খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় ধান রোপণে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টার নামক যন্ত্রের সাহায্যে এখন ধান রোপণ করা হচ্ছে, যা প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে অনেক দ্রুত এবং সাশ্রয়ী। এই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ধান রোপণের ফলে সময় ও খরচের বড় ধরনের সাশ্রয় হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। তথ্যানুসারে, প্রচলিত পদ্ধতিতে ৩৩ শতাংশ জমিতে ধান রোপণ করতে যেখানে প্রায় ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়, সেখানে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার করে একই পরিমাণ জমিতে খরচ হচ্ছে মাত্র এক হাজার টাকা।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) উপজেলার গঙ্গারামপুর মধ্যপাড়া এলাকায় রাইস ট্রান্সপ্লান্টার প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি কৃষক মাঠ দিবসের আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (সিমিট), যশোর অঞ্চল এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা প্রদান করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লোকজ।

খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “কৃষিতে শ্রমিকের সংকট, শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি এবং সময়মতো কৃষিকাজ শেষ করার প্রয়োজনীয়তার কারণে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ধান রোপণের মতো শ্রমনির্ভর কাজে যন্ত্রের ব্যবহার কৃষকের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, উদ্যোক্তা ও কৃষকদের সমন্বিত উদ্যোগে এ প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সলিডারিডাট-এর কনসালট্যান্ট ও কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যক্ষ কৃষিবিদ ড. এস এম ফেরদৌস, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), সাতক্ষীরার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মামুনুর রশিদ, সিমিটের যশোর অঞ্চলের সমন্বয়ক কৃষিবিদ মো. জাকারিয়া হাসান, ক্লাইমেট স্মার্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মো. ফজলুল হক মনি, পার্টনার প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার কৃষিবিদ মো. মোসাদ্দেক হোসেন, বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক এবং লোকজের নির্বাহী পরিচালক দেবপ্রসাদ সরকার।

এছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন রাইস ট্রান্সপ্লান্টার উদ্যোক্তা আল আজাদ, এই যন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষক চন্দনা মহালদার ও অরুণ রায়, বৃত্তিশলুয়া গ্রামের আগ্রহী কৃষক হিরণময় মণ্ডল, এসিআই মোটরসের এরিয়া ম্যানেজার শাহীন রেজা এবং সিমিটের প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর মো. হাফিজুর রহমান।

আলোচনা সভায় কৃষকরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে ধান রোপণের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট এবং ক্রমবর্ধমান খরচ এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে একই কাজ অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে এবং খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে কৃষকদের মূল্যবান সময় ও শ্রম—উভয়ই সাশ্রয় হচ্ছে।

আলোচকরা মনে করেন, কেবল যন্ত্র সরবরাহ করলেই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। এর জন্য মানসম্মত চারা উৎপাদন, দক্ষ চালক ও মেকানিকের availability এবং স্থানীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য যন্ত্রসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে কৃষকের সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও তৈরি হবে।

সভায় আরও জানানো হয়, ধান রোপণে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, শ্রম ও সময় সাশ্রয় এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়ে বটিয়াঘাটায় এ বছর প্রথমবারের মতো ১৫ একর জমিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়েছে। মাঠভিত্তিক এই প্রদর্শনী ও কৃষক সম্পৃক্ত কার্যক্রমেরই অংশ হিসেবে এই মাঠ দিবসের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।