দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ৩৩০ কোটি ডলারের বৈদেশিক ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। এই ঋণের বড় একটি অংশ স্বল্পমেয়াদি এবং কঠিন শর্তের। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে ধরা হলে দেশীয় মুদ্রায় এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনমনীয় ঋণ–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির (এসসিএনসিএল) ৪৬তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় এই ঋণ প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হয়। মোট ৩৩০ কোটি ডলারের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের একটি নতুন প্রকল্পের জন্য ২০ কোটি ডলার এবং জ্বালানি খাতের জরুরি আমদানির জন্য পূর্ব অনুমোদনের আওতায় ৩১০ কোটি ডলার বরাদ্দ রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ২০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কমিটি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এডিবির এই ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর) সঙ্গে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ স্প্রেড যুক্ত করে। ২৫ বছর মেয়াদি এই ঋণের জন্য পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছে। এছাড়া এতে শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ ম্যাচিউরিটি প্রিমিয়াম এবং শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ প্রযোজ্য হবে।

এই ঋণের গ্র্যান্ট এলিমেন্ট মাত্র ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। যেহেতু গ্র্যান্ট এলিমেন্ট ২৫ শতাংশের নিচে, তাই এটিকে কঠিন শর্তের বা অনমনীয় ঋণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। মূলত গ্র্যান্ট এলিমেন্টের মাধ্যমেই পরিমাপ করা হয় যে, বাজারদরের তুলনায় ঋণটি কতটা সুবিধাজনক শর্তে দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০ কোটি ডলারের এই ঋণের মূল উদ্দেশ্য হলো ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস) এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি করা।

প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩১ সালের জুলাইয়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় নতুন ও বিদ্যমান উপকেন্দ্র সম্প্রসারণ, মাটির নিচে ও ওপরে লাইন নির্মাণ, ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর স্থাপন এবং ডিজিটাল তদারকি ও ফল্ট লোকেটর প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। এর ফলে কারিগরি লোকসান বা সিস্টেম লস কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ও উন্নত মানের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করতে এবং নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখতে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩১০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি অনমনীয় ঋণের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে এসসিএনসিএল।

এই ঋণের বরাদ্দের মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ২৫০ কোটি ডলার এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) এলএনজি আমদানির জন্য ৬০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে।

ইআরডির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস মেয়াদি এই ঋণের সুদের হার ধরা হয়েছে ছয় মাসের টার্ম এসওএফআরের সঙ্গে ১ দশমিক ৭০ শতাংশ যোগ করে। এটি আগের বছরের বার্ষিক হারের তুলনায় কিছুটা কম।

আইটিএফসি তাদের নিজস্ব উৎস থেকে ৬০ কোটি ডলার সংস্থান করবে এবং অবশিষ্ট ২৫০ কোটি ডলার দুই বা ততোধিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের যৌথ অর্থায়নের মাধ্যমে সংগৃহীত হবে। দেশের জ্বালানি সরবরাহশৃঙ্খল জরুরি ভিত্তিতে অটুট রাখতে কমিটি এই ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনমনীয় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুসরণের বিষয়টি সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, বৈদেশিক অনমনীয় ঋণের দায় পরিশোধের ব্যয় কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ বা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নিজস্ব আয় থেকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার বিবেচনা করেই এই ঋণগুলো অনুমোদন করা হয়েছে।