ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে নতুন মুখ আসবে, নাকি সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নেতারাই ফিরবেন—এ নিয়ে আলোচনা চলছে নেতা–কর্মীদের মধ্যে। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার পর কমিটি বিলুপ্ত হলেও সাবেক নেতাদের একাংশ আগের কমিটির নেতাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব দেখতে চান। অন্যদিকে নেতৃত্ব বাছাইয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও সামনে আসছে।
দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে শিগগিরই নতুন কমিটি ঘোষণার কথা বলা হয়েছে। তবে কবে কমিটি হবে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ঢাকা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক বিষয়ে ওয়াকিবহাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক একটি সূত্রের আভাস, নেতৃত্ব ঠিক করতে কিছুটা সময় লাগবে।
সদ্য বিলুপ্ত কমিটির কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে অতীতে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ভূমিকা, থানা–ওয়ার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। একই সঙ্গে সরকারি দলে থাকার সময় নেতা–কর্মীদের আচরণে দলের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখার কথা বলছেন।
বিএনপি–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন কমিটিতে স্বচ্ছ, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের রাখার চিন্তা রয়েছে। তবে কমিটি গুছিয়ে আনতে কত দিন লাগতে পারে, এ বিষয়ে ধারণা দিতে পারেনি সূত্রগুলো।
পুরোনো নেতৃত্ব, নাকি নতুন মুখ
সদ্য বিলুপ্ত কমিটির এক নম্বর সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার নতুন কমিটিতে শীর্ষ পদপ্রত্যাশী। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিলুপ্ত কমিটির মধ্য থেকেই যোগ্য নেতৃত্ব খোঁজা উচিত। ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের সাবেক নেতাদেরও জায়গা দেওয়া যেতে পারে। তবে শীর্ষ পদে একেবারে নতুন মুখ আনার পক্ষে নন তিনি।
আনোয়ারুজ্জামান নিজেকে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক আমিনুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে আমিনুলের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রশংসাও করেন তিনি। মুক্তকণ্ঠকে আনোয়ারুজ্জামান বলেন, বিগত আন্দোলনে আমিনুলের ভালো ভূমিকা ছিল। মহানগর উত্তরের নেতা–কর্মীদের তিনি একটি পরিবারের মধ্যে নিয়ে এসেছেন।
আমিনুলকে সভাপতি করে নতুন কমিটি গঠনের পক্ষে মত দিয়েছেন সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইউসুফও। তবে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হাইব্রিড কেউ যাতে কমিটিতে ঢুকতে না পারেন, তা দেখতে হবে। ওয়ার্ড ও থানায় দুর্দিনে যাঁরা সক্রিয় ছিলেন, প্রয়োজনে তাঁদের খুঁজে এনে মহানগর কমিটিতে জায়গা দিতে হবে।
সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন ঢাকা–১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, নতুন কমিটি নিয়ে নীতিনির্ধারকেরা ভাববেন। এ বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা শোনেননি তিনি। তবে নেতৃত্ব বাছাইয়ে সাংগঠনিক দক্ষতা, যোগ্যতা ও অতীতের ভূমিকা বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মাঠের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি হলে ভবিষ্যতের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হবে। তৃণমূলের নেতা–কর্মীরা কাকে চান, প্রয়োজনে সেটিও যাচাই করা যেতে পারে। সরকারি দলের নেতাদের জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
যে ঘটনার পর কমিটি বিলুপ্ত
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার ছয় দিন পর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, মহানগর উত্তর যুবদল ও মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বিভিন্ন সংগঠনের ১৪ জনকে বহিষ্কারও করা হয়।
কমিটি বিলুপ্তির বিজ্ঞপ্তিগুলোতে রাড্ডার ঘটনার উল্লেখ ছিল না। যুবদল ও ছাত্রদলের ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা বলা হয়।
দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জানিয়েছেন, অভিযান আরও জোরদার হবে; অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।
নতুন কমিটির অপেক্ষা
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত আহ্বায়ক কমিটি প্রথমে ছয় সদস্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর। একই বছরের ২৬ নভেম্বর তা ৫১ সদস্যে সম্প্রসারিত হয়। আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের পাশাপাশি এতে ১৩ জন যুগ্ম আহ্বায়ক ও ৩৬ জন সদস্য ছিলেন। সম্প্রসারণের প্রায় ২২ মাস পর কমিটিটি বিলুপ্ত করা হলো।
মহানগরের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় বিরোধী দল ও সরকারি দলে থাকার সময়কার সাংগঠনিক চাহিদার পার্থক্যও উঠে আসছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নেতা বলেন, বিরোধী দলে থাকার সময় প্রধান লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আন্দোলন। এখন বিরোধী দল জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি জনগণের সমর্থন ধরে রাখার বিষয়ও রয়েছে।
যুবদল ও ছাত্রদলেও নতুন নেতৃত্ব
দুর্নাম নেই, এমন ব্যক্তিদের মহানগর উত্তর যুবদলের নতুন কমিটিতে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা। তাঁদের ভাষ্য, সব পর্যায়ের নেতা–কর্মীদের কঠোর বার্তা দিতেই পুরো কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এমন নেতৃত্ব চান তাঁরা, যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে নতুন করে সমালোচনা হবে না।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় একটি সূত্র বলছে, রাড্ডার ঘটনায় মহানগর পশ্চিম শাখার দু–একজনের সম্পৃক্ততার তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। এ কারণে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে কমিটি ভাঙা হয়।
তবে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ায় সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। দ্রুত নতুন কমিটি দেওয়া হবে।
নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে অতীতের ভূমিকার পাশাপাশি ক্ষমতায় থাকার সময়কার দায়িত্বের বিষয়টিও সামনে আনছেন নেতারা। সেই দায়ের কথা তুলে ধরে মহানগর উত্তর বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সরকারি দলে ভাবমূর্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়। ‘আরবি হরফ আলিফের মতো সোজা হয়ে থাকতে হয়। কারণ, নেতা–কর্মীরা ভুল করলে সেটা সরকারের কাঁধে গিয়ে পড়ে।’