প্রাপ্তবয়স্ক তিন নারীকে বৈধ কাগজপত্র সত্ত্বেও বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার ঘটনায় হাইকোর্ট মঙ্গলবার রুল জারি করেছেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, এই কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। এই রুলের মাধ্যমেই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে, যা কেবল তিনজন নারীর ভোগান্তির গল্প নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চোখে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কতটা স্বাধীন নাগরিক—এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটি তুলে ধরেছে।
নেপাল যাওয়ার কথা ছিল ওই তিন নারীর। তাদের কাছে বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা, বিমানের টিকিট এবং হোটেল বুকিং ছিল। আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞাও ছিল না। তা সত্ত্বেও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাদের পরিবারের অনুমতির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং বাড়িতে ফোন করতে বলেন। যেহেতু তারা অবিবাহিত এবং কোনো অভিভাবক ছাড়াই যাত্রা করছিলেন, তাই শেষ পর্যন্ত তাদের বিদেশ যাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিদেশে গেলে তার স্বামী, বাবা বা পরিবারের অনুমতি নিয়ে পুলিশ কেন জিজ্ঞাসাবাদ করে? পুরুষ যাত্রীদের ক্ষেত্রে কি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তাদের স্ত্রী বা মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে নিশ্চিত হন যে তারা বিদেশে যেতে পারবেন? যদি পুরুষদের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন অপমানজনক ও হাস্যকর মনে হয়, তবে নারীদের ক্ষেত্রে সেটি স্বাভাবিক বলে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা কী?
ঘটনার পর তিন নারী পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আইনি নোটিশেরও কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। নাগরিক প্রশ্ন করলেও কর্তৃপক্ষ নীরব থাকা জবাবদিহিহীনতার উদাহরণ।
এমন অভিজ্ঞতা নতুন নয়। নারী অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী ফেসবুকে একটি পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। তিনি জানান, একটি নেতৃত্ববিষয়ক কর্মশালায় অংশ নিতে পাঁচ নারী নেপাল যাচ্ছিলেন। সব নথি থাকার পরও দলের একজনকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা জিজ্ঞাসা করেন, তাঁর স্বামী এই সফরের কথা জানেন কি না। স্বামীর সম্মতিসূচক উত্তরেও কর্মকর্তা সন্তুষ্ট হননি। স্বামীর ফোন নম্বর নিয়ে নিজেরাই ফোন করে নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে যেতে দেওয়া হয়। অথচ ওই নারী নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন।
একজন নারী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে পারেন, কিন্তু নিজের বিদেশযাত্রার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তাঁর নেই—এমন ধারণা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে গেঁথে আছে। তিনি যত যোগ্য ও শিক্ষিতই হোন না কেন, তাকে স্বতন্ত্র নাগরিক হিসেবে নয়, কারও স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে দেখা হয়।
তিন নারী আদালতে যেতে পেরেছেন বলেই ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু একই ধরনের হয়রানির শিকার কত নারী প্রতিবাদ না করে ফিরে গেছেন, টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের অর্থ হারিয়েছেন বা অপমানকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন, সেই হিসাব আমাদের জানা নেই।
সমস্যাটি নিছক কয়েকজন কর্মকর্তার আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি নারীর প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি সংকীর্ণ, অভিভাবকত্বসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম মানুষ হিসেবে দেখে না। ধরে নেয়, তাঁর চলাফেরা, পোশাক, ভ্রমণ বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বৈধতা নির্ধারণ করবেন অন্য কেউ। কখনো পরিবার, কখনো সমাজ, আবার কখনো রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা নিজেই সেই অভিভাবকের ভূমিকায় বসে যান।
ইমিগ্রেশন পুলিশের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। মানব পাচার, জাল কাগজপত্র, অপরাধীর দেশত্যাগ বা আইনগত নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে তাদের যাচাই করতে হবে। কোনো যাত্রীর বিষয়ে যৌক্তিক সন্দেহ দেখা দিলে আইনসম্মতভাবে প্রশ্ন করা যেতে পারে। কিন্তু সন্দেহের ভিত্তি হতে হবে তথ্য, আইন ও পেশাগত মানদণ্ড। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অবিবাহিত কি না বা একা ভ্রমণ করছেন কেন—এগুলো কোনো বিবেচনার বিষয় হতে পারে না। নিরাপত্তা যাচাই এবং ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার হস্তক্ষেপ এক বিষয় নয়।
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ সব নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত করেছে। ২৮ অনুচ্ছেদে লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে। আর ৩৬ অনুচ্ছেদ নাগরিকের চলাফেরা ও দেশত্যাগের স্বাধীনতা স্বীকার করেছে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধ, সামাজিক ধারণা বা নৈতিকতার ব্যাখ্যা এসব সাংবিধানিক অধিকারের ঊর্ধ্বে নয়।
সম্প্রতি মেট্রোরেলের আরেকটি ঘটনাও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। একজন অ্যাথলেট প্রশিক্ষক শরীরচর্চা শেষে টি-শার্ট ও শর্টস পরে মেট্রোরেলে উঠতে গেলে পুলিশের দায়িত্বরত সদস্য তাঁর পোশাককে ‘অশালীন’ বলে বাধা দেন। প্রায় ৪০ মিনিট তাঁকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। অথচ মেট্রোরেলে যাতায়াতের জন্য কোনো পোশাকবিধি নেই বলে কর্তৃপক্ষই জানিয়েছে। কোন পোশাক শালীন আর কোনটি অশালীন—তার কোনো লিখিত নিয়ম দেখাতে না পারলেও পুলিশের সদস্য দাবি করেছেন, এসব দেখা তাঁর দায়িত্ব।
কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে মব তৈরি হলে বা কেউ অন্যায়ভাবে আক্রান্ত হলে পুলিশের দায়িত্ব তাঁকে উদ্ধার করা। কিন্তু পুলিশ নিজেই নিপীড়কের ভূমিকায় চলে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ব্যক্তির রক্ষণশীলতা যখন পুলিশের পোশাক, পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা আর ব্যক্তিগত মত থাকে না; নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যায্য আচরণে পরিণত হয়।
হাইকোর্ট ওই তিন নারীর অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি জানতে চেয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা এ ধরনের লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বাধা না দিতে কেন যথাযথ নির্দেশনা প্রণয়ন করা হবে না।
পুলিশের কাজ নাগরিকের নৈতিক অভিভাবক হওয়া নয়। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী কার সঙ্গে কোথায় যাবেন, কী পোশাক পরবেন কিংবা তাঁর পরিবার সেই সিদ্ধান্তের কথা জানে কি না—এসব নির্ধারণের ক্ষমতা পুলিশের কোনো সদস্যের নেই। জনপরিসরে শৃঙ্খলা রক্ষা আর নিজের নৈতিক ধারণা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এককথা নয়।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট নাজুক। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, সহিংসতা এবং মবের হাতে মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তাঘাট ও গণপরিবহনে যৌন হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকেন। এসব অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার কাজে পুলিশের আরও মনোযোগী হওয়ার কথা। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুলিশের কোনো কোনো সদস্য অপরাধ দমনের পরিবর্তে নাগরিকের পোশাক, বৈবাহিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘মোরাল পুলিশিং’ করতেই বেশি আগ্রহী।
পুলিশের কাজ নাগরিকের নৈতিক অভিভাবক হওয়া নয়। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী কার সঙ্গে কোথায় যাবেন, কী পোশাক পরবেন কিংবা তাঁর পরিবার সেই সিদ্ধান্তের কথা জানে কি না—এসব নির্ধারণের ক্ষমতা পুলিশের কোনো সদস্যের নেই। জনপরিসরে শৃঙ্খলা রক্ষা আর নিজের নৈতিক ধারণা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এককথা নয়। এই সীমারেখা না মানলে পুলিশ নাগরিকের নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান না হয়ে তাঁর স্বাধীনতার জন্য হুমকিতে পরিণত হতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
মনজুরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠ র জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক *মতামত লেখকের নিজস্ব