‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার রথের দুটি চাকা হলো বার ও বেঞ্চ। তারা একে অপরের পরিপূরক ও পরস্পর নির্ভরশীল। ন্যায়বিচারের সুষ্ঠু সম্পাদনে উভয়ের ভূমিকাই অপরিহার্য।’ [দ্য স্টেট বনাম মানসুর-উর-রেহমান খান আফ্রিদি, পিএলডি ২০০০ লাহোর ৯০(ডিবি) প্যারা ১২]

আদালত শুধু একটি কক্ষ নন; এটি রাষ্ট্রের সেই অনন্য পরিসর, যেখানে আবেগের ওপর যুক্তি, শক্তির ওপর আইন এবং ব্যক্তির ওপর প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। আদালতকক্ষে কণ্ঠস্বর উঁচু হতে পারে, যুক্তি হতে পারে তীক্ষ্ণ, এমনকি বিচারক ও আইনজীবীর মধ্যে মতবিনিময় কখনো কখনো উত্তপ্তও হতে পারে; কিন্তু যখন সেই উত্তাপ আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে স্পর্শ করে, তখন বিষয়টি আর ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির বিরোধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে বিচারব্যবস্থার সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন।

তথ্য গোপন করে মামলা পরিচালনার অভিযোগে এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করাকে কেন্দ্র করে শুনানিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে সম্প্রতি বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে এজলাস ত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ। (টিবিএস বাংলা, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

এটি নিছক একটি ‘কোর্টরুম ইনসিডেন্ট’, নাকি এর মধ্যে যেমন রয়েছে আদালতের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন, তেমনি রয়েছে বার ও বেঞ্চের সম্পর্কের অস্বস্তিকর ইঙ্গিত। বিচারপতিদের এভাবে এজলাস ত্যাগ অভূতপূর্ব নয়। এটিও একরকম বিচারিক ভাষা, বিচারিক সংযম। এই বিচারিক সংযমের অর্থ আইনজীবীদেরও বুঝতে হবে। এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশীয় বিচারব্যবস্থার অভিজ্ঞতার পাঠ গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় বিচারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির ওপর জোর দিয়ে এসেছে—কোনো আইনজীবী বা মামলার পক্ষ উত্তপ্ত আচরণ, অসৌজন্য বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো বিচারপতিকে একটি মামলা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করতে পারেন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ রায় ইন্দোর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বনাম মনোহর লাল (২০২০) মামলায় বিচারপতির রিকিউজাল (রিকিউজাল শব্দের বাংলা অর্থ হলো স্বার্থের সংঘাত বা পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কায় কোনো বিচারক বা জুরির বিচারকার্য বা মামলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া বা ‘অযোগ্য ঘোষণা করা’) আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগের প্রবণতাকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়।

আদালত স্পষ্ট করেন, কোনো পক্ষ বা আইনজীবী যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চান, যাতে তাঁরা নির্ধারণ করতে পারেন কোন বিচারপতি মামলা শুনবেন আর কে শুনবেন না, তাহলে তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মৌলিক ভিত্তির ওপর আঘাত। এ ধরনের প্রবণতাকে অনেক সময় ‘বেঞ্চ হান্টিং’ বলা হয়। অর্থাৎ নিজের পছন্দ অনুযায়ী বেঞ্চ পাওয়ার জন্য পরিস্থিতি তৈরি করা। এটি শুধু আদালতের শৃঙ্খলা নষ্ট করে না, বরং বিচারিক নিরপেক্ষতার ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিচারপতি কোন মামলা শুনবেন, তা কোনো আইনজীবী বা মামলার পক্ষ নির্ধারণ করতে পারেন না। বেঞ্চ গঠন ও মামলা বণ্টনের প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ও বিচারিক নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে।

বার ও বেঞ্চ হলেন ন্যায়বিচারের রথের দুটি অপরিহার্য চাকা। একটি ছাড়া অন্যটির পথচলা অসম্ভব। বিচারক ও আইনজীবীর ভূমিকা আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য অভিন্ন—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। বেঞ্চের দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে বিচার করা। বারের দায়িত্ব সততা, দক্ষতা ও পেশাগত শৃঙ্খলার সঙ্গে আদালতকে সহায়তা করা। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌজন্য ও সহযোগিতাই একটি সুস্থ বিচারব্যবস্থার ভিত্তি।

তবে আদালতের কর্তৃত্ব রক্ষার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি উত্তেজনাকে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে। বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার ক্ষমতায় নয়; বরং তার সংযমে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও এ শিক্ষাই দেয়। ২০২৪ সালে প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় আদালতের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করতে এক আইনজীবীকে সতর্ক করেছিলেন এবং প্রয়োজন হলে তাঁকে আদালত থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন।

আবার বিচারক ও আইনজীবীর মধ্যে সংঘাতের ঘটনায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের ‘পেশেন্স অ্যান্ড কম্প্যাশন’ বা ধৈর্য ও সহমর্মিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় বার–বেঞ্চ বিরোধ সমাধানে ‘গ্রিভ্যান্স রিড্রেস্যাল কমিটি’ বা অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আদালতের প্রতি অশোভন আচরণের পরও প্রতিটি ঘটনা তাৎক্ষণিক কনটেম্পট অ্যাকশনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। কারণ, আদালতের কর্তৃত্ব রক্ষা এবং প্রতিটি উত্তেজনাকে শাস্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করা—দুটি এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাটিও এ জায়গা থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আদালত ত্যাগ কোনো বিচারিক আদেশ নয়, এটি কোনো লিগ্যাল প্রিসিডেন্ট (নজির) সৃষ্টি করে না। আদালত থেকে উঠে যাওয়া মানেই অসম্মান প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। আবার আদালতের মর্যাদা রক্ষায় সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করাও বেআইনি নয়। প্রশ্ন হলো, এ পদক্ষেপ কি বিচারিক সংযমের (জুডিশিয়াল রেস্ট্রেইন) বহিঃপ্রকাশ, নাকি ইনস্টিটিউশনাল কনফ্রন্টেশন (প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব)?

গণতন্ত্রে ন্যায়বিচার প্রদান একটি রথের মতো। এই রথ এগিয়ে নিতে হলে এর প্রতিটি চাকা সমন্বয় ও ভারসাম্যের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এই চাকার মধ্যে রয়েছে বেঞ্চ, বার, আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও জনগণ। বেঞ্চ হলো আইনের ব্যাখ্যাকারী ও আইনের শাসনের রক্ষক। বার হলেন সেই শক্তি, যাঁরা তথ্য, আইন ও যুক্তির মাধ্যমে আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করেন। আইনসভা আইন তৈরি করে, নির্বাহী বিভাগ তা বাস্তবায়ন করে এবং জনগণ ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত সুফলভোগী।

বিশেষ করে বার ও বেঞ্চ হলেন ন্যায়বিচারের রথের দুটি অপরিহার্য চাকা। একটি ছাড়া অন্যটির পথচলা অসম্ভব। বিচারক ও আইনজীবীর ভূমিকা আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য অভিন্ন—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। বেঞ্চের দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে বিচার করা। বারের দায়িত্ব সততা, দক্ষতা ও পেশাগত শৃঙ্খলার সঙ্গে আদালতকে সহায়তা করা। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌজন্য ও সহযোগিতাই একটি সুস্থ বিচারব্যবস্থার ভিত্তি।

আদালতকক্ষের উত্তাপকে ব্যক্তিগত মর্যাদার সংঘাতে পরিণত না করে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করাই বাঞ্ছনীয়। কারণ, বিচার বিভাগের শক্তি কেবল তার আদেশ দেওয়ার ক্ষমতায় নয়; তার নৈতিক কর্তৃত্বেও। শেষ পর্যন্ত বিচারপতি ও আইনজীবী কেউই আদালত নন। তাঁরা আদালতের সেবক। আদালত তাঁদের ঊর্ধ্বে। আর একটি মহান বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার কঠোরতা নয়, তার সংযম; তার উচ্চকণ্ঠ নয়, তার ন্যায়বোধ।

ক. সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট একটি কোর্ট অব রেকর্ড, এর আদালত অবমাননা (কনটেম্পট) আমলে নেওয়ার ক্ষমতাসহ আদালত হিসেবে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ আদালতের কর্তৃত্ব ও মর্যাদা রক্ষার জন্য আদালতের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতা রয়েছে।

খ. আদালতকক্ষে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রাথমিক ক্ষমতা বিচারকেরই। শুনানি পরিচালনা, আইনজীবীকে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া, অপ্রাসঙ্গিক বা অসংযত আচরণ থামানো, প্রয়োজনে শুনানি মুলতবি করা—এসব বিচারিক ‘কেস ম্যানেজমেন্ট’–এর অংশ। এটি সংবিধানের ১০৭ অনুচ্ছেদ দ্বারা ক্ষমতায়িত।

গ. আদালতের মর্যাদায় হস্তক্ষেপ হলে কনটেম্পটের প্রশ্ন উঠতে পারে। কোনো আইনজীবী বা পক্ষের আচরণ যদি আদালতের কার্যক্রমকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করে বা আদালতের কর্তৃত্বকে অবমাননা করে, তখন ‘কনটেম্পট জুরিসডিকশন’ (আদালত অবমাননার এখতিয়ার) প্রাসঙ্গিক হতে পারে। সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদের কোর্ট অব রেকর্ড স্ট্যাটাস এখানে মৌলিক সাংবিধানিক ভিত্তি।

ঘ. বিচারপতির আদালত ত্যাগ—আইনগতভাবে কীভাবে দেখা উচিত? আইনমতে, এটিকে ‘বিচারপতির ক্ষমতা প্রয়োগ’ বা রিকিউজাল হিসেবে সরাসরি চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী বিচারপতি সাময়িকভাবে এজলাস ত্যাগ করতে পারেন, যেমন উত্তেজনা প্রশমিত করা, আদালতের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বা কার্যক্রম স্থগিত করা। আদালতকক্ষে বিচারিক পরিবেশ নিশ্চিতকরণে বিচারপতিই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকেন, কিন্তু আইনজীবী ও অন্যদের এ ব্যাপারে সহযোগিতা অপরিহার্য।

এখানে মূলনীতি হওয়া উচিত পরিস্থিতির কারণে উত্তেজনার জবাব উত্তেজনায় নয়, জুডিশিয়াল অথরিটি ও জুডিশিয়াল রেসট্রেইন্ট দিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ এজলাস ত্যাগ করা অভূতপূর্ব—এমন কথা যেমন বলা যায় না, তেমনি এটিকে বিচারিক প্রতিবাদের একটি নিয়মিত পদ্ধতি হিসেবেও দেখা যায় না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এজলাস ত্যাগ ও রিকিউজাল এক জিনিস নয়। তবে এসব পরিস্থিতিতে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ বাঞ্ছনীয়। কোর্টরুম এটিকেট ও ডিসেন্সির প্রাথমিক পাঠ আইনজীবীদের পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করার বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য শিক্ষা খুবই পরিষ্কার। বেঞ্চ ও বার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান নন; তাঁরা একই বিচারব্যবস্থার দুটি অপরিহার্য অংশ। আইনজীবীর স্বাধীনতা বিচারকের কর্তৃত্বকে দুর্বল করে না। আবার বিচারকের কর্তৃত্বও আইনজীবীর পেশাগত স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করার অনুমতি দেয় না।

আদালতকক্ষের উত্তাপকে ব্যক্তিগত মর্যাদার সংঘাতে পরিণত না করে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করাই বাঞ্ছনীয়। কারণ, বিচার বিভাগের শক্তি কেবল তার আদেশ দেওয়ার ক্ষমতায় নয়; তার নৈতিক কর্তৃত্বেও। শেষ পর্যন্ত বিচারপতি ও আইনজীবী কেউই আদালত নন। তাঁরা আদালতের সেবক। আদালত তাঁদের ঊর্ধ্বে। আর একটি মহান বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার কঠোরতা নয়, তার সংযম; তার উচ্চকণ্ঠ নয়, তার ন্যায়বোধ।

এম এম খালেকুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, [email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব