দৃষ্টিশক্তি নেই, তবুও অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মেধার জোরে শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করছেন। লক্ষ্মীপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক ইংরেজির ওপর ১০টি বই লিখে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আজাদ পাটোয়ারী জন্মগতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন না। ১০ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর আলো দেখতে পেতেন। তবে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রথমে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। পরবর্তীতে খেলতে গিয়ে চোখে বলের আঘাত লাগায় তাঁর বাকি দৃষ্টিশক্তিটুকুও চলে যায়।

চোখের আলো হারিয়ে ফেললেও পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ কমেনি। প্রতিকূলতাকে জয় করে নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হন।

আজাদ পাটোয়ারীর সহকর্মী এবং লক্ষ্মীপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হারাধন পাল তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা আজাদ স্যারের শিক্ষকতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। শিক্ষার্থীরা তার ক্লাস উপভোগ করে। মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল পদ্ধতিতেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে পাঠদান করেন।’

আজাদ পাটোয়ারীর কাছে শিক্ষকতা কেবল একটি জীবিকা বা চাকরি নয়, বরং এটি মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষককে সবচেয়ে বেশি শিখতে হয়। কারণ যুগ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে। শিক্ষার্থীরাও অনেক বিষয়ে শিক্ষকের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে। তাই শিক্ষকদের সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে হবে।’

একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষক হিসেবে তিনি সরকারের কাছে কিছু বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি চান সরকার যেন সময়মতো ব্রেইল বই সরবরাহ নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে ব্রেইল প্রিন্টার, ব্রেইল ডিসপ্লে এবং স্ক্রিন রিডারের মতো প্রয়োজনীয় সহায়ক প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর শিক্ষার্থী নুরে জান্নাত তানহা জানান, ‘ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে প্রথমে অবাক হয়ে যাই। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী একজন শিক্ষক কীভাবে পড়াবেন। পরে ক্লাস করে সেই ধারণা বদলে যায়। কণ্ঠ শুনেই স্যার বুজতে পারেন, কে কথা বলছে। অভিনয় ও উদাহরণের মাধ্যমে পড়ানোয় ক্লাস কখনো একঘেঁয়ে লাগে না।’

শিক্ষকতার পাশাপাশি মেন্টরস পাবলিকেশন্স থেকে ইংরেজির ওপর ১০টি বই লিখেছেন আজাদ পাটোয়ারী। ব্যাকরণ বিষয়ে তিনি লিখেছেন ‘গ্রামার মেন্টর’। বইটি বেসিক থেকে অ্যাডভান্স লেভেলের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে, যা ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী, ভর্তি পরীক্ষার্থী এবং বিসিএস ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

এছাড়া ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের লেখার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি লিখেছেন ‘ক্রিয়েটিভ রাইটিং মেন্টর’। এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকের ওপর ভিত্তি করে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির জন্য লিখেছেন ‘ইফেক্টিভ ভোকাবুলারি মেন্টর’ সিরিজের চারটি বই।

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি লিখেছেন ‘সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট’ এবং নবম-দশম শ্রেণির জন্য লিখেছেন ‘এসএসসি সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট’। এনসিটিবির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শ্রেণির মডেল টেস্ট, সাহিত্যের বিস্তারিত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের সমন্বয়ে এই বইগুলো সাজানো হয়েছে।

দালাল বাজার ফাতেমা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু সায়েদ বলেন, ‘আজাদ স্যার শিক্ষকতার পাশাপাশি বই লেখা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার মতো শিক্ষক বিরল।’

শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষকদের প্রশ্ন তৈরির সুবিধার্থে আজাদ পাটোয়ারী ‘ডে এক্সাম’ (dayexam.com) নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। এটি একটি সমন্বিত অনলাইন মূল্যায়ন ও প্রস্তুতি প্ল্যাটফর্ম। এখানে মাধ্যমিক স্তর থেকে শুরু করে যেকোনো নিয়োগ পরীক্ষা ও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য মক টেস্ট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিজ্ঞ শিক্ষকেরা এখান থেকে যেকোনো বিষয়ের ওপর প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন।

আজাদের মতে, কেবল পড়াশোনা করলেই হয় না, পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হওয়া সবচেয়ে জরুরি। তাঁর ভাষায়, ‘একজন শিক্ষার্থী বড় চাকরি করবে নাকি বড় ব্যবসায়ী হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সে যেন একজন ভালো মানুষ হয়।