জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে বিশ্বের বৃহত্তম বইমেলা শুরু হয়েছে। আগামী রবিবার (১১ অক্টোবর) পর্যন্ত চলবে এই মেলা। এবার এটি মেলাটির ৭৮তম আসর। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা জগতের এই বিশাল আয়োজনে বিশ্বের ১৩০টি দেশের প্রায় চার হাজার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে। এবারের মেলার সম্মানিত অতিথি দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র।
তবে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মেলাটির উদ্বোধন হয় তীব্র প্রতিবাদ, ক্ষুব্ধ দর্শকদের কটূক্তি এবং পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অভিবাদনের এক মিশ্র পরিবেশের মধ্য দিয়ে। আজ বুধবার থেকে মেলাটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চেক প্রজাতন্ত্রের সংস্কৃতিমন্ত্রী ওতো ক্লেমপিরকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। অন্যদিকে, লেখক রাদকা ডেনেমারকোভা যখন বক্তব্য প্রদান করেন, তখন উপস্থিত জনতা বিপুল করতালি ও দাঁড়িয়ে অভিবাদনের মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানায়।
গতকাল মঙ্গলবার ডায়ালগ স্টেজে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তব্য রাখেন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পরিচালক ইউর্গেন বুস এবং জার্মান প্রকাশক ও বই বিক্রেতা সমিতির সেবাস্তিয়ান গুগোলজ। ২০২৬ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার উদ্বোধনী প্রেস কনফারেন্সের পরপরই সম্মানিত অতিথি চেক প্রজাতন্ত্রের প্যাভিলিয়নে একটি প্রেস ট্যুর পরিচালিত হয়। বিদায়ী পরিচালক ইউর্গেন বুস শেষবারের মতো প্রতীকী হাতুড়ির আঘাতের মাধ্যমে ২০২৬ সালের বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
দর্শকদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মূল কারণ ছিল চেক প্রজাতন্ত্রের সংস্কৃতিমন্ত্রী ওতো ক্লেমপিরের বক্তব্য। তাঁর বিষয়ে আগে থেকেই ব্যাপক বিতর্ক ও আগ্রহ ছিল। তিনি দেশটির উগ্র ডানপন্থী ‘মোটরিস্টে’ দলের সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে চেক প্রজাতন্ত্রের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য ক্ষতিকর নীতিমালা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অর্থায়নকে সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ তাঁকে তীব্র সমালোচনার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের প্রতিফলন দেখা গেছে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা ছিলেন চেক লেখক রাদকা ডেনেমারকোভা। সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্লেমপিরের বক্তব্যের পরপরই তিনি তাঁর বক্তৃতা শুরু করেন এবং তাঁর প্রথম কথাগুলোই দর্শকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস তৈরি করে। তিনি বলেন, “যেসব রাষ্ট্রের মন্ত্রী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেন, তাঁরা আসেন আবার চলে যান—কিন্তু সাহিত্য থেকে যায়।” ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ডেনেমারকোভা প্রশ্ন করেন, “ইউরোপ যখন ক্রমশ উগ্র ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে, যখন চেক সরকারের দুই সাবেক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তা মন্ত্রিসভায় রয়েছেন, তখন রাজনীতি ও সাহিত্যকে আমি কীভাবে আলাদা করব?” এই পরিস্থিতি তাঁকে ক্লান্ত ও বিরক্ত করেছে বলে তিনি জানান। দর্শকদের করতালির মধ্য দিয়ে তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের ক্ষমতাসীনদের জীবন কঠিন করে তুলতে হবে।”
সাহিত্যের অদম্য শক্তির কথা তুলে ধরে ডেনেমারকোভা বলেন, “গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়া হলো নির্বুদ্ধিতার সবচেয়ে সহজ পথ।” এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের প্রয়োজন শান্ত মাথা, স্বচ্ছ চিন্তা, সৃজনশীল মনন এবং সাহসী, স্বাধীন প্রকাশনা সংস্থা।” তাঁর এই সাহসী বক্তব্যের পর দর্শকেরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানান।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা মূলত আন্তর্জাতিক প্রকাশনার বৃহত্তম বাণিজ্য মেলা। এটি কেবল বইয়ের মেলা নয়, বরং শিক্ষা, চলচ্চিত্র, গেমস, বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ তথ্য ক্ষেত্রের প্রতিনিধিদের জন্য একটি আন্তসংস্কৃতি বা আন্তশিল্প মিলনস্থল। এই মেলা আয়োজনে জার্মান প্রকাশকদের বিশাল অবদান রয়েছে এবং এটি জার্মান প্রকাশক ও বই বিক্রেতা সমিতির একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়।
বর্তমানে এটি বিশ্বের বৃহত্তম বইমেলা হিসেবে স্বীকৃত। প্রতি বছর অক্টোবর মাসে মাইন নদীর তীরের ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বছরের এই সময়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট হয়ে ওঠে বিশ্বের নতুন চিন্তা, জ্ঞান ও সৃজনশীলতার মিলনমেলা। উপন্যাস থেকে শুরু করে শিশুতোষ বই এবং বৈজ্ঞানিক ডেটাবেজ—সব ধরনের প্রকাশনার জন্য এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে বিশ্বব্যাপী প্রকাশনা জগতের বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি প্রযুক্তি খাত এবং চলচ্চিত্র ও গেমসের মতো সৃজনশীল শিল্পের অংশীদারদের মিলন ঘটে, যেখান থেকে নতুন সহযোগিতা ও ব্যবসায়িক মডেলের সূচনা হয়।
এই ঐতিহ্যবাহী বিশ্ব বইমেলার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী অভিজাতদের মিলনের স্থল ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট। ইউরোপের অধ্যাপক, পণ্ডিত, আর্কাইভার এবং ধর্মযাজকেরা তাঁদের লেখা বই প্রকাশ করতে, প্রকাশক খুঁজতে কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বর্তমান অবস্থা জানতে মাইন নদীর তীরবর্তী এই শহরে একত্র হতেন।
তবে সেই সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য বইপত্রের নাগাল পাওয়া কঠিন ছিল। ফ্রাঙ্কফুর্টের এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, তখন সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলিয়ান রাজতন্ত্রবিরোধী ‘তাত্ত্বিক লেখার’ বিস্তার রোধ করতে সেন্সরশিপ আরোপ করেছিলেন।
পরবর্তীতে মধ্য ইউরোপের আধিপত্য নিয়ে ফরাসি-হাবসবার্গ রাজাদের ৩০ বছরের ধর্মযুদ্ধের ফলে ফ্রাঙ্কফুর্টের বইভিত্তিক চর্চাকেন্দ্র জার্মানির লাইপজিগ শহরে কেন্দ্রীভূত হয়। লাইপজিগ তখন বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্যচর্চা এবং বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ইয়োহান সেবাস্তিয়ান বাখ প্রমুখের কারণে সাহিত্য ও সংগীতের এক অনন্য চারণভূমিতে পরিণত হয়।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আবারও ৩০০ বছর আগের সেই ফ্রাঙ্কফুর্টের বইকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ফিরে আসতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালের ১৮-২৩ সেপ্টেম্বর ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত পাউল গির্জায় ২০৫টি প্রকাশনার ৮৪৪টি বই প্রদর্শনের মাধ্যমে এই মেলার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।