বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত তরুণ সমাজকে রাষ্ট্র পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান। তাঁর মতে, এশিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও গতিশীলতার যে চিত্র আমরা দেখি, তা প্রকৃতপক্ষে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রওনক জাহান বলেন, ‘এশিয়ার যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও গতিশীলতার কথা আমরা বলছি, সেটি তরুণদের মধ্যে বৈষম্য বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ, ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশের তরুণেরা এই প্রবৃদ্ধি মডেলে অসন্তুষ্ট। সে জন্য বিভিন্ন দেশে তরুণদের বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। জেন-জি প্রজন্মের উত্থানও লক্ষ করা যাচ্ছে।’
গতকাল শনিবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) কর্তৃক আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের প্রথম দিনের শেষ অধিবেশনে বক্তা হিসেবে এসব কথা বলেন তিনি। উক্ত অধিবেশনটির শিরোনাম ছিল ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া: দ্য সেঞ্চুরিস ডিফাইনিং রিজন’।
এশিয়ার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব যে আজকের তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে, সেই বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করে রওনক জাহান উল্লেখ করেন যে, তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভের জায়গাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁরা মূলত বৈষম্য এবং শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাঁরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করেন যা হবে ন্যায়সংগত ও সমতাভিত্তিক। এখন সময়ের দাবি হলো তরুণদের এই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা।
অন্যদিকে, যেকোনো বড় জাতীয় সংকটে জাতিগত ঐক্যই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই একমত যে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু গত ১৭ বছরে আমাদের দেশে একটা প্রজন্মকে রাজনীতিবিমুখ করে ফেলা হয়েছে, যাতে তারা জাতি গঠনে যুক্ত না হয়। তরুণদের ভাবতে হবে এটা তাদের দেশ। এ দেশ গঠনে তাদেরই ভূমিকা নিতে হবে।’
বিদেশে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির কথা উল্লেখ করে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহান বলেন, তাঁদের দক্ষতাকে দেশের কাজে লাগানো অত্যন্ত প্রয়োজন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দেড় কোটি থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন, যাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে পুরো এশিয়া জুড়ে। তাঁরা প্রতি বছর ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। একটি সক্রিয় ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে ফারুক সোবহান পরামর্শ দেন যে, এশিয়ার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভারত ও চীনকে আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর মধ্যে ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে যুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বিমেরুকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার বাইরে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে ভারত বলে জানান ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং ভারতের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজের সাবেক পরিচালক শ্রীরাধা দত্ত। তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ায় জাপান ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অংশীদার। ভারতের প্রত্যাশা হলো, এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেরাই আলোচনা করবে এবং নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
পুরো অধিবেশনটি পরিচালনা করেন জাপানের হাডসন ইনস্টিটিউটের অনাবাসিক ফেলো সাটোরো নাগাও। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন জার্মানির ফ্রেডরিখ এবার্ট স্টিফটুংয়ের হেড অব এশিয়া প্যাসিফিক মার্কো গান্টার।