‘আমরা যারা জেন-জি, তারা কমল ভাই, সুমন ভাই, রাফা ভাই ও শিশির ভাইকে একসঙ্গে পারফর্ম করতে দেখিনি। তাই চারজনকে একই মঞ্চে দেখা, পাশাপাশি পছন্দের গানগুলো তাঁদের পরিবেশনায় শোনা—এই অভিজ্ঞতা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়,’ মুক্তকণ্ঠকে বলছিলেন ফরিদপুর থেকে আসা শ্রোতা রুশা খানম। তিনি জানান, জীবনে প্রথমবারের মতো অর্থহীনের পুরোনো ‘অসমাপ্ত’ লাইনআপকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি; তাই ফরিদপুর থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছেন।

গত শুক্রবার রাতে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ঢাকা ব্রডকাস্টের আয়োজনে ‘অ্যাভয়েড রাফার এত বোকা কেন তুমি’ অ্যালবামের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ও শো অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় দেড় দশক পর সেই বিশেষ মঞ্চেই একসঙ্গে পারফর্ম করলেন ২০০৮ সালে ঝড় তোলা অর্থহীনের ‘অসমাপ্ত ১’ অ্যালবামের চার প্রধান সদস্য—সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন, ইব্রাহিম আহমেদ কমল, শিশির আহমেদ ও রাফা।

২০০৩ সালে ‘ধ্রুবক’ অ্যালবাম প্রকাশের পর দীর্ঘ বিরতি নিয়েছিল অর্থহীন। এরপর পাঁচ বছর পর ২০০৮ সালে পঞ্চম অ্যালবাম ‘অসমাপ্ত ১’ নিয়ে তারা পুনরায় ফিরে আসে। পরবর্তীতে তারা ‘অসমাপ্ত ২’ প্রকাশ করে। তবে সময়ের সাথে সাথে সুমন ব্যান্ড থেকে চলে যান এবং ততদিনে কমল ও রাফাও অর্থহীন ছেড়েছেন। উল্লেখ্য, শিশির ২০২৩ সালে ব্যান্ড ছাড়লেও চলতি বছরে পুনরায় অর্থহীনে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে কমল ওয়ারফেজ ব্যান্ডের সাথে যুক্ত এবং রাফা নিজস্ব ব্যান্ড ‘অ্যাভয়েড রাফা’ গঠন করেছেন। ২০১২ সালের শুরুর দিকে শেষবারের মতো এই চারজনকে এক মঞ্চে দেখা গিয়েছিল।

দীর্ঘ বছর পর এই পুনর্মিলন মুহূর্তগুলোকে আরও রঙিন করে তুললেন কমল ও সুমনরা। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মঞ্চে অবস্থান করেন তাঁরা। ‘অসমাপ্ত’ ও ‘আনমনে’ থেকে শুরু করে ‘অদ্ভুত সেই ছেলেটি’—একের পর এক জনপ্রিয় গানে শ্রোতাদের মাঝে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেন সুমন। সুমন প্রায়ই বলে থাকেন যে, তাঁকে গান গাইতে হয় না, কারণ শ্রোতারাই অর্থহীনের গান গেয়ে ফেলেন; সেই দাবির প্রমাণ পাওয়া গেল এই শো-তেও। সুমনদের প্রায় প্রতিটি গানেই উপস্থিত শ্রোতাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কণ্ঠ মেলাতে দেখা গেছে।

পুরোনো এই লাইনআপকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার মূল পরিকল্পনা করেছিলেন রাফা। কেন এই উদ্যোগ, তা জানতে চাওয়া হলে মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আসলে এই শো করার পেছনে অনেক দিনের একটা স্বপ্ন ছিল। অর্থহীন ছাড়ার পরই আমার মনে হয়েছিল, আমি একটা অ্যালবাম করব। একই সঙ্গে একটা ইচ্ছাও ছিল—একদিন যেন আমরা আবার একসঙ্গে একটা মঞ্চে দাঁড়াতে পারি। পিংক ফ্লয়েডের ডেভিড গিলমোর আর রজার ওয়াটার্সের মতো শিল্পীদের আমরা দেখেছি। তাঁরা অনেক আগে ব্যান্ড থেকে আলাদা হয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁদের ভক্তরা সারা জীবন অপেক্ষা করেছে, কবে তাঁরা আবার একসঙ্গে মঞ্চে উঠবেন। আমারও সব সময় মনে হয়েছে, আমাদের ক্ষেত্রেও এমন কিছু হলে কেমন হয়।’

২০১৫ সালে অর্থহীন ত্যাগ করার কথা উল্লেখ করে রাফা আরও বলেন, ‘তারপর দেখতে দেখতে অনেক বছর চলে গেছে। আমরা সবাই আলাদা পথে কাজ করেছি; কিন্তু একটা সময় মনে হলো, সময় তো থেমে থাকবে না। আমরা যারা একসঙ্গে ছিলাম, আমাদের বয়সও হচ্ছে। তাই আর অপেক্ষা না করে মনে হলো, এবার কাজটা করেই ফেলি। বিশেষ করে ২০২৩ সালের পর থেকে বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াসভাবে ভাবতে শুরু করি। বাবাকে হারানোর পর জীবন নিয়ে আমার ভাবনাতেও অনেক পরিবর্তন আসে। তখন মনে হয়েছে, কিছু স্বপ্ন পরে করব বলে রেখে দিলে হয়তো আর করা হবে না।’

তরুণ প্রজন্মের শ্রোতাদের সামনে অর্থহীনের সেই পুরোনো গানগুলো পুনরায় উপস্থাপনের পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। রাফা বলেন, ‘আমরা যখন তরুণ ছিলাম, তখন এই গানগুলো করতাম। এখন তো দর্শকেরা আমাদের “আঙ্কেল” বলে ফেলেছে। তাই ভাবলাম, তাদের সামনে আবার সেই গানগুলো করা উচিত। না হলে একসময় হয়তো তাদের বাবার কাছে গিয়ে শুনে আসতে হবে—“তোমরা এমন একটা ব্যান্ড ছিলে, যারা এভাবে মিউজিক করত।” আমাদের ইচ্ছা ছিল, এই প্রজন্মের দর্শকদের সামনে সেই সময়ের গানগুলো আবার নিয়ে আসা। নতুন প্রজন্মের মানুষ যেন বুঝতে পারে, একটা সময় আমরা কী ধরনের মিউজিক করতাম।’

অন্যদিকে, অর্থহীনের বর্তমান সদস্য শিশির আহমেদ শ্রোতাদের ভালোবাসায় গভীরভাবে আপ্লুত। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘“অসমাপ্ত”র পুরোনো লাইনআপ নিয়ে যখন আমরা চারজন আবার স্টেজে উঠলাম, সেটা আমার জন্য ভীষণ আবেগের একটা মুহূর্ত ছিল। এত বছর পর আমরা আবার একসঙ্গে মঞ্চে উঠব, সত্যি বলতে কখনো ভাবিনি। আমরা যেমন আবেগাপ্লুত ছিলাম, দর্শকদের মধ্যেও একই আবেগ দেখেছি। পুরোনো গানগুলো আবার একসঙ্গে করা, সেই স্মৃতিগুলোকে নতুন করে ফিরে পাওয়া—এটা অসাধারণ একটা অভিজ্ঞতা। একজন মিউজিশিয়ান হিসেবে এটা আমাদের জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। এত বছর পর আবার একসঙ্গে স্টেজে উঠতে পারা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। আবার কখনো একসঙ্গে স্টেজে ওঠা হবে কি না, জানি না। তবে এই মুহূর্তটা আমাদের কাছে সব সময়ই বিশেষ হয়ে থাকবে। আর আমাদের সব দর্শক ও ভক্তকে ধন্যবাদ—এত বছর ধরে আমাদের পাশে থাকার জন্য। তাঁদের জন্যই তো আমাদের মিউজিক করা।’

ভবিষ্যতে আবারও ‘অসমাপ্ত’ লাইনআপকে একসঙ্গে দেখা যাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রাফা বলেন, ‘কোনো কিছু বেশি করে ফেললে তার মূল্য কমে যেতে পারে। একটা চাহিদা থাকা দরকার। এখন যেহেতু একটা চাহিদা তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতে আমরা আরও বড় করে করতে পারি। দেখা যাক, কী হয়; ইচ্ছা অবশ্যই আছে।’

অনুষ্ঠানে ‘চলো আরেকবার উড়ি’ গানটি রাফার সাথে পরিবেশন করেন প্রীতম হাসান এবং ‘আমি আকাশ পাঠাব’ গানে যোগ দেন রাফার বড় ভাই সাদী মুক্তাফি।