ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সাতঘরহাটি গ্রামের বাসিন্দা রুবেল মিয়া (৩১)। তাঁর বাবা একজন কৃষক এবং মা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বাবা তাঁর চার ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন রুবেল। পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করে তিনি নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শেষ পর্যন্ত তিনি নিয়োগপত্র পাননি।

একই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন নবীনগর পৌর এলাকার কলেজপাড়ার মো. যোবায়েরুল ইসলাম (৩১)। তিনিও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে কোনো জটিলতা নেই এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলাও নেই। তা সত্ত্বেও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কথা বলে তাঁদের নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কী ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

নিয়োগপত্রের আশায় এখন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ছোটাছুটি করছেন এই দুই যুবক। তাঁদের দাবি, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং গোয়েন্দা যাচাইয়ের প্রতিবেদনে তাঁদের বিষয়ে ইতিবাচক কথা বলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও কেন তাঁরা নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না, সে বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি।

এই বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে মোট ২৫৫ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পারেননি। বাকি ২৪০ জনকে নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়েছে। তবে দুজন প্রার্থী বাদ পড়েছেন।

দুই প্রার্থীরই জোরালো দাবি, তাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কী ত্রুটি পাওয়া গেছে তা যেন স্পষ্টভাবে জানানো হয়। পাশাপাশি, তাঁরা যদি নিয়োগের সব শর্ত পূরণ করে থাকেন, তবে দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।

যাচাই-বাছাইয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকার কারণে দুজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে শামসুর রহমান বলেন, “বিষয়টি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নিয়োগপত্র পাওয়ার বিষয়ে চেষ্টা চলছে। তবে নিয়োগের চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে আসে।”

যাচাইয়ের সময় ঠিক কী ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েছে তা জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি গোপনীয়, তাই তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

গত রোববার নিয়োগপত্রের বিষয়ে খোঁজ নিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে গিয়েছিলেন রুবেল মিয়া। পরবর্তীতে মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশ পাওয়ার পর নিয়োগপত্রের অপেক্ষায় ছিলেন। চাকরি পেলে পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারবেন—এমন আশায় ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়োগপত্র না পাওয়ায় কেন এমন হলো, তা বুঝতে পারছেন না।

রুবেলের দাবি, “চাকরিটা পেলে বাবাসহ সংসারের উপকার হতো। পরিবারের জন্য কিছু করতে পারতাম।”

রুবেল আরও জানান, তাঁর পরিবার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এবং তিনি তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত। পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা যাচাইয়ে তাঁর বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানতে পেরেছেন। এরপরও নিয়োগপত্র না পাওয়ার কারণ জানতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন তিনি।

অন্যদিকে, যোবায়েরুল ইসলাম জানান, তাঁর দুই ভাই শিক্ষক হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তাঁর শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিটি ধাপ তিনি অতিক্রম করেন। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ফলাফল প্রকাশের পর তিনি সুপারিশপ্রাপ্ত হন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে সুপারিশ পাওয়ার পর তিনি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অফিস সহায়ক পদের জন্য কাগজপত্র জমা দেননি এবং পোস্টম্যান পদের মৌখিক পরীক্ষাতেও অংশ নেননি। কারণ, তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবেই তাঁর নিয়োগ হবে।

বর্তমানে যোবায়েরুলের বয়স ৩১ বছর ৬ মাস। সরকারি চাকরির বয়সসীমার শেষ প্রান্তে এসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তিনি চরম হতাশ। যোবায়েরুল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই এবং তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁর কাগজপত্র বা ঠিকানাতেও কোনো সমস্যা নেই। তারপরও কেন তাঁকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হলো, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর পাচ্ছেন না।

রুবেল মিয়া জানান, এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে তিনি মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তা তাঁকে গভীরভাবে হতাশ করেছে।

দুই প্রার্থীরই দাবি, তাঁদের নিয়োগে কী ত্রুটি পাওয়া গেছে, তা স্পষ্ট করে জানানো হোক। একই সঙ্গে তাঁরা যদি নিয়োগের সব শর্ত পূরণ করে থাকেন, তাহলে দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।