ডিজিটাল সেবা এবং বড় প্রযুক্তি ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে বিপুল পরিমাণ গ্রাহক ও আর্থিক তথ্য থাকে এবং সাইবার হামলার ঝুঁকিও বেশি। পাশাপাশি ক্লাউড, AI ও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে প্রায় প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠানের জন্যই দক্ষ সাইবার সিকিউরিটি পেশাজীবী প্রয়োজন হবে।
সাইবার সিকিউরিটিতে ক্যারিয়ার শুরু করার জন্য কম্পিউটার সায়েন্স বা আইটি বিষয়ে ডিগ্রি থাকলে অবশ্যই সুবিধা পাওয়া যায়, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। এসব ছাড়াও এই পেশায় আসা সম্ভব। এখানে দক্ষতার সাথে সাথে সবচেয়ে দরকার দায়িত্ব আর কাজের প্রচন্ড প্রেসার নেয়ার মানসিকতা।
আগামী পাঁচ বছরে সাইবার সিকিউরিটি পেশায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে শুধু প্রচলিত হ্যাকিং বা নেটওয়ার্ক নিরাপত্তার মধ্যে কাজ সীমাবদ্ধ থাকবে না। AI-নির্ভর সাইবার আক্রমণ ও প্রতিরোধ, ক্লাউড সিকিউরিটি, ডেটা প্রাইভেসি, ডিজিটাল ফরেনসিক, থ্রেট ইন্টেলিজেন্স এবং AI সিস্টেমের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন বিশেষায়িত পেশা তৈরি হবে। বিশেষ করে AI Security Specialist, AI Red Teamer, Cloud Security Engineer, Threat Intelligence Analyst, Digital Forensics Investigator, Cyber Risk & Compliance Specialist এবং Security Automation Engineer–এর চাহিদা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ব্যাংকিং, ফিনটেক, ই-কমার্স, সরকারি ডিজিটাল সেবা ও গণমাধ্যমসহ প্রায় সব খাত ডিজিটালনির্ভর হওয়ায় সাইবার নিরাপত্তা জনবলের প্রয়োজন আরও বাড়বে। একই সঙ্গে বড় প্রতিষ্ঠানে শুধু সিকিউরিটি টিম নয়, Chief Information Security Officer (CISO), Security Architect এবং Cyber Risk Manager–এর মতো লিডারশিপের নতুন নতুন পদও বাড়বে।
প্রথম বছরে একজন তরুণকে ধাপে ধাপে কম্পিউটার ও নেটওয়ার্কিংয়ের মৌলিক জ্ঞান, Linux, Python, ওয়েব সিকিউরিটি, Ethical Hacking, Vulnerability Assessment, Digital Forensics এবং Security Tools শেখা উচিত। পাশাপাশি নিয়মিত CTF ও Hands-on Lab অনুশীলন করে বাস্তব দক্ষতা তৈরি করতে হবে। বছর শেষে CompTIA Security+, CEH বা সমমানের সার্টিফিকেশন এবং কয়েকটি বাস্তব প্রজেক্ট থাকলে চাকরির জন্য নিজেকে ভালোভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব।
বাংলাদেশে বসেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাইবার সিকিউরিটিতে কাজ করার সুযোগ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি, বিশেষ করে Remote Security Analyst, SOC Analyst, Penetration Tester, Threat Intelligence ও Security Engineer হিসেবে। তবে আন্তর্জাতিক চাকরির ক্ষেত্রে শুধু সার্টিফিকেট নয়, ভালো ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা, বাস্তব প্রজেক্ট, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন এবং নির্ভরযোগ্য পোর্টফোলিও গুরুত্বপূর্ণ।
AI শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার আক্রমণও আরও দ্রুত, নিখুঁত ও স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে। ফলে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সব ধরনের হুমকি সামলানো সম্ভব নয়। কোন আক্রমণটি আসল হুমকি, কীভাবে এর মোকাবিলা করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য কী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, এসব জায়গায় মানুষের অভিজ্ঞতা ও বিচার-বুদ্ধি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তাই AI যত এগোবে, AI-কে কাজে লাগিয়ে সাইবার ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে পারে,এমন দক্ষ সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনও তত বাড়বে।
সাইবার সিকিউরিটিতে আমার আগ্রহটা মূলত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যত বেশি ব্যবহার করতে শুরু করি, ততই দেখেছি ছোট একটি নিরাপত্তা দুর্বলতাও কীভাবে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। সেখান থেকেই বিষয়টি নিয়ে নিজে শেখা ও কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়। শুরুতে নিজের আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সিকিউরিটি বিষয় শেখা, কোর্স করা, টিউটোরিয়াল দেখা ও হাতে-কলমে কাজ করেছি, পরে ধীরে ধীরে এটাকে পেশাগতভাবে নিই।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সঠিক গাইডলাইনের অভাব। ৮/১০ বছর আগে কোন বিষয় আগে শিখব, কোথা থেকে শুরু করব বা বাস্তবে কীভাবে কাজ করব, এসব নিয়ে অনেকটাই নিজে নিজে শিখতে হয়েছে। বিভিন্ন রিসোর্স খুঁজে শেখা, নিয়মিত প্র্যাকটিস করা এবং বাস্তব সমস্যার মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেই ধীরে ধীরে সেই ঘাটতি কাটিয়ে উঠেছি। এখনতো অনেকটাই সহজে শেখা যাচ্ছে।
শুরুর দিকে সাইবার সিকিউরিটিকে আমার কাছে অনেকটা সম্মানজনক ও রোমাঞ্চকর পেশা মনে হয়েছিল। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, এটি একই সঙ্গে প্রচণ্ড মানসিক চাপের এবং অনেক বেশি দায়িত্বশীল একটি জায়গা। এখানে একটি ছোট ভুলও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই এখন আমার কাছে সাইবার সিকিউরিটি শুধুই সম্মানের পেশা না, বরং মানুষের তথ্য, প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও আস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি বড় দায়িত্ব।
ক্যারিয়ারের শুরুতে আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল অনেক কিছু একসঙ্গে শিখতে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা পরিকল্পনা না রাখা। নতুনদের আমি বলব, শুরুতেই সবকিছু জানার চেষ্টা না করে একটি নির্দিষ্ট পথ ধরে এগোতে। আর শুধু সার্টিফিকেটের পেছনে না ছুটে হাতে-কলমে কাজ, নিয়মিত প্র্যাকটিস এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো বিষয়ে না জেনে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার চেয়ে, না জানাটা স্বীকার করে শেখার মানসিকতা রাখা।
এজাতীয় সমস্যায় অগনিতবার পরেছি। বিশেষ করে যখন অন্য কেউ কোনো সাইবার হামলার শিকার হয়ে অনেকগুলো ভুল স্টেপ নিয়ে সমস্যাটাতে আরো জটিল ও রিকভারে দীর্ঘ সময়ের দিকে ঠেলে দিয়ে তারপর যোগাযোগ করে।
আগে মূল ফোকাস ছিল ওয়েবসাইট বা সিস্টেম হ্যাকিং; এখন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল পরিচয়, ডেটা ও অ্যাক্সেসও বড় টার্গেট।AI ব্যবহার করে এখন ফিশিং, স্ক্যাম, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আরও বিশ্বাসযোগ্য ও দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। গে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি আলোচনা হতো, এখন একটি সাইবার আক্রমণ পুরো প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা বা সেবাকে প্রভাবিত করতে পারে।এটি এখন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা, আইন, অর্থনীতি, সুনাম ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।