দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মোট ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি ব্যাংক বর্তমানে পুঞ্জীভূত লোকসানের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। গত মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এই ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসানের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।

গত রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পেশ করা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক অবস্থার একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, মার্চ ২০২৬ ভিত্তিতে ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফার পরিমাণ ৭৮৯ কোটি টাকা হলেও নিট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

লোকসানের তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১৫টিই বেসরকারি। এই ব্যাংকগুলো হলো— এবি, বাংলাদেশ কমার্স, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, আইএফআইসি, ইসলামী, মেঘনা, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, পদ্মা, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, দি প্রিমিয়ার ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

এছাড়া লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে চারটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে, যেগুলি হলো জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক (উল্লেখ্য যে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক মোট ছয়টি)। বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) লোকসানের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি একটি বিদেশি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানও লোকসানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সংসদীয় কমিটিকে অবহিত করেছে যে, উচ্চ শ্রেণিকৃত (মূলত খেলাপি) ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশনিং (খেলাপির বিপরীতে পরিচালন মুনাফা থেকে টাকা রাখা), মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল সম্পদমান ব্যাংকগুলোর উপার্জন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা সমন্বয়ের পর অনেক ব্যাংক নিট ক্ষতিতে পড়ছে।

এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে অনিয়ম-দুর্নীতির ফলে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা এত তাড়াতাড়ি দূর করা সম্ভব নয়। লোকসান সেটিরই ফল। তবে লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হচ্ছে।”

তদন্তে দেখা গেছে, লোকসানে থাকা বেসরকারি ১২টি ব্যাংকের মধ্যে ৯টিই (এবি, আইসিবি ইসলামিক ও সীমান্ত ব্যাংক বাদে) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের নেতা এবং অনুগত ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই সময়ে ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম এবং ঋণের নামে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ব্যাপক অনিয়মের ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ।

এই পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্যের অবস্থা জানার একটি উপায় খেলাপি ঋণের হার। সেখানে দেখা যায়, তিন ভাগের এক ভাগ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। অন্যদিকে ব্যাংকের তিন ভাগের এক ভাগের বেশি লোকসানে।” তিনি আরও বলেন, “কিছু কিছু ব্যাংকের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থার সংকটের পরিস্থিতিও তৈরি হয়।”

তারল্য সহায়তার চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, গত মার্চ পর্যন্ত হিসাবে ১৫টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংক প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা গ্রহণ করেছে। সাধারণত কোনো ব্যাংক নগদ টাকার সংকটে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জরুরি সহায়তা চায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সহায়তা প্রদান করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪৩ কোটি, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২১ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৪ কোটি, এবি ব্যাংককে ৪ হাজার ২৭০ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬১৫ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ১৭ হাজার কোটি টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে এই সহায়তা কত বছরের জন্য দেওয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উক্ত বৈঠকে কমিটির সদস্য এনসপিসির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ খেলাপি ঋণ স্থায়ীভাবে রোধে একটি সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেন। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম তাঁদের দলের পক্ষ থেকে ব্যাংক খাত সংস্কারের একটি লিখিত প্রস্তাব জমা দেন।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “সংসদীয় কমিটিতে জবাবদিহি করা সরকারের দায়িত্ব। তাঁরা কোনো কিছু নিয়ে লুকোচুরি করবেন না। অনেকেই ব্যাংকের পরিচালক, চেয়ারম্যান হতে চান। কিন্তু অর্থনীতিতে রাজনীতিকীকরণের কোনো সুযোগ নেই।”

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য সাইফুল আলম সাংবাদিকদের জানান, “তাঁরা বলেছেন ব্যাংকের সংখ্যা কমাতে হবে। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশে এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন নেই।”

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, সফিকুর রহমান ও সৈয়দ জয়নুল আবেদীন।