প্রতিবছর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। পরে অর্থনীতিও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? গণিতের জন্য কোনো নোবেল পুরস্কার নেই। কেন?

আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৫ সালে তাঁর উইল লিখে যান। সেখানে পাঁচটি ক্ষেত্রে পুরস্কারের কথা বলা হয়েছিল—পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তি। গণিতের নাম সেখানে ছিল না।

নোবেল কেন গণিতকে বাদ দিয়েছিলেন, এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা তিনি দিয়ে যাননি। অর্থাৎ ‘গণিতকে তিনি পছন্দ করতেন না’—এমন ধারণা থাকলেও, এটিই যে গণিত বাদ দেওয়ার নিশ্চিত কারণ, তার প্রমাণ নেই।

তবে তিনি যে পাঁচটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছিলেন, সেগুলোর সঙ্গে তাঁর নিজের আগ্রহ ও মূল্যবোধের কিছু সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হয়। নোবেল নিজে ছিলেন রসায়নবিদ, উদ্ভাবক ও প্রকৌশলী। তাঁর জীবনের বড় অংশের কাজও রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই এ দুটি ক্ষেত্র তাঁর বিশেষ আগ্রহের ছিল, এটাই স্বাভাবিক।

শান্তির ক্ষেত্রেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল অস্ট্রীয় শান্তিকর্মী ও লেখক বার্থা ভন শুটনারের সঙ্গে। ১৮৮৯ সালে শুটনার লেখেন যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস ‘লে ডাউন ইয়োর আর্মস’। পরে তিনি ইউরোপের শান্তি আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। নোবেলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও শান্তি নিয়ে আলোচনা নোবেলের শান্তি পুরস্কারের পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করেছিল বলে নোবেল-সংক্রান্ত গবেষণায় উল্লেখ আছে।

অর্থাৎ নোবেল কেন পাঁচটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছিলেন, এর পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ ও মূল্যবোধের ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু গণিত কেন বাদ পড়ল, তার নির্দিষ্ট উত্তর সেখান থেকেও পাওয়া যায় না।

একটি বহুল প্রচলিত গল্পের কেন্দ্রে আছেন সুইডিশ গণিতবিদ গোস্তা মিত্তাগ-লেফলার। গল্পটি হলো, নোবেল নাকি আশঙ্কা করতেন, গণিতের পুরস্কার চালু করলে মিত্তাগ-লেফলার একদিন সেই পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন। তাই ব্যক্তিগত বিরাগ থেকে তিনি গণিতকে নোবেল পুরস্কারের তালিকায় রাখেননি।

আরেক সংস্করণে বলা হয়, মিত্তাগ-লেফলার নাকি নোবেলের প্রেমিকা সোফি হেসের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। সে কারণেই নোবেল গণিতবিদদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।

শুনতে বেশ নাটকীয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই গল্পের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

গণিতের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা ম্যাকটিউটর হিস্ট্রি অব ম্যাথমেটিকস আর্কাইভ এবং গণিতবিদ লার্স গোর্ডিং ও লার্স হোরমান্ডারের আলোচনায় এ ধরনের গল্পকে ভিত্তিহীন কিংবদন্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এমনকি মিত্তাগ-লেফলার ও নোবেলের মধ্যে এমন ব্যক্তিগত বিরোধের নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায় না।

ফলে প্রেমঘটিত প্রতিশোধের গল্পটি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার কারণ নেই।

আছে। তবে সেগুলোকে নিশ্চিত কারণ বলা যাবে না। গোর্ডিং ও হোরমান্ডারের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, নোবেল গণিতকে তুলনামূলকভাবে তাত্ত্বিক ও কম ব্যবহারিক একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখতেন। তাঁর পুরস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল মানবজাতির জন্য বড় ধরনের উপকার বয়ে আনা কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া।

আজকের পৃথিবীতে এই ধারণা আমাদের কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে। মহাকাশ গবেষণা, কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রকৌশল থেকে শুরু করে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান—প্রায় সব ক্ষেত্রেই গণিতের মৌলিক ভূমিকা আছে।

কিন্তু উনিশ শতকের শেষ দিকে নোবেল গণিতের এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারিক গুরুত্বকে কীভাবে দেখতেন, তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না।

আরেকটি বিষয়ও উল্লেখ করা হয়। নোবেলের সময় স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় গণিতবিদদের জন্য অন্য পুরস্কার ও পুরস্কার প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা ছিল। ফলে গণিতের জন্য আলাদা নোবেল পুরস্কার চালু করার প্রয়োজন তিনি অনুভব না করে থাকতে পারেন। কিন্তু এটিও অনুমান।

মিত্তাগ-লেফলার ও নোবেলের মধ্যে গণিত নিয়ে একেবারেই কোনো সম্পর্ক ছিল না, এমনও নয়। মিত্তাগ-লেফলার ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুইডিশ গণিতবিদ। পরে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয় মিত্তাগ-লেফলার ইনস্টিটিউট, যা গণিত গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু নোবেল কেন গণিতকে বাদ দিলেন, এর নিশ্চিত উত্তর আজও আমাদের জানা নেই। হতে পারে, তিনি গণিতকে আলাদা একটি পুরস্কারের ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেননি। হতে পারে, তিনি এটিকে অন্য কোনো বিজ্ঞানের অংশ হিসেবেই দেখতেন। আবার এমনও হতে পারে, গণিতের কথা তাঁর মাথায়ই আসেনি।

কোনোটিই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না।

১৯৩৬ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে ফিল্ডস মেডেল, যা গণিতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। আর ২০০৩ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে আবেল পুরস্কার, গণিতের জন্য আরেকটি অত্যন্ত সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

অর্থাৎ নোবেল পুরস্কারে গণিত নেই, এটা সত্য। কিন্তু ‘কেন নেই’—এ প্রশ্নের উত্তরে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে গল্প আমরা শুনি, সেটাই যে সত্যি, এমনটা বলার মতো প্রমাণ নেই।

বরং সবচেয়ে সৎ উত্তর হলো, নোবেল নিজে কারণটি লিখে যাননি। তাই তাঁর মাথায় আদতে কী চলছিল, আজ আর নিশ্চিতভাবে জানার উপায় নেই।

ইতিহাসের মজার ব্যাপার হলো, কখনো কখনো সবচেয়ে নাটকীয় উত্তরটাই সত্যি নয়। সত্যিটা হয়তো অনেক সহজ, অথবা হয়তো আমরা কোনো দিনই তা জানতে পারব না।

সূত্র: নোবেল ফাউন্ডেশন ও ম্যাকটিউটর হিস্ট্রি অব ম্যাথমেটিকস আর্কাইভ