রিকশা ও ভ্যান মেরামতের মিস্ত্রি শাহ আলম। শনিবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরের ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-১০ কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতের একটি গাছের ছায়ায় বসেছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ আগেই একটি ভ্যানের সামনের চাকা মেরামতের জন্য খুলেছিলেন তিনি এবং কাজ শেষ করে কিছুটা সময় জিরিয়ে নিচ্ছিলেন।
শাহ আলমের পাশে পড়ে ছিল কাঠের পুরোনো একটি বাক্স। গত বুধবারের উচ্ছেদ অভিযানের সময় এই বাক্সটি ভেঙে গিয়েছিল। এর ফলে ভেতরে থাকা রিকশা, ভ্যান ও সাইকেল মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তবে সেই ভাঙা বাক্সটিই জোড়াতালি দিয়ে পুনরায় ব্যবহার করছেন শাহ আলম। বর্তমানে সেই বাক্সের ভেতরে নতুন করে কেনা সেলাই রেঞ্চ, হাতুড়ি, ডাল রেঞ্চ এবং চাকার টিউবসহ নানা সরঞ্জাম রাখা হয়েছে।
কয়েক দিন আগেও এই নির্দিষ্ট স্থানে বসে পুনরায় কাজ করতে পারবেন, তা শাহ আলম কল্পনা করতে পারেননি। উচ্ছেদ অভিযানের সময় তাঁর কাজের বাক্সসহ সব সরঞ্জাম হারিয়ে যাওয়ায় তিনি চরম হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু এখন সেই একই বাক্সের পাশে বসেই তিনি আবার রিকশা-ভ্যান সারানোর কাজ শুরু করেছেন।
উচ্ছেদ অভিযানের দিনের স্মৃতিচারণ করে শাহ আলম বলেন, ওই দিন পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। পরে একটি ভবনে আগুন ধরে যায়। পুলিশ সরে যাওয়ার পর দুপুরের দিকে প্রায় দেড় ঘণ্টা সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে বুলডোজার ও সিটি করপোরেশনের গাড়ি আসে।
সেই সময়ের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে শাহ আলম বলেন, “আমি চাইসিলাম বাক্সটা সরাইয়া হালাই। পরে দেহি আমার বাক্স সহকারে ভাইঙ্গা দিতাসে। আমি বাক্স বাঁচাইতে গেসি। আমারে চার-পাঁচজন পুলিশ টাইনা নিয়ে গেসে। এহানদিয়া আমার মালসামানা, বাক্স ভাইঙগা যা ছিল সব লইয়া গেসে।”
পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি ফিরে এসে দেখেন, তাঁর একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম সেই বাক্সটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। শাহ আলম আক্ষেপ করে বলেন, “আমি মাথায় হাত দিয়া বইসা আসি আর কানতাসি। কী করমু, আমি নিরীহ মানুষ। আমি তো আর ফুটে দোকান করি না। রোডে দোকান করি, রিকশা সাইকেলের কাম করি। এ ছাড়া আমার আর কিছু নাই।”
একাই সংসারের জোগান
শাহ আলমের বয়স এখন ৭৫ বছর। তাঁর ভাষ্যমতে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভোলার বোরহানউদ্দিন থেকে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। এরপর থেকেই রিকশা, সাইকেল ও ভ্যান মেরামতের কাজ করে জীবন অতিবাহিত করছেন। তাঁরই কাঁধে চেপে আছে পাঁচ-ছয়জনের পরিবারের খাবারের জোগান দেওয়ার দায়িত্ব।
মিরপুরের বাইশটেকি আয়না মসজিদ এলাকায় বসবাস করেন শাহ আলম। তাঁর সঙ্গে থাকেন দ্বিতীয় স্ত্রী, বড় মেয়ে ও দুই নাতি। ছোট মেয়ে থাকেন গ্রামের বাড়িতে এবং প্রথম স্ত্রী ইতিপূর্বে মারা গেছেন।
নিজের দৈনিক আয় সম্পর্কে শাহ আলম বলেন, “এইটা ঠিক নাই। কাজের ওপরে নির্ভর করে। ৩০০, ৪০০, কোনো দিন ঠেইলা–মেইলা ৫০০।”
উচ্ছেদে কাজের সরঞ্জাম হারানোর পর নতুন করে কাজ শুরু করা তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। সেলাই রেঞ্চ, হাতুড়ি, ডাল রেঞ্চ ও চাকার টিউবসহ প্রয়োজনীয় কিছু মালপত্র তিনি নতুন করে সংগ্রহ করেছেন। ভাঙা বাক্সটিও মেরামত করে নিয়েছেন। বাকি প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলোও ধীরে ধীরে কেনার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
ফেসবুকে দেখে খোঁজ
উচ্ছেদ অভিযানে শাহ আলমের সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাটি নজরে আসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের।
প্রশাসকের সহকারী একান্ত সচিব আল-আমীন আলম মুক্তকণ্ঠকে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বৃদ্ধের ঘটনাটি তাঁদের নজরে আসে। পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার শাহ আলমকে খুঁজে বের করা হয়। তাঁকে নগর ভবনে ডেকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন প্রশাসক।
আল-আমীন আরও জানান, শাহ আলম প্রশাসককে জানিয়েছিলেন যে, তিনি ২০ হাজার টাকা ঋণ করে রিকশা–ভ্যান মেরামতের কিছু নতুন সরঞ্জাম কিনেছিলেন। উচ্ছেদ অভিযানে পুরোনো সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পর নতুন করে কাজ শুরু করতে তিনি সমস্যায় পড়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রশাসক তাঁকে ২০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করেন।
পাশাপাশি রাস্তার পাশে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে কাজ করার জন্য শাহ আলমকে অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান আল-আমীন।
আজ বিকেলে ভ্যানের চাকা মেরামতের কাজ করতে করতে শাহ আলম বলছিলেন, কাজ না করে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, এই কাজের ওপরই তাঁর পুরো সংসার চলে। কথা শেষ করেই তিনি পুনরায় কাজে মনোনিবেশ করেন এবং খোলা চাকার রিং হাতে তুলে নিয়ে মেরামতের কাজ শুরু করেন।