ময়মনসিংহ শহরের প্রধান সমস্যা যানজট। এর অন্যতম কারণ অপ্রশস্ত সড়ক, তিন চাকার যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং শহরের ভেতরে ১০টি রেলক্রসিং। এ সমস্যার সমাধানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। এর ফলে নগরবাসীর ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে, যানজটে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা।

শহরে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, মিশুক ও অটোরিকশা ছাড়া কোনো ধরনের গণপরিবহন নেই। সিটি করপোরেশন বলছে, শহরে বর্তমানে নিবন্ধিত তিন চাকার যান আছে প্রায় ১৭ হাজার। এর মধ্যে ইজিবাইক ৫ হাজার ৯৬৮টি, মিশুক ৫ হাজার ৬০৮টি এবং অটোরিকশা ৫ হাজার ৪০০টি।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সিটি কর্তৃপক্ষ নতুন করে অটোরিকশার নিবন্ধন দিচ্ছে না। তাই একই নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে সড়কে একাধিক অটোরিকশা চলাচল করছে।

ময়মনসিংহ জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. গোলাম মাওলা গতকাল রাতে মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনের বাইরেও শহরে ২২-২৫ হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে প্রতিদিন। সে হিসাবে শহরে প্রায় ৪০ হাজার অটোরিকশা চলছে।

গোলাম মাওলা বলেন, এই শহরে গত দুই দশকে বহুতল ভবনের সংখ্যা অনেক বাড়লেও রাস্তা বাড়েনি। আদর্শ শহরে থাকার কথা ২৫ শতাংশ রাস্তা। কিন্তু এখানে আছে মাত্র ৫ শতাংশ। এই সড়কে চার থেকে সাড়ে চার হাজার গাড়ি যদি ২৪ ঘণ্টায় চলাচল করে, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু সব মিলিয়ে ৫০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করায় যানজট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

১৮৬৯ সালে গঠন করা হয় ময়মনসিংহ পৌরসভা। এরপর ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের যাত্রা শুরু হয়। এর আগে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠিত হয়। মূলত বিভাগ গঠনের পর থেকেই এই শহরে মানুষের চাপ বাড়তে শুরু করে।

সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনের বাইরেও শহরে ২২-২৫ হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে প্রতিদিন। সে হিসাবে শহরে প্রায় ৪০ হাজার অটোরিকশা চলছে।

শহরের ব্রহ্মপল্লী এলাকার বাসিন্দা জীবন হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ‘ময়মনসিংহ শহরের যে দিকে যাই, সেদিকেই যানজট। এমন একটা অবস্থা, যানবাহন ব্যবহারের চেয়ে হেঁটে চলাতেই সময় কম লাগে। কোনো গন্তব্যে যেতে হলে অতিরিক্ত ৩০-৪০ মিনিট হাতে নিয়ে সব সময় বের হতে হয়।’

শহরের ধোপাখলা এলাকার শিক্ষার্থী রেহেনা হাসান কলেজ এলাকার সড়কটি ধরে প্রতিদিন চলাচল করেন। তিনি বলেন, একবার রেলক্রসিংয়ে আটকা পড়লে ১৫-২০ মিনিট যানজটে থাকতে হয়।

নগরের বদরের মোড় থেকে গাঙ্গীনারপাড় মোড় আসতে ছয় মাস আগেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ৫ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো। এখন নেওয়া হয় ১০ টাকা। এই সড়কে চলাচলকারী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভাড়া বাড়লেও গন্তব্য পর্যন্ত অটোরিকশা দিয়ে যাওয়া যায় না। মিন্টু কলেজ রেলক্রসিং এলাকার আগেই যানজটে পড়তে হয়।

শহরের প্রধান সড়ক ১৭ ফুট

বিভাগ ও সিটি করপোরেশন হওয়ার পর ময়মনসিংহ শহরে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে যানবাহনও। টাউন হল মোড় থেকে গাঙ্গীনারপাড় হয়ে স্টেশন এলাকার সড়কটি শহরের প্রধান সড়ক। দুই লেনের এই সড়কের প্রতি লেনের প্রশস্ততা মাত্র ১৭ ফুট। এর ফলে যানবাহনকে চলাচল করতে হয় থেমে থেমে। এ ছাড়া গাঙ্গীনারপাড় থেকে চরপাড়া, টাউন হল থেকে জিরোপয়েন্ট হয়ে পাটগুদাম সেতু, নতুন বাজার হয়ে চরপাড়া যাওয়ার রাস্তার প্রশস্ততা অনেক কম।

যানজট সমস্যার সাময়িক সমাধানের জন্য অটোরিকশা ও ইজিবাইককে একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনা এবং বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ বলেন, মো. রুকুনোজ্জামান প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর যানজট নিয়ন্ত্রণে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। আগামী এক মাসের মধ্যে এই কার্যক্রম শেষ হবে। শহরের বাইরের অটোরিকশাগুলো ভেতরে প্রবেশ ঠেকাতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

যানজটের ১৩ হটস্পট, ১০ কারণ

ময়মনসিংহ শহরের যানজট নিরসনে গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিল জেলা প্রশাসন। এতে শহরের ১৩টি পয়েন্টকে যানজটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো পাটগুদাম ব্রিজ মোড়, চরপাড়া মোড়, নতুন বাজার মোড়, নতুন বাজার রেলক্রসিং, জিলা স্কুল মোড়, কাচারী মোড়, আকুয়া বাইপাস মোড়, সানকিপাড়া রেলক্রসিং, সি কে ঘোষ রোড, মিন্টু কলেজ রেলক্রসিং, জুবিলি ঘাট, কালিবাড়ী, দুর্গাবাড়ি রোড।

শহরে যানজটের ১০টি কারণ বের করেছে জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে প্রধান হল অপ্রশস্ত রাস্তা। দ্বিতীয় কারণ ইজিবাইক ও তিন চাকার যানের আধিক্য। এ ছাড়া বাণিজ্যিক এলাকায় গাড়ি পার্কিং, শহরের ভেতরে ১০টি রেলক্রসিং, ফুটপাত ও সড়ক দখল করে ব্যবসা পরিচালনা, আন্তজেলা বাস শহরের ভেতর দিয়ে যাতায়াত, দিনের বেলায় পণ্যবাহী ট্রাকের শহরে প্রবেশের বিষয়টি উল্লেখ করেছে জেলা প্রশাসন।

ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, যানজট সমস্যার সাময়িক সমাধানের জন্য অটোরিকশা ও ইজিবাইককে একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনা এবং বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।