবে, ‘আমি শ্রেণিকক্ষে পৌঁছালে চে উঠে বসলেন। বললেন, “আপনি আমাকে মারতে এসেছেন?” তেরান বলেন, “আমি সংকুচিত হয়ে মাথা নিচু করলাম, কোনো উত্তর দিলাম না।”’

তেরান বলেন, চেকে তখন তাঁর বিশাল মনে হচ্ছিল। চের চোখ জ্বলজ্বল করছিল। চে তাঁকে বলেন, ‘শান্ত হও, ঠিকমতো নিশানা করো।’ তেরান দরজার দিকে এক পা পিছিয়ে প্রথম ঝাঁক গুলি চালান।

হেলমসের মেমোতে চের শেষ কথা অন্যভাবে লেখা, ‘আমার স্ত্রীকে বোলো আবার বিয়ে করতে। আর ফিদেল কাস্ত্রোকে বোলো, আমেরিকা মহাদেশে বিপ্লব আবার জেগে উঠবে।’ যিনি গুলি করেন, তাঁকে চে বলেন, ‘মনে রেখো, তুমি একজন মানুষকে হত্যা করছ।’

মেমোর শেষ বাক্যটি এ রকম, বলিভীয় সেনাদের পর্যবেক্ষণে থাকার পুরো সময়ে গুয়েভারা একবারও স্থিরতা হারাননি।

হত্যার পর রদ্রিগেজ চের রোলেক্স ঘড়িটি নিয়ে নেন।

ভায়েগ্রান্দেতে বিকেল ৫টা

রিচার্ড গট সেদিন সকাল নয়টায় পৌঁছান ভায়েগ্রান্দেতে। শহরটি তখন গেরিলাবিরোধী অভিযানে সেনাবাহিনীর সম্মুখঘাঁটি। লা হিগেরায় যাওয়ার অনুমতি তিনি পাননি।

গট লিখেছেন, দুপুরের খাওয়ার সময় অষ্টম ডিভিশনের কমান্ডার কর্নেল হোয়াকিন সেন্তেনো আনাইয়া অনানুষ্ঠানিক এক সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। জানান, চে ধরা পড়েছেন এবং মারা গেছেন। বিকেলে জেনারেল ওভান্দোসহ সেনাবাহিনীর হাইকমান্ডের অনেকে একটি পুরোনো ডিসি-৬ বিমানে লাপাজ থেকে লা হিগেরায় আসেন।

সন্ধ্যার দিকে ভায়েগ্রান্দের প্রায় সব মানুষ ঘাসে ঢাকা বিমানবন্দরের পাশে জড়ো হন। বিকেল পাঁচটায় হেলিকপ্টারটি নামে। ল্যান্ডিং রেলে স্ট্রেচারসহ বাঁধা চের মরদেহ। গটের হিসাবে, প্রায় চার ঘণ্টা আগে তাঁকে গুলি করা হয়েছিল।

একটি ছোট শেভ্রোলে ভ্যানে করে মরদেহ নেওয়া হয় শহরের ছোট হাসপাতালে। রাখা হয় খোলা একটি লন্ড্রিঘরে, ধোয়ার তাকের ওপর। পুরো কাজ তদারক করছিলেন ‘এদুয়ার্দো গনসালেস’ নামে পরিচিত কিউবান বংশোদ্ভূত এক সিআইএ কর্মী। পরে জানা যায়, তাঁর আসল নাম গুস্তাভো ভিয়োলদো। আধঘণ্টার মতো গট মরদেহের খোলা চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দুই চিকিৎসক তখন এমবামিং তরল দিয়ে মরদেহ সংরক্ষণের চেষ্টা করছিলেন।

পরদিন বলিভিয়ার সরকার লাপাজ থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে আসে। তখনই তোলা হয় চের মরদেহের সেই বিখ্যাত ছবিগুলো। সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, চে লড়াইয়ের ক্ষতে মারা গেছেন, আটকের সময় তিনি অচেতন ছিলেন।

তবে হেলমসের কাছে তথ্য ছিল উল্টো। পায়ে ক্ষত থাকলেও চের শারীরিক অবস্থা মোটামুটি ভালো ছিল।

গটের বিবরণে, সেদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় দুই চিকিৎসক ময়নাতদন্ত করেন। তাতে স্পষ্ট হয়, আটকের অনেক পরে চেকে গুলি করা হয়েছিল। পরিচয় নিশ্চিত করতে জেনারেল ওভান্দো চের মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। ঘটনাস্থলের বলিভীয় কর্মকর্তারা রাজি হননি, সিআইএ কর্মীও না।

এর বদলে মুখের একটি ছাঁচ, অর্থাৎ ‘মৃত্যু-মুখোশ’ তৈরি করা হয়। তবে কাজটি পণ্ড হয়। এরপর চের দুই হাত কেটে ফেলা হয়। চার দিন পর আঙুলের ছাপ পরীক্ষার জন্য আর্জেন্টিনার পুলিশের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের কাছে হাত দুটি পাঠানো হয়।

১১ অক্টোবর খুব ভোরে মরদেহ ঘাসে ঢাকা বিমানবন্দরে সমাহিত করা হয়, ভিয়োলদোর তত্ত্বাবধানে। জায়গাটি তীর্থস্থান হয়ে উঠতে পারে, এই আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ গেরিলাদের স্থানীয় কবরস্থানে সমাহিত করেনি।

ওয়াশিংটনের হিসাব

১১ অক্টোবর রস্টো প্রেসিডেন্ট জনসনকে লেখেন, চে যে মারা গেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা ‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’। সিআইএ তখনো নিশ্চিত উত্তর দিচ্ছিল না। রস্টো চেকে হত্যার সিদ্ধান্তকে বলেন ‘বোকামি’। তবে তাঁর মতে, বলিভিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্তটি ‘বোধগম্য’।

একই মেমোতে রস্টো মনে করিয়ে দেন, চেকে যে বলিভীয় সেকেন্ড রেঞ্জার ব্যাটালিয়ন কোণঠাসা করেছিল, ওই বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল মার্কিন গ্রিন বেরেট।

১৮ অক্টোবর বলিভিয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডগলাস হেন্ডারসন চের মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে ওয়াশিংটনে চিঠি পাঠান। প্রমাণ হিসেবে ছিল ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আর কেটে ফেলা হাত থেকে আর্জেন্টিনার পুলিশের করা আঙুলের ছাপের বিশ্লেষণ।

হেন্ডারসন একটি বিষয় আলাদাভাবে লক্ষ করেন। মৃত্যুর নথিগুলোয় মৃত্যুর সময়ই লেখা হয়নি। তাঁর মতে, এটি ছিল সশস্ত্র বাহিনীর আগের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে ফারাক মেটানোর চেষ্টা।

তিন দশক পর

১৯৯৫ সালে বলিভিয়ার অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মারিও বারগাস সালিনাস ২৮ বছরের নীরবতা ভাঙেন। মার্কিন সাংবাদিক ও চের জীবনীকার জন লি অ্যান্ডারসনকে তিনি জানান, চের মরদেহ সরিয়ে ফেলার কাজে তিনজন সামরিক কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন, তিনি তাঁদের একজন।

চেকে সমাহিত করা হয়েছে ভায়েগ্রান্দের বিমানবন্দরের অবতরণক্ষেত্রের নিচে। সে বছরের নভেম্বরে অ্যান্ডারসন তথ্যটি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশ করেন। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট গনসালো সানচেস দে লোসাদা তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন।

লাতিন আমেরিকায় সহিংসতায় নিহত মানুষের দেহাবশেষ শনাক্তে কাজ করা সংগঠন আর্জেন্টাইন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজি টিম (ইএএএফ) আর কিউবার বিশেষজ্ঞরা ১৮ মাস ধরে খোঁজ চালান। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন, শনিবার, ভায়েগ্রান্দের একটি গণকবর থেকে চের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। একই কবরে আরও ছয়টি মরদেহ শনাক্ত করা হয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, কিছু হাড়ে ফরমালডিহাইড বা মিথানলের আপাতচিহ্ন দেখে বিশেষজ্ঞদের ধারণা হয়, সেগুলো চের হতে পারে। গট লিখেছেন, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের মধ্যে ছিল হাতবিহীন একটি কঙ্কাল।

১৯৯৭ সালের ১৭ অক্টোবর কিউবার সান্তা ক্লারায় চেকে সমাহিত করা হয়। ফিদেল কাস্ত্রো ও হাজারো কিউবান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে এই শহরেই চে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সান্তা ক্লারার চূড়ান্ত লড়াইয়ে।

দেহাবশেষটি সত্যিই চের কি না, তা নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠেছে। ২০০৭ সালে মার্কিন সাময়িকী দ্য নিউ রিপাবলিকে লেখেন যুক্তরাষ্ট্রের ইনডিপেনডেন্ট ইনস্টিটিউটের সেন্টার অন গ্লোবাল প্রসপারিটির পরিচালক আলভারো বারগাস ইয়োসা।

স্পেনের এল পাইস পত্রিকায় প্রকাশিত ফরাসি সাংবাদিক বেরত্রঁ দে লা গ্রাঞ্জের অনুসন্ধানের বরাতে তিনি দাবি করেন, ১৯৬৭ সালের ময়নাতদন্তের সঙ্গে ১৯৯৭ সালের ফরেনসিক প্রতিবেদন মেলে না। তবে উদ্ধারকাজে যুক্ত ইএএএফ দেহাবশেষটিকে চের বলেই শনাক্ত করেছে।

এচার্ট ২০১৭ সালে লিখেছেন, লা হিগেরার সেই স্কুলঘর সংস্কার করে জাদুঘর বানানো হয়েছে। আর ভায়েগ্রান্দের হাসপাতালের লন্ড্রিঘরটি হয়ে উঠেছে একধরনের তীর্থস্থান। প্লাস্টারের দেয়ালে দর্শনার্থীরা নিজেদের নাম আর কথা খোদাই করে যান।

তথ্যসূত্র

১. রিচার্ড হেলমস, সিআইএর পরিচালকের মেমো, ‘স্টেটমেন্টস বাই আর্নেস্তো “চে” গুয়েভারা প্রায়র টু হিজ এক্সিকিউশন ইন বলিভিয়া’, ১৩ অক্টোবর ১৯৬৭। ফরেন রিলেশনস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, ১৯৬৪–১৯৬৮, খণ্ড ৩১, নথি ১৭২। অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।

২. জন প্রাডোস ও আর্তুরো হিমেনেস-বাকার্দি, ‘চে গুয়েভারা অ্যান্ড দ্য সিআইএ ইন দ্য মাউন্টেনস অব বলিভিয়া’, ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ, ব্রিফিং বুক নম্বর ৭২৫, ৯ অক্টোবর ২০২০।

৩. পিটার কর্নব্লু (সম্পাদিত), ‘চে গুয়েভারা’স হেয়ার অকশনড অফ’, ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ ইলেকট্রনিক ব্রিফিং বুক নম্বর ২৩২, ২৫ অক্টোবর ২০০৭।

৪. রিচার্ড গট, ‘দ্য রিবস অব রোসিনান্তে’, লন্ডন রিভিউ অব বুকস, খণ্ড ১৯, সংখ্যা ১৬, ২১ আগস্ট ১৯৯৭।

৫. আর্জেন্টাইন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজি টিম (ইএএএফ), ‘বলিভিয়া’, ইএএএফের ওয়েবসাইট।

৬. এএফপি, ‘এমবাহাদোর বোলিবিয়ানো এন মেহিকো কাপতুরো কন বিদা আল চে গেবারা’, লাপাজ, ২ আগস্ট ২০০১ (কিউবানেটে প্রকাশিত)।

৭. মিলান সিমে মার্তিনিচ, ‘বলিভিয়ান জেনারেল গ্যারি প্রাডো, হু লেড আর্মি ইউনিট দ্যাট ক্যাপচারড চে গুয়েভারা ইন ১৯৬৭, ডাইজ অ্যাট ৮৪’, দ্য উইক, ৯ মে ২০২৩।

৮. জুলিও এচার্ট, ‘অন দ্য ট্রেইল অব চে গুয়েভারা, ৫০ ইয়ার্স অন’, নিউ ইন্টারন্যাশনালিস্ট, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭।

৯. লিয়ান্দ্রো কাতস, ‘চে গুয়েভারা ইন বলিভিয়া: আ ক্রনোলজি’ (দেয়ালচিত্রের লেখা, ১৯৯৫–১৯৯৭); এতে উদ্ধৃত রয়টার্স ও গ্রানমা ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন।

১০. আলভারো বারগাস ইয়োসা, ‘হুজ বেরিড ইন চে’স টুম্ব?’, দ্য নিউ রিপাবলিক, ৩১ অক্টোবর ২০০৭।