মাছ বাঙালির খাদ্যতালিকার অপরিহার্য অংশ। ভাতের সাথে মাছের ঝোল, ভাজা বা সর্ষে দিয়ে রান্না করা মাছ সাধারণত প্রতিদিনের খাবারে থাকে। তবে বছরের সব সময় এবং সব ধরনের মাছের ক্ষেত্রে একই রকম সতর্কতার প্রয়োজন হয় না। মাছের নিরাপত্তা তার প্রজাতি, আকার, উৎস এবং পানির পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে অক্টোবর মাসে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ সময় কিছু মাছের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় এবং বর্ষার পর নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের পানিতে দূষণের আশঙ্কা থাকায় সচেতন থাকা জরুরি।

বড় শিকারি মাছের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন কারণ তারা খাদ্যশৃঙ্খলের উপরের দিকে থাকে। ছোট মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী খেয়ে তাদের শরীরে পারদসহ বিভিন্ন দূষক জমা হতে পারে। হাঙর, সোর্ডফিশ, কিং ম্যাকারেল এবং বড় টুনা এর উদাহরণ। একবার খেলেই ক্ষতির কথা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত পরিমাণে দূষকযুক্ত মাছ খাওয়ার ঝুঁকি কমানোই লক্ষ্য। গর্ভবতী নারী, শিশু ও ছোটদের ক্ষেত্রে মাছ বাছাইয়ের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে নদী, খাল ও পুকুরের পানিতে নর্দমা, কৃষিজমির রাসায়নিক ও শিল্পবর্জ্য মিশে যেতে পারে। ফলে সেই পানিতে থাকা মাছও দূষণের সংস্পর্শে আসে। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দূষিত পানি থেকে ধরা মাছ দেখতে বা গন্ধে স্বাভাবিক মনে হলেও তাতে জীবাণু বা রাসায়নিক দূষণের ঝুঁকি থাকতে পারে। বন্যার পানিতে ধরা মাছের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাই অজানা উৎসের চেয়ে নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে মাছ কেনা নিরাপদ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অক্টোবরে ইলিশের বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। এই সময়ে ইলিশ পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, কেনাবেচা ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হলো ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন ধরে রাখা। অর্থাৎ, এই সময়ে ইলিশ না খাওয়ার বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, এটি মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণের সাথেও জড়িত।

ছোট মাছ তুলনামূলক নিরাপদ হলেও শুধু আকারের ওপর ভরসা করা যাবে না। মাছ কোন জলাশয় থেকে এসেছে এবং সেখানে দূষণের মাত্রা কত, তাও বিবেচ্য। মাছ কেনার সময় চোখের স্বচ্ছতা, ফুলকার উজ্জ্বল লালচে বা গোলাপি রং, গন্ধ এবং মাংসের দৃঢ়তা যাচাই করা জরুরি। ভালোভাবে রান্না করলে জীবাণু ধ্বংস হলেও রাসায়নিক দূষক দূর হবে না। তাই নিরাপদ উৎস থেকে মাছ কেনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মাছ উচ্চমানের প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজের উৎস। তাই মাছ খাওয়া বন্ধ করার কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। বরং একই ধরনের মাছ নিয়মিত বেশি খাওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। এতে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির সম্ভাব্য দূষকের সংস্পর্শ অতিরিক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে। বাংলাদেশে অক্টোবরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে ইলিশ না কেনা ও না খাওয়া আইনি বাধ্যবাধকতা ও প্রজনন রক্ষার পাশাপাশি একটি সামাজিক দায়িত্ব। মাছকে ভয় পাওয়ার বদলে সচেতনভাবে বেছে নেওয়া এবং নিরাপদ উৎসের মাছ কিনে যথাযথভাবে রান্না করে খাওয়াই উচিত।

সূত্র: নিউজ ১৮