বগুড়ার শেরপুর পৌর শহরের উত্তর পাশে একসময় ছিল এক বিশাল ও গভীর জলাধার, যা স্থানীয়দের কাছে ‘গোসাঁইয়ের দহ’ নামে পরিচিত ছিল। সেতুর পূর্ব পাশে প্রায় ১০০ মিটার এবং পশ্চিম পাশ হয়ে উত্তর দিকে প্রায় ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল এই দহটি। এক সময় এর গভীরতা ছিল এতটাই যে, লম্বা বাঁশ পানিতে নামিয়েও মাটির সন্ধান পাওয়া যেত না। চারপাশের করতোয়া নদীর পানি শুকিয়ে গেলেও এই গভীর জলাধারে সারা বছর পানি থাকত। সেই স্বচ্ছ পানিতে ঘুরে বেড়াত বোয়াল, আইড়, চিতল, রুই, কাতলাসহ দেশি নানা প্রজাতির মাছ। শুষ্ক মৌসুমেও নদীর বুকের সেই জলাধার দূর থেকেই আলাদা করে চেনা যেত।
গত শুক্রবার বিকেলে শেরপুর পৌর শহরের উত্তর পাশে গোসাঁইপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, করতোয়া নদীর ওপর একটি সেতু দাঁড়িয়ে আছে। যে এলাকায় একসময় দহটি ছিল, তার বড় অংশ এখন কচুরিপানায় ঢাকা পড়ে গেছে। প্রায় ২৫ বছর আগে স্থানীয় নববৃন্দাবন পাড়া থেকে মহিপুর গ্রামে যাতায়াতের সুবিধার্থে দহের মাঝবরাবর চলাচলের জন্য বাঁধ তৈরি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আগে করতোয়া নদী উত্তর দিক থেকে পশ্চিমে কিছুটা বাঁক নিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হতো এবং ঠিক সেই বাঁকেই অবস্থান করত এই দহটি। বর্তমানে নদীর গতিপথ বদলে গেছে এবং নদী এখন দহের পাশ দিয়ে সোজা দক্ষিণে চলে গেছে। এর ফলে পাশের শ্মশানঘাটটিও এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
একসময় এই দহটি ছিল দেশি মাছের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল। এখান থেকে মাছ ছড়িয়ে পড়ত করতোয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায়। একই সঙ্গে এটি ছিল স্থানীয় জেলেদের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার পালনের পবিত্র স্থান। তবে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলি জমা, অবৈধ দখল এবং ভরাটের কারণে সেই গভীর জলাধারটি আজ হারিয়ে গেছে।
গোসাঁইপাড়ার ৯০ বছর বয়সী পরেশ চন্দ্র সাহা স্মৃতিচারণ করে বলেন, তাঁর বয়স যখন ২০ বছর, তখন তিনি দেখেছেন, গোসাঁইয়ের দহে লম্বা বাঁশ নামিয়েও মাটির নাগাল পাওয়া যেত না। তিনি জানান, ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে দহের আগের রূপ বদলাতে শুরু করে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি দখল ও ভরাটের ফলে ধীরে ধীরে গভীরতা হারিয়ে ফেলে দহটি।
হাজিপুর পাড়ার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী অবিরণ খাতুনের স্মৃতিতেও উজ্জ্বল সেই দিনগুলো। তিনি বলেন, “আশপাশের মানুষ দহের পানি ব্যবহার করতেন। ছোটবেলায় তিনি দেখেছেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দহের পানিতে এসে পূজা করতেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৪৫) ও বাসুদেব ভট্টাচার্য (৬২) জানান, বর্তমানে দহে শুধু কচুরিপানার বিস্তার। পানির সেই আগের গভীরতা নেই, নেই মাছের ঝাঁক কিংবা জেলেদের ব্যস্ততা। গোসাঁইপাড়ার ব্যবসায়ী রঞ্জন দত্ত (৫৭) বলেন, একসময় জেলেরা দহের মাছ ধরে জীবন-জীবিকা চালাতেন। তবে দহ শুকিয়ে যাওয়ার পর করতোয়ায় দেশি প্রজাতির মাছও আর আগের মতো দেখা যায় না।
দহের উত্তর পাশে নববৃন্দাবন পাড়ায় বসবাসকারী জেলে পরিবারের একজন আনন্দ হাওয়ালদার (৫০) জানান, একসময় দহের মাছ ছিল তাঁদের আয়-রোজগারের বড় উৎস। তিনি বলেন, “নদীর পূর্ব পাশে মাটি কেটে পানিপ্রবাহের গতিপথ বদলে দেওয়ায় এখন দহে আগের মতো পানি জমে না। এখন মাছও নেই, জেলেদের সেই আয়ও নেই।”
একই পাড়ার বাসিন্দা লালন মহন্ত (৫১) মনে করেন, দহটি রক্ষা করতে হলে অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি করতোয়ার পুরোনো গতিপথে খনন করা প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একটি দহ হারিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি জলাধার হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়েছে দেশি মাছের প্রজনন ও আবাসস্থল, জেলেদের জীবিকার উৎস এবং এলাকার পুরোনো সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি অংশ। তাঁরা বিশ্বাস করেন, নদীর সঙ্গে যুক্ত দহ, বিল ও জলাভূমি রক্ষা করা গেলে করতোয়ার জীববৈচিত্র্য পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এদিকে, করতোয়ার পুরোনো গতিপথে খননের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বগুড়ার পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী সবুজ কুমার শীল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অতীতে নদীর গতিপথ যেদিক দিয়ে ছিল, মূলত সেই পথ ধরেই খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে।”
এই বিষয়ে শেরপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে জানান, তিনি গত ২৯ সেপ্টেম্বর শেরপুরে যোগ দিয়েছেন। গোসাঁইয়ের দহ অতীত থেকেই দেশি মাছের প্রজননস্থল ছিল কি না, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই। তবে তিনি দহটির খোঁজ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
করতোয়ার বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া ‘গোসাঁইয়ের দহ’ তাই এখন আর কেবল একটি নাম নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে হারিয়ে যাওয়া নদীজীবনের এক করুণ স্মৃতি।