প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে রান্নায় ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) নির্ধারিত দাম বাংলাদেশে বেশি। বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজির নির্ধারিত দাম ১৫৩ টাকা। ভারতের কলকাতায় তা ৮৭ টাকা। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও এলপিজির নির্ধারিত দাম বাংলাদেশের চেয়ে কম।

বাংলাদেশে দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অবশ্য সেই দাম কখনোই বাজারে কার্যকর হয় না। যেমন এখন ১২ কেজির এক সিলিন্ডার গ্যাসের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।

দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালির রান্নার কাজে। এলপিজির চাহিদা এখন বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি। এলপিজির দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত চাপে পড়ে যায়। দেশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের মধ্যে এলপিজির দাম লাগামছাড়া।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষকে আশপাশের দেশের তুলনায় অত্যন্ত চড়া দামে রান্নার গ্যাস কিনতে হচ্ছে। সরকারের সংস্থা বিইআরসি ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) নির্ধারিত উচ্চ দরও কার্যকর করতে পারছে না। সমস্যাটি নতুন নয়, অনেক বছরের।

দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালির রান্নার কাজে। এলপিজির চাহিদা এখন বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি। এলপিজির দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত চাপে পড়ে যায়। দেশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের মধ্যে এলপিজির দাম লাগামছাড়া।

রাজধানীর মিরপুরের বেসরকারি চাকরিজীবী সাজ্জাদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁর পরিবারে মাসে দুই সিলিন্ডার (১২ কেজি) এলপিজি লাগে। সম্প্রতি একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৪০০ টাকায়। তিনি বলেন, সরকারি সংস্থাগুলো নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে পারবে না; কিন্তু তাদের বেতন দ্বিগুণ করতে সাধারণ মানুষকে উচ্চহারে কর দিতে হবে, এটাই নিয়তি।

দেশে রান্নায় দুই ধরনের গ্যাস ব্যবহৃত হয়। একটি পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস। অন্যটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি। ২০১৫ সালের পর থেকে বাসাবাড়িতে গ্যাসের লাইন দেওয়া বন্ধ। অন্যদিকে বাড়ছে এলপিজির চাহিদা।

বেসরকারি কোম্পানিগুলো মূলত আমদানি করে এলপিজির চাহিদা পূরণ করে। আদালতের নির্দেশে মাসে মাসে দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে সংস্থাটি। উদ্দেশ্য, মানুষকে সাশ্রয়ী মূল্যে রান্নার গ্যাস সরবরাহ করা।

ভারতের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন। দেশটিতে সরকারি সংস্থা এলপিজি বিক্রি করে, তাদের অবকাঠামো সক্ষমতাও বেশি।

সর্বশেষ গত রোববার এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গতকাল সোমবার মোহাম্মদপুরের হাউজিং লিমিটেড এলাকায় একজন খুচরা বিক্রেতার দোকানে কথা হয় এলপিজির দাম নিয়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এলপিজির সরবরাহ বাড়েনি। দিনে ৩০টি সিলিন্ডার চাইলেও পাওয়া যাচ্ছে ১৫টি। ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডার তাঁরা বিক্রি করছেন ২ হাজার ৪০০ টাকায়।

ভারতের রাষ্ট্রমালিকানাধীন তেল কোম্পানি আইওসিএলের তথ্য বলছে, দেশটির একেক রাজ্যে এলপিজির একেক দাম। পশ্চিম বাংলার প্রধান শহর কলকাতায় ১৪ দশমিক ২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা দাম ৯৬৮ রুপি। এ হিসাবে প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ১৭ রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮৭ টাকা। দিল্লি ও মুম্বাইয়ে দাম আরও কম।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ভারতের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন। দেশটিতে সরকারি সংস্থা এলপিজি বিক্রি করে, তাদের অবকাঠামো সক্ষমতাও বেশি। তিনি বলেন, মূলত পরিবহন ভাড়ার কারণেই অন্য দেশগুলোর চেয়ে দামটা বেশি হচ্ছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে জমি আছে এলপি গ্যাস কোম্পানির। তারা টার্মিনাল করলে বড় জাহাজে করে আমদানি করা যাবে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে, বাগেরহাটের মোংলা ও টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় জমি আছে তাদের। তারা বড় মজুতাগার করতে পারে। এতে তিন-চার বছর লাগতে পারে। এরপর দামটা অন্য দেশের মতো কমে আসবে।

এদিকে ভারতের রাষ্ট্রমালিকানাধীন কোম্পানি আইওসিএলের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা আছে, গত জুন থেকে বর্তমান দাম কার্যকর এবং এই দামের মধ্যে ভর্তুকি নেই।

দিল্লি থেকে মুক্তকণ্ঠের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ভারতে ভর্তুকি দুই ধরনের। একটি হলো দরিদ্র মানুষকে সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ রুপি দেয় সরকার, যা ব্যাংক/মুঠোফোনে আর্থিক সেবা হিসেবে পাঠানো হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন তেল কোম্পানি আইওসিএল অনেক সময় লোকসান দিয়ে বাসাবাড়ির এলপিজি বিক্রি করে।

ভারতের সুপরিচিত দৈনিক দ্য হিন্দুর একটি প্রতিবেদন বলছে, সেপ্টেম্বরে ১৪ দশমিক ২ কেজির সিলিন্ডারে পরোক্ষ ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ২১০ রুপি। হিসাব করে দেখা যায়, ভর্তুকি বাদ দিলেও ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকার আশপাশে থাকে।

বেসরকারি কোম্পানি লাফ গ্যাস শ্রীলঙ্কার ওয়েবসাইট বলছে, দেশটির বিভিন্ন শহরে এলপিজির দামে কিছুটা ভিন্নতা আছে। রাজধানী কলম্বোয় সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৪ হাজার ৯৬৫ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০০ টাকার কম।

ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে মোটামুটি সরকার নির্ধারিত দামেই এলপিজি বিক্রি হয় বলে সেখানকার সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন। পাকিস্তানে নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ আছে। তবে কোনো দেশেই বাংলাদেশের মতো চড়া দামে এলপিজি বিক্রি হয় না।

পাকিস্তানের সংবাদপত্র দ্য ডন ১ অক্টোবর এক প্রতিবেদনে বলেছে, এলপিজির দাম ৮ শতাংশ বাড়িয়েছে পাকিস্তান অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রেগুলেটরি অথরিটি। প্রতি কেজির দাম ২৭৯ রুপি করা হয়েছে। হিসাব করে দেখা যায়, বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম পড়ে দেড় হাজার টাকার কিছু কম।

নেপাল অয়েল করপোরেশনের তথ্য বলছে, দেশটিতে ১৪ দশমিক ২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০০ টাকার কিছু কম।

ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে মোটামুটি সরকার নির্ধারিত দামেই এলপিজি বিক্রি হয় বলে সেখানকার সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন। পাকিস্তানে নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ আছে। তবে কোনো দেশেই বাংলাদেশের মতো চড়া দামে এলপিজি বিক্রি হয় না।

মূলত অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা ও জাহাজভাড়ার কারণেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। গভীর সমুদ্রে একটি টার্মিনাল নির্মাণ হলে এবং মজুতের সক্ষমতা বাড়লে দেশেও দাম কমে আসবে।

এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে গভীর সমুদ্রে কোনো টার্মিনাল নেই। পর্যাপ্ত এলপিজি মজুত করার মতো সক্ষমতাও তৈরি হয়নি। তাই ছোট ছোট জাহাজে করে আমদানি করা হয়। এতে খরচ বেশি পড়ে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মূলত অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা ও জাহাজভাড়ার কারণেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। গভীর সমুদ্রে একটি টার্মিনাল নির্মাণ হলে এবং মজুতের সক্ষমতা বাড়লে দেশেও দাম কমে আসবে। তিনি বলেন, দাম বাড়লে চাহিদা কমে যায়। তাই ব্যবসায়ীরা বাড়তি দাম চান না।

ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াব বলছে, আগস্ট মাসে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণ ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। তার মানে আমদানি স্বাভাবিক আছে। তাই বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি না করতে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে সংগঠনটি।

দুই সপ্তাহে এলপিজির সিলিন্ডারপ্রতি দাম আড়াই হাজার টাকায় উঠে যাওয়ার কারণ সরবরাহ কমে যাওয়া। বাজারে এলপিজি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে সরবরাহ কমাতে শুরু করেছে কিছু কোম্পানি। শুরুর দিকে ৩০ শতাংশ সরবরাহ কমানো হয়। এরপর ধীরে ধীরে ৫০ শতাংশের বেশি সরবরাহ কমিয়ে দেয়।

ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াব বলছে, আগস্ট মাসে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণ ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। তার মানে আমদানি স্বাভাবিক আছে। তাই বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি না করতে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে সংগঠনটি।

বিইআরসির দাম সমন্বয়ের পর বাজারে দাম স্বাভাবিক হবে ধারণা করা হয়েছিল। ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, বিইআরসি দাম বাড়ানোর পর এখন সরবরাহ বাড়ছে। তবে ট্রাকের দীর্ঘ সারি অপেক্ষায় আছে। তাই সরবরাহ স্বাভাবিক হতে এক সপ্তাহের বেশি লাগতে পারে।

এ বিষয়ে আজম জে চৌধুরী বলেন, পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ সংকট থাকায় শিল্পে এলপিজির চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে আমদানি ঠিকঠাক হলেও আবাসিকে সরবরাহ কমেছে। আমদানি আরও বাড়ানো হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগবে।

২০২১ সালের আগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দামে এলপিজি বিক্রি করতেন। এরপর আদালতের আদেশে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায় বিইআরসি। এখন বিইআরসি ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে বাড়তি দাম নির্ধারণ করে দেয় তারা। এরপরও সেটা কার্যকর করতে পারে না। আরও বাড়তি দামে বাজারে বিক্রি হয়।

বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেশি হওয়ার পেছনে নানা যুক্তি দিলেন বিইআরসির চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার পর বরিশাল শহরের বটতলা এলাকায় একটি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে পেট্রম্যাক্স, সান ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৭০ টাকা এবং টোটাল গ্যাসের দাম ১ হাজার ৯২০ টাকা। প্রশ্ন হলো, ঢাকায় দাম কেন ৪০০-৫০০ টাকা বেশি।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ২০২১ সালের আগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দামে এলপিজি বিক্রি করতেন। এরপর আদালতের আদেশে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায় বিইআরসি। এখন বিইআরসি ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে বাড়তি দাম নির্ধারণ করে দেয় তারা। এরপরও সেটা কার্যকর করতে পারে না। আরও বাড়তি দামে বাজারে বিক্রি হয়।