পাঁচ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, ২০২১ সালের সেই বহুলচর্চিত ‘পা-কাণ্ড’ আবারও ফিরে এসেছে বর্তমান রাজনীতির আলোচনায়। এবারও মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী। তবে এবারের সংঘাত নির্বাচনী লড়াইয়ের চেয়েও বেশি কেন্দ্রিক পাঁচ বছর আগের সেই পায়ের ‘ফ্রাকচার’ বা হাড় ভাঙার ঘটনাকে ঘিরে।

স্মরণ করা হয় ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সেই সময়কে, যখন নন্দীগ্রামের নির্বাচনী প্রচারে আহত হয়ে হুইলচেয়ারে বসে প্রচার চালিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পায়ে তখন প্লাস্টার ছিল। সেই ঘটনাটি নিয়ে তখন থেকেই রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছিল। পাঁচ বছর পর সেই পুরোনো ফাইলটিই যেন নতুন করে খুলেছেন বর্তমানের প্রভাবশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারী।

গত শনিবার শুভেন্দু অধিকারী ২০২১ সালের ১১ মার্চের একটি এক্স-রে রিপোর্ট সামনে এনে দাবি করেছেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পা আসলে ভেঙে যায়নি। তাঁর ভাষায়, মমতা পা ভাঙার ‘নাটক’ করেছিলেন সহানুভূতির ভোট পাওয়ার আশায়।

শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, নন্দীগ্রামে নিজের পা ভাঙার যে মিথ্যা দাবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছিলেন, তার মাধ্যমে তিনি আসলে নন্দীগ্রামকে অপমান করেছেন। তবে বর্তমানে নির্বাচনী বিধি কার্যকর থাকায় তিনি এখনই সব কথা প্রকাশ করবেন না। আগামী ৯ অক্টোবর নন্দীগ্রাম আসনের উপনির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আনবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে এই ঘটনার পুনরায় তদন্ত এবং যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন শুভেন্দু।

অর্থাৎ, পাঁচ বছর পর সেই পুরোনো ‘পায়ের ব্যথা’ আবারও রাজনীতির মূল আলোচনায় ফিরে এসেছে। তবে এবার আর হুইলচেয়ারের লড়াই নয়, লড়াইটি হচ্ছে এক্স-রে রিপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে।

শুভেন্দুর এই গুরুতর অভিযোগ মানতে নারাজ তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা কুণাল ঘোষ। তাঁর দাবি, বিজেপি পরিকল্পিতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হেয় করার ষড়যন্ত্র করছে। কুণাল ঘোষের মতে, মমতার সেদিন সত্যিই পায়ে গুরুতর চোট লেগেছিল এবং সেই আঘাতপ্রাপ্ত পা নিয়েই তিনি নির্বাচনী প্রচারে নেমেছিলেন, যা সাধারণ মানুষও প্রত্যক্ষ করেছেন।

ঘটনাটি ছিল ২০২১ সালের ১০ মার্চের। নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন, রেয়াপাড়ার রানীচকে একটি মন্দিরে পূজা দিয়ে বের হওয়ার সময় ভিড়ের মধ্যে কেউ তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এতে তাঁর পা, মাথা ও কপালে আঘাত লাগে। তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন, ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল না এবং তাঁকে পরিকল্পিতভাবে আহত করা হয়েছে।

আঘাত পাওয়ার পর কলকাতার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন মমতা। পরদিন তাঁকে এক্স-রে করানোর জন্য বাঙুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপরই পায়ে প্লাস্টার করে হুইলচেয়ারে নির্বাচনী প্রচারে দেখা যায় তাঁকে।

সেই সময়েই বিরোধীরা এই ঘটনাটিকে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বলেছিলেন, সহানুভূতির ভোট পাওয়ার জন্য এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয়ও প্রশ্ন তুলেছিলেন, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব যাঁর হাতে, তাঁর সঙ্গেই এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল।

নন্দীগ্রামের সেই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিত হন এবং জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী। তবে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সেই নির্বাচনের ‘পা-কাণ্ড’ যেন রাজনীতির ময়দান ছাড়েনি। এখন দেখার বিষয়, আগামী ৯ অক্টোবরের পর সেই পুরোনো ‘ফ্রাকচার’ নিয়ে নতুন কোনো রাজনৈতিক ‘এক্স-রে’ রিপোর্ট সামনে আসে কি না।