আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য নির্ধারিত সময়ে হাজির না হওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতের বিচারাধীন অসংখ্য মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর ফলে বিচারপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং অনুপস্থিত সদস্যদের আদালতে পাঠানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোতে জরুরি তাগিদপত্র পাঠিয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগর পুলিশের দায়িত্বে ছিলেন অথবা বর্তমানে দেশের অন্য জেলা ও বিশেষায়িত ইউনিট যেমন—সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও এসবি-তে কর্মরত প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালত থেকে সমন ও পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

গত ৩ অক্টোবর সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে ১৮টি পৃথক চিঠির মাধ্যমে নির্দিষ্ট দিনে পুলিশ সদস্যদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বারবার সমন ও পরোয়ানা জারি করা সত্ত্বেও সাক্ষীরা অনুপস্থিত থাকায় মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা তৈরি হচ্ছে। এই নির্দেশ অমান্য করলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫(ক) ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

পুরোনো হত্যা মামলাতেও দেখা যাচ্ছে একই ধরনের জটিলতা। ২০২২ সালের একটি হত্যা মামলায় সাক্ষীদের হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ (তৃতীয় আদালত) সিএমপি কমিশনারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আগামী ১৮ নভেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করে আদালত জানান, নির্ধারিত দিনে সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে মামলায় নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তার দায় পুলিশ প্রশাসনের ওপর বর্তাবে।

সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর দাবি, কোনো ঘটনার তদন্তকারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অন্য জেলায় বদলি হলে সমন পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো ছাড়পত্র না পাওয়াকেও অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে দেখানো হয়। সিএমপির মিডিয়া বিভাগের সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদের মতে, দূরবর্তী কর্মস্থল, অসুস্থতা কিংবা সমন বিলম্বে পৌঁছানোর কারণে অনেকে সময়মতো আসতে পারেন না; অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী মৃত্যুবরণও করেছেন। তবে তিনি জানান, জারি করা পরোয়ানাগুলো মূলত সাক্ষ্যদানের জন্য আইনি তাগিদ।

অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে নোয়াখালী জেলাতেও। জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে সম্প্রতি ১২১ জন পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিনা কারণে অনুপস্থিত থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন ডিআইজি দপ্তরের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোর নিয়ম করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুর রাজ্জাক জানান, সমন বাস্তবায়নে জটিলতা বা কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ায় বিচার দীর্ঘায়িত হয়। বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সমন কার্যকর করা এবং সাক্ষীদের যাতায়াত খরচ ও নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, “আদালতের তাগিদ সত্ত্বেও পুলিশ সদস্যদের অনুপস্থিতি ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে অনুপস্থিতির আইনি ও প্রশাসনিক দায় নির্ধারণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।”