কিম জং–উন আর আমার আব্বার স্বভাবের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করি। সম্প্রতি শুনলাম, অন্য দুটি দেশের যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝে মাথা গরম করে কিম সাহেব অকারণে অন্য দিকে কিছু মিসাইল ছুড়ে দিয়েছেন। আমার আব্বাও অনেকটা এই রকমই ‘পাগলা’। একবারের এক ঘটনা মনে পড়ে। বাসায় মেহমান এসেছিলেন। মামা-চাচারা তখন রাজনীতি নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধে লিপ্ত। চারদিকে চিল্লাচিল্লি আর হইচই। দেখলাম, আব্বা মেজাজ খারাপ করে একপ্রকার নিরপেক্ষ ভাব ধরে চুপচাপ বসে আছেন।
সেই চিল্লাচিল্লিতে অস্থির হয়ে মনে মনে ভাবলাম, ‘ধুর, যাইগা।’
নিজেকে প্রস্তুত করে বের হতে গিয়েই আব্বার সামনে পড়লাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই আব্বা বলে উঠলেন, “ওই, ভদ্র ছেলেরা কখনো হাফপ্যান্ট পরে বাইরে যায়”—আর এই কথাটি বলেই ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন আমার গালে!
এমনটা নয় যে তিনি আমাকে এই প্রথমবার হাফপ্যান্ট পরতে দেখেছেন। আমি বুঝলাম, রাজনীতির তর্কে তিনি সুবিধা করতে পারেননি বলেই তাঁর ভেতরে জমে থাকা পুঞ্জীভূত রাগটা হাফপ্যান্টের উসিলায় আমার ওপর ঢেলে দিলেন।
আব্বার কথা তো বললাম, আম্মার কথা না বললেই নয়। তিনি হাফপ্যান্ট পরা মানুষকে রীতিমতো সন্দেহের চোখে দেখেন। আগে আমি একটি ক্রিয়েটিভ এজেন্সিতে কাজ করতাম, যেখানে প্রথাগত কোনো ড্রেসকোড ছিল না। একবার এক ভদ্রমহিলা আম্মার কাছে জানতে চাইলেন, “আপনার বড় ছেলে কী করে?”
আম্মা তখন আক্ষেপ করে উত্তর দিলেন, “বলে তো চাকরি করে একটা। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না। এমনিতে সকালে দেখি হাফপ্যান্ট পরে ব্যাগ নিয়ে বের হয়, রাতে বাসায় ফেরে। কই যে যায়, জানি না ভাবি…”
আসলে একজন মানুষ যখন সব দিক দিয়ে মোটামুটি ওকে থাকেন, যখন তাকে কোনো দিক দিয়েই ধরা যায় না, তখনই একমাত্র তার পোশাক নিয়ে ‘অ্যাটাক’ করা হয়। আমরা এই বিষয়টিকে রীতিমতো একটি ঐতিহ্যের কাছাকাছি পর্যায়ে নিয়ে গেছি।
সম্প্রতি মেট্রোরেলে একজন অ্যাথলেটকে হাফপ্যান্ট পরার কারণে পুলিশ হেনস্তা করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই পুলিশের দলে নারী সদস্যও উপস্থিত ছিলেন! পোশাকের কারণে এই দেশে প্রকাশ্যেই নারীদের কত রকম বাজে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা আমরা সবাই জানি। শুধু পোশাকের কথাই বা বলছি কেন, এই দেশে মানুষকে হেনস্তা করার উপায় আছে এক হাজার একটা। এই তো সেদিন কেবল বিয়ে না করার কারণে তিন নারীকে নেপালে যেতে দেয়নি পুলিশ। ইমিগ্রেশনে আটকে দেওয়া হয়েছিল তাদের। পুরো বিষয়টি এতটাই দৃষ্টিকটু ও গুরুতর ছিল যে সেই তিন নারীকে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট পর্যন্ত যেতে হয়েছে।
একদিক থেকে ভাবলে মন্দও লাগছে না। আমরা বাঙালিরা সব সময়ই নিজেদের একটু আলাদা ভাবতে পছন্দ করি। সারা বিশ্ব সামনে এগিয়ে যাক, আমরা বরং পেছনে যাব। যেতে যেতে ফিরে যাব সেই আদিম যুগে। তখন পোশাকের কোনো ঝামেলাই থাকবে না, শুধু ছালবাকল পরে থাকব। এমনিতেই দেশে যা গরম, এর চেয়ে ভালো উপায় আর আছেই বা কী!
—বি.এস