মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং জি–৭ দেশগুলোর জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তের ফলে আজ সোমবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হ্রাস পেয়েছে। যদিও ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল অবকাঠামোতে নতুন করে হামলার আশঙ্কা রয়ে গেছে, তবে বাড়তি সরবরাহের প্রভাবে বাজারের সেই চাপ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।
আজ সকালে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৬ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ১০১ দশমিক ৫৯ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম কমেছে ৯৫ সেন্ট বা ১ দশমিক ৩ শতাংশ, যার ফলে প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯০ দশমিক ১২ ডলার।
উল্লেখ্য যে, গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম যে পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল, সপ্তাহের শেষভাগে তার সিংহভাগই কমে যায়। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
গত শুক্রবার জি–৭-ভুক্ত দেশগুলো তাদের জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পাশাপাশি তারা জ্বালানি রপ্তানিতে নতুন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে জি–৭ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ছে। আজ প্রকাশিত জাহাজ চলাচলের তথ্যানুসারে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে সাত দিনের মধ্যে চার দিনই মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির পরিমাণ যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের চেয়ে বেশি ছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা হওয়া সত্ত্বেও রপ্তানি বেড়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, “জি–৭-এর জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তে বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরছে বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে এসব তেল স্বাভাবিকভাবে বাজারে আসছে না। এই তেল বাজারে আনার খরচ যেমন বেশি, তেমনি যে পদ্ধতিতে এই তেল বাজারে আসছে, তা অতটা কার্যকর নয়।”
টিম ওয়াটারার আরও বলেন, “আপাতত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে এই দুটি বিষয় যথেষ্ট। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় আরও হামলা বা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা এখনো আছে।”
এদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বাহিনী গত ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনে ৫০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর পাল্টা জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও খুরাইস এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
গতকাল রোববার ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দেশের সব এলাকার পুনর্দখল নিতে তারা বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করছে।
অন্যদিকে এশিয়ার ক্ষেত্রে নভেম্বর মাসের জন্য অপরিশোধিত তেলের আগাম দাম অপ্রত্যাশিতভাবে কমিয়েছে সৌদি আরামকো। গত ছয় বছরের মধ্যে এটিই তাদের নির্ধারিত সর্বনিম্ন দাম।
আইএনজির বিশ্লেষকেরা তাদের নোটে উল্লেখ করেছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ায় ব্রেন্টের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেল উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন প্রকল্প ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে সদস্যদেশগুলোর তেল উৎপাদনের কোটা নির্ধারণে যে সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়, তা ২০২৭ সালের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে ওপেক প্লাস। ফলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে কতটা তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা আরও বাড়ানো হবে। গত শনিবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।