চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া ফার্নেস তেলের কালচে স্লাজ বা কালো তেলের অবশেষ মইল্ল্যা খাল হয়ে সাঙ্গু নদে মিশে যাওয়ার যে খবর পাওয়া গেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই দূষণ কেবল খালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; গত জুলাই মাসে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যার সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খালের জমে থাকা স্লাজ লোকালয় এবং কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খালের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকার ৩০ হেক্টর জমিতে একসময় শতাধিক কৃষক চাষাবাদ করতেন। কিন্তু বর্তমানে পরিবেশ দূষণের কারণে সেখানে কৃষি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পবর্জ্য যখন জলাশয়ে মেশে, তখন তা কেবল দুর্গন্ধই ছড়ায় না, বরং জলজ প্রাণীর জীবনচক্রের ওপরও মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এর ফলে ইতিমধ্যে ওই খালের মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানা গেছে।
তবে আশার কথা এই যে, স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র আন্দোলন এবং লিখিত অভিযোগের পর কর্তৃপক্ষ খাল থেকে তেল অপসারণের কাজ শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি একটি অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা। তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তবে এই ঘটনাকে কেবল 'দুর্ঘটনা' হিসেবে চিহ্নিত করা সঠিক হবে না। বরং এটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং নজরদারির অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় এমন ঘটনাকে কেবল দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে না গিয়ে, এর পেছনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা এখন সময়ের দাবি।
এই প্রসঙ্গে কালিয়াইশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য যথার্থই বলেছেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য সরাসরি খালে পড়া বন্ধ না হলে শুধু খাল পরিষ্কার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।” তাই বর্জ্য কোথা থেকে নির্গত হচ্ছে, তা কীভাবে খালে মিশছে এবং এর পরিশোধন ব্যবস্থা কী—এই সব বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আমরা আশা করি, বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ যেমন খালের বর্জ্য অপসারণ শুরু করেছে, তেমনি তারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সুরাহা করবে যেন নদী, খাল ও কৃষিজমির আর কোনো ক্ষতি না হয়। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এছাড়া এই দূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে বলে বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পৃথিবী এখন এমন এক সংকটাপন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পরিবেশ রক্ষা না করে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল আনবে না; বরং তা আমাদের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।