ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক ছাত্রীর নিকাব পরা নিয়ে শিক্ষকের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। একদল নারী শিক্ষার্থীর এই প্রতিবাদের মুখে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে যে, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তরের একটি ক্লাস চলাকালীন সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব এক ছাত্রীর নিকাব পরা নিয়ে কথা বলেন। নিকাব পরার কারণে তিনি অস্বস্তি বোধ করছেন বলে জানান এবং ওই ছাত্রীকে ক্লাসের পেছনে গিয়ে বসতে বলেন। শিক্ষকের এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে নিকাব পরিহিত ওই ছাত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একপর্যায়ে ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই প্রতিবাদস্বরূপ কক্ষ ত্যাগ করেন।

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন একদল নারী শিক্ষার্থী। ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমার নেতৃত্বে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীর কাছে পাঁচ দফা দাবি সম্বলিত একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। তাঁদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে, তাঁকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের একাডেমিক মূল্যায়ন ও পাঠদান থেকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন এ ঘটনায় একাডেমিক ক্ষতি, হয়রানি বা প্রতিহিংসার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর আগে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আরও একদল নারী শিক্ষার্থী একই দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন।

এদিকে, বেলা দেড়টায় সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা।

পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ইংরেজি বিভাগে ক্লাস চলাকালে এক ছাত্রীর বোরকা বা নিকাব নিয়ে শিক্ষকের মন্তব্যের পর ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। এ বিষয়ে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে মৌখিক অভিযোগের পরিবর্তে লিখিত অভিযোগ নিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর বিভাগীয় একাডেমিক কমিটিতে আলোচনা করে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।”

সহ-উপাচার্য আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী আরও বলেন, “ক্লাসে কোনো শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। শিক্ষার্থীরা যাতে স্বাভাবিকভাবে ক্লাস করতে পারে এবং কোনো ধরনের নিগ্রহের শিকার না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন সচেষ্ট থাকবে।”

শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী। তিনি জানান, সভায় শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক যে কোর্সগুলো নিতেন, সেগুলো অন্য শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুব আপাতত কোনো কোর্সের ক্লাস নিতে পারবেন না।

এই পুরো ঘটনায় বক্তব্য জানতে সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ফোন করা হলে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, “বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলবেন।”