সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাকেন্দ্রে কর্মরত এক ল্যাব টেকনিশিয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিকে ‘খুবই গুরুত্বের সঙ্গে’ পর্যবেক্ষণ করছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, নিউমোনিক প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটন বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করে জানান, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক অঞ্চলের গভর্নর মৃত নারীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘অজ্ঞাত কারণে সৃষ্ট নিউমোনিয়া’র কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ওই নারীর কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘কোনো অণুজীব’ তাঁর জৈবিক নমুনায় পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রোগের জীবাণু থাকা একটি টেস্টটিউব ভেঙে যাওয়ার কারণে অথবা বন্য ইঁদুরের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে প্লেগ সংক্রমিত হয় এমন কোনো এলাকায় মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের সময় ওই নারী অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতে পারেন।

রাশিয়া থেকে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় ওয়াশিংটন কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, এ বিষয়ে তিনি ক্রেমলিনের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে তিনি বলেন, ‘তাদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে দেখে আমার হতাশ লাগছে। তবে আমরা তাদের সাহায্য করব। এ ধরনের সমস্যায় যারা পড়ে, আমরা সব সময় তাদের সাহায্য করব।’

ইরকুতস্কের গভর্নর ইগর কোবজেভ জানিয়েছেন, ওই ল্যাব টেকনিশিয়ানের মৃত্যুর পর গবেষণাকেন্দ্রের অন্য কোনো কর্মী চিকিৎসা নিতে যাননি। রাশিয়ার ভোক্তা অধিকার ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা রসপোট্রেবনাদজরের বরাত দিয়ে তিনি এই তথ্য দেন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, একটি জৈবনিরাপত্তা দল ইরকুতস্কে অবস্থিত সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যবিষয়ক অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেছে এবং সেখানে কোনো জরুরি পরিস্থিতি পাওয়া যায়নি।

এদিকে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাধারণ মানুষকে ‘গুজবে কান না দেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন এবং রসপোট্রেবনাদজরের দেওয়া সরকারি বিবৃতির ওপর নির্ভর করতে বলেছেন। রুশ গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মৃত নারীর সংস্পর্শে আসা প্রায় ২০০ জনকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

মার্কো রুবিও বলেন, ‘মনে হচ্ছে, ওই গবেষণাগারের একজন কর্মী সংক্রমিত হয়েছিলেন। এ কারণে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে সংক্রমণ অন্তত গবেষণাগারের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে। আপনারা দেখেছেন, তারা এ নিয়ে কোয়ারেন্টিনসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।’

প্লেগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার নাম ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস। বুরিয়াতিয়া অঞ্চলে মারমটের মতো তৃণভোজী ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে এই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, ১৪ শতকে এই ব্যাকটেরিয়ায় সৃষ্ট প্লেগ ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত ছিল এবং তাতে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

বিষয়টির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে রুবিও আরও বলেন, ‘এ ধরনের কিছু বাইরে সংক্রমিত হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আমরা বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি করছি। আমার মনে হয় না, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে। তবে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়ার ও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার কারণ আছে। আমরা সেটাই করছি।’

রুশ গণমাধ্যমের তথ্যমতে, মৃত নারীর নামের প্রথম অংশ দারিয়া এবং তাঁর বয়স ২০-এর কোটার শেষ দিকে। সম্প্রতি তিনি মঙ্গোলিয়া সীমান্তবর্তী বুরিয়াতিয়া অঞ্চলে গিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯২০-এর দশকে প্লেগের প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ১০০ বছরেরও বেশি আগে সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যবিষয়ক অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলুলার মাইক্রোবায়োলজির সহযোগী অধ্যাপক সাইমন ক্লার্ক বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘পিএম’ অনুষ্ঠানে জানান, ইয়ারসিনিয়া পেস্টিসের নিউমোনিক ধরন চিকিৎসা না করা হলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হয়, তবে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এর চিকিৎসা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ‘নিউমোনিক প্লেগ একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর এ কারণেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।’

অধ্যাপক ক্লার্ক আশা প্রকাশ করেন যে, এই ঘটনায় লকডাউন বা কোভিডের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে না। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘লোকজন মনে করে, “ওহ, প্লেগ তো নির্মূল হয়ে গেছে, শত শত বছর আগেই চলে গেছে।” কিন্তু আসলে তা নয়। এটি এখনো আছে এবং বিশ্বের কিছু অঞ্চলে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে। এ কারণেই এটি নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।’

জীবাণুটিকে সম্ভাব্য জৈব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য গবেষণা করা হয়ে থাকতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই বিজ্ঞানী বলেন, তা হতে পারে। ক্লার্ক বলেন, ‘রাশিয়া বলেই মানুষের মনে এমন সন্দেহ আসছে। তবে আমি আগে যে ব্যাখ্যা দিয়েছি, সেটিই সম্ভবত বেশি যুক্তিসংগত।’