ভবনের ছাদের এক পাশে বাগান, অন্য পাশে মাছ চাষের হাউস। অথচ ছাদের খুব কাছ দিয়ে গেছে ১ লাখ ৩২ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের তার। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়ার মাহেলা খাতুন বালিকা মাদ্রাসার ওই ভবনটি দোতলা থেকে তিনতলা করার সময় ঝুঁকির কথা জানিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। এরপরও ভবনটি তিনতলা করা হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ ওই ছাদে অবাধে যাতায়াত ছিল শিক্ষার্থীদের। গত শুক্রবার সেখানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পাঁচ শিক্ষার্থী দগ্ধ হয়। তাদের মধ্যে দুজন মারা গেছে। অন্য তিনজনের অবস্থাও গুরুতর।

তিন বছর আগে মাদ্রাসা ভবনটি দোতলা থেকে তিনতলা করার উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। খবর পেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এসে আপত্তি জানান। এরপরও ভবনটি শেষ পর্যন্ত তিনতলা করা হয়। মাদ্রাসা ভবনের ওপর দিয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার ভোল্টের ছয়টি সঞ্চালন তারের মধ্যে দুটি অপেক্ষাকৃত নিচু দিয়ে গেছে।

দগ্ধ শিক্ষার্থীদের পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঝুঁকি সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ছাদে যাতায়াত বন্ধ করেনি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এমনকি ছাদবাগানে পানি দেওয়াসহ অন্যান্য কাজে শিশুদের ব্যবহার করা হতো। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ্ আরেফিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ভবনের যে উচ্চতা দিয়ে উচ্চ ভোল্টের তার গেছে, তা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনা এড়াতে তাঁরা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ভবনটির দোতলার পর সিল করে দেওয়া বা ভবনটি অপসারণের বিষয়ে প্রস্তাব দেবেন।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে ১০ শতাংশ জমির ওপর দুটি ভবন নির্মাণ করেন আবদুর রহমান কাসেমী। বড় ভবনটিতে মাহেলা খাতুন বালিকা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বর্তমানে আবাসিক ও অনাবাসিক মিলিয়ে মাদ্রাসায় প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ জন আবাসিক। শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ২০। গত শুক্রবারের দুর্ঘটনার পর মাদ্রাসায় এক সপ্তাহের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

তিন বছর আগে মাদ্রাসা ভবনটি দোতলা থেকে তিনতলা করার উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। খবর পেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এসে আপত্তি জানান। এরপরও ভবনটি শেষ পর্যন্ত তিনতলা করা হয়। মাদ্রাসা ভবনের ওপর দিয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার ভোল্টের ছয়টি সঞ্চালন তারের মধ্যে দুটি অপেক্ষাকৃত নিচু দিয়ে গেছে। কাছাকাছি আরও একটি ভবন ও একটি মাদ্রাসার ওপর দিয়েও একই লাইন গেছে।

মাদ্রাসার পরিচালক আবদুর রহমান কাসেমী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন আপত্তি জানানোয় কলামের উচ্চতা ৯ ফুট থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ ফুট করা হয়। ওপরে কোনো রডের মাথা বের করে রাখা হয়নি, সেগুলো ঢালাই দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের লিখিত কোনো অনুমতিপত্র দেখাতে পারেননি। তাঁর দাবি, আগে তার উঁচুতে থাকলেও তা ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেছে।

মদনগঞ্জ ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সঞ্চালন লাইনের সহকারী প্রকৌশলী নূর ই আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সঞ্চালন লাইনের নিচে থাকা সব স্থাপনা অবৈধ। এগুলো থাকতে পারবে না। মাদ্রাসা ভবনের উচ্চতার বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁরা কোনো অনুমতি দেননি। দুর্ঘটনা এড়াতে সঞ্চালন লাইনের নিচে থাকা স্থাপনা নিজ দায়িত্বে সরিয়ে নিতে হবে।

ওই মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, ছাদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শিক্ষার্থীদের জুতা ও চশমা। কোথাও রক্তের দাগ, কোথাও পোড়া কাপড়ের অংশ। ছাদের এক পাশে বাগান। সেখানে কলা, পেঁপে, ফুলসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ আছে। অন্য পাশে তৈরি করা হয়েছে মাছ চাষের হাউস। আর ছাদের ওপরে খুব কাছ দিয়ে গেছে উচ্চ ভোল্টের সঞ্চালন লাইন।

ছাদ সব সময় তালাবদ্ধ রাখা হতো। দুর্ঘটনার দিন শিক্ষার্থীরা ভেতর থেকে ছাদের তালার চাবি নিয়ে সেখানে যায়, ম্যাডামও জানতেন না।

শিক্ষার্থীদের পরিবার ও এলাকাবাসীর ভাষ্য, দুর্ঘটনার আগে ছাদে নিয়মিত যাতায়াত করত শিক্ষার্থীরা। তারা বাগান পরিচর্যা ছাড়াও পানি দেওয়ার কাজে যুক্ত ছিল। শিশুদের ছাদে ওঠার সুযোগ না থাকলে বা বাগান ও মাছ চাষের জন্য ছাদটি ব্যবহার না করলে দুর্ঘটনাটি ঘটত না।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও পাশের একটি ভবনে কাজ করা রাজমিস্ত্রি আলমগীর হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিকেলের দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ লাল হয়ে যায়। তাঁরা ছাদে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দগ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

তবে ছাদে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে বিধিনিষেধ ছিল বলে দাবি করেছেন মাদ্রাসার পরিচালক আবদুর রহমান কাসেমী। তিনি বলেন, ছাদ সব সময় তালাবদ্ধ রাখা হতো। দুর্ঘটনার দিন শিক্ষার্থীরা ভেতর থেকে ছাদের তালার চাবি নিয়ে সেখানে যায়, ম্যাডামও জানতেন না। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘ম্যাডাম ছাদে গেলে তাঁর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ থাকত, তারা গাছে পানি দিত।‌ ম্যাডাম চলে এলে ছাদ আবার তালাবদ্ধ রাখা হতো।’

স্বজনদের একজন মামলা করবেন বলে শুনেছিলাম। এটি কওমি মাদ্রাসার অন্তর্ভুক্ত। তাদের বিষয়টি আমরা দেখি না। তাদের বিষয়টি বেফাক (বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ) দেখে।

দুর্ঘটনায় দগ্ধ পাঁচ শিক্ষার্থীর মধ্যে জিদনী আক্তারের শরীরের ৮২ শতাংশ, লামিয়ার ৫৫ শতাংশ, আতিয়ার ৪৫ শতাংশ, সুমাইয়ার ১৩ শতাংশ ও আছিয়ার ৭ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। তাদের মধ্যে জিদনী, লামিয়া ও আতিয়াকে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক সুলতান মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার আতিয়া এবং আজ বুধবার সকালে জিদনী মারা গেছে। অন্য শিশুদের অবস্থাও গুরুতর।

মারা যাওয়া জিদনীর বাবা মো. মোহন মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মেয়ের লাশ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে। দগ্ধ লামিয়ার বাবা আবদুল আলীম বলেন, মেয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করছেন।

মাদ্রাসার পরিচালক আবদুর রহমান কাসেমী বলেন, দুর্ঘটনার পর হতাহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বহন করছে। আহত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একজন আইসিইউতে আছে, অন্য দুজনকে বেডে দেওয়া হয়েছে।’ মাদ্রাসা এক সপ্তাহের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে জানিয়ে বলেন, ‘এখানে কী হয়, তার ওপর ভিত্তি করে মাদ্রাসা খোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম। তিনি বলেন, দগ্ধ শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ময়নাতদন্ত শাহবাগ থানার অধীনে হবে। স্বজনেরা সেখানে আছেন। তাঁরা মামলা না করলে পুলিশ নিজ থেকে মামলা করবে না।

জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘স্বজনদের একজন মামলা করবেন বলে শুনেছিলাম। এটি কওমি মাদ্রাসার অন্তর্ভুক্ত। তাদের বিষয়টি আমরা দেখি না। তাদের বিষয়টি বেফাক (বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ) দেখে। বেফাকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হবে।’