ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে টিটিডিএএসিসি গ্রাম কমিটি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই নির্বাচনে টিপরা মোথা পার্টি (টিএমপি) নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখলেও, গেরুয়া শিবির অভিযোগ তুলেছে যে তাদের বিজেপি নেতাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, টিএমপি-র পক্ষ থেকেও বিজেপির বিরুদ্ধে হামলার পাল্টা অভিযোগ করা হয়েছে।
ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরপরই ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্তে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সংঘর্ষ শুরু হয়। টিপরা মোথা দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মা তাঁর কর্মীদের শান্ত থাকার এবং সব ধরনের হিংসা থেকে দূরে থাকার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন।
দলীয় নেতার এই আহ্বান সত্ত্বেও দক্ষিণ ত্রিপুরার বীরচন্দ্রমনু এবং মনু এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার নানা ঘটনা সামনে এসেছে। সেখানে বিজয়ী ও পরাজিত দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক মারামারি, বাড়িঘরে হামলা এবং যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
বিজেপির একাংশের দাবি, বিজয়ী টিপরা মোথা সমর্থকেরা তাঁদের দলীয় প্রার্থীদের বাড়িঘর ও কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিজেপি সমর্থকেরা জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন এবং মানপাথার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে অবস্থান নেন।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় বিধায়ক প্রমোদ রিয়াংকে মধ্যস্থতা করতে হয়। তবে দোষীদের গ্রেপ্তার না করা হলে পুনরায় সড়ক পথ অবরোধ করার হুমকি দিয়ে রেখেছেন বিজেপির আদিবাসী মোর্চার নেতারা।
একই ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ দেখা গেছে চালেনটা অঞ্চলেও। সেখানে বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে টিপরা মোথা দলের একটি কার্যালয় বন্ধ করে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই ধরনের হিংসাত্মক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, কেন্দ্রীয় বা রাজ্য স্তরে দুই দল জোটবদ্ধ থাকলেও গ্রামের সাধারণ কর্মীদের মধ্যে সেই সমঝোতা তৈরি হয়নি। জোটের শরিক হওয়া সত্ত্বেও তৃণমূল স্তরে ক্ষমতার দখল নিয়ে দুই দলের মধ্যে এক অদৃশ্য কিন্তু তীব্র লড়াই চলছে।
গত সোমবার ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের (টিটিএডিসি) ৪ হাজার ৫৯৪টি গ্রাম কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের ফলাফলে শাসক জোটের অন্যতম অংশীদার টিপরা মোথা পার্টি (টিএমপি) বিশাল ও নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।
টিএমপি এককভাবে ৩ হাজার ৪২৮টি গ্রাম কমিটিতে জয়ী হয়ে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তির প্রমাণ দিয়েছে। বিপরীতে রাজ্যের প্রধান শাসক দল বিজেপি মাত্র ৮৫৯টি গ্রাম কমিটিতে জয় পেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সিপিআই (এম) ৮৭টি এবং আইপিএফটি ৩৩টি গ্রাম কমিটিতে জয়ী হয়েছে।
টিটিএডিসির ৪ হাজার ৫৯৪টি গ্রাম কমিটির এই ফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। প্রায় এক দশক পর ভিলেজ কমিটির নির্বাচন হওয়ায় রাজ্যের মানুষের মনোভাব বোঝার এটি বড় এক সুযোগ ছিল। সেখানে টিপরা মোথার এই অভাবনীয় সাফল্য দলটিকে এক নতুন রাজনৈতিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ফলাফলের পর টিএমপির এখন মূল লক্ষ্য ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ‘টিপরাসা চুক্তি’–এর দ্রুত বাস্তবায়ন করা। এই জয় টিপরা মোথাকে রাজনৈতিকভাবে যে বিশাল মানসিক বল ও শক্ত অবস্থান এনে দিল, আগামী ২০২৮ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে তা দলকে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
পাশাপাশি, তৃণমূল স্তরে নিজেদের শক্তির পরিচয় দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে রাজ্য সরকারের ভেতরে এবং বাইরে নিজেদের দাবি আদায়ের ক্ষমতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেল টিএমপির।
স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে গ্রাম কমিটি নির্বাচনের ফল এক জটিল ও অস্বস্তিকর বার্তা দেয়। বাহ্যিকভাবে বিজেপি নেতৃত্ব এই নির্বাচনী ফলকে এনডিএ জোটের জয় হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। তবে এককভাবে বিজেপির এই বিপর্যয়কর ফল এবং উপজাতি অঞ্চলে জমি হারানোর ঘটনা দলের ভেতরে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
টিএমপির সঙ্গে জোটে থাকা সত্ত্বেও দুই দলের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা। ওপরের স্তরে নেতাদের বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্কের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যকার বিভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের প্রভাব আগামী দিনে ত্রিপুরার রাজনীতিতে গভীরভাবে পড়তে চলেছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, প্রথমত, বিজেপির ওপর টিপরা মোথার চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা এখন অনেকটাই বেড়ে গেল। জোট সরকার পরিচালনা করতে গেলে এখন বিজেপিকে টিপরা মোথার আঞ্চলিক দাবিগুলো আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তৃণমূল স্তরে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হিংসা ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেলে তা জোটের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করবে। আগামী ২০২৮ বিধানসভা নির্বাচনের আগে উপজাতি আসনগুলোতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ কর্মীদের ক্ষোভ সামাল দেওয়া বিজেপির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তৃণমূল স্তরের এই রেষারেষি ও হিংসা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তা ত্রিপুরা রাজ্যের সামগ্রিক শান্তি ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।