টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী এলাকার রুহলী গ্রামের আজাহার আলীর ছেলে আতিকুর রহমান। ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডে ১৭ বছর বসবাস ও কর্মজীবন কাটিয়ে তিনি এখন দেশে ফিরে নিজ এলাকার উন্নয়নে কাজ করছেন। প্রবাসের স্বচ্ছন্দ জীবন ও আয়-রোজগারের সুযোগ ত্যাগ করে স্থানীয় মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত আতিকুর গত এক বছরে নিজস্ব অর্থায়নে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আতিকুর এলাকার রাস্তা, মসজিদ-মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করছেন। তার দাবি, এরই মধ্যে ভূঞাপুরে শতাধিক রাস্তার উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বাগবাড়ি হাইস্কুল ও প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন রাস্তা, রুহলী খেলনার মোড় থেকে আকরাম মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা, কয়ড়া মধ্যপাড়া মসজিদ থেকে নিকরাইলের রাস্তা এবং কষ্টাপাড়া কবরস্থানের দক্ষিণ পাশ থেকে পশ্চিম দিকের রাস্তায় মাটি ভরাট ও পানি নিষ্কাশনের পাইপলাইন স্থাপন অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়া গোবিন্দাসী ও রুহলী গ্রামের বিভিন্ন স্থানে ৩২টি টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়ড়া ধানের বয়েলসংলগ্ন এলাকা, কষ্টাপাড়া মোড়, রুহলী মোড় ও মৃত হাসেন আলীর বাড়িসহ স্থানগুলো রয়েছে। ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ৮২টি মসজিদ ও মাদ্রাসায় উন্নয়নকাজে সহায়তা করেছেন তিনি। চিতুলিয়াপাড়া জামে মসজিদ, বিলচাপড়া ছয়ানি পাড়া, বিলচাপড়া পাঁচানি পাড়া, কয়ড়া, গোবিন্দাসী ও তানিয়া খাতুন মসজিদসহ ঈদগাহ মাঠ ও কবরস্থান উন্নয়নেও তিনি সহায়তা করেছেন।
সাবেক ইউপি সদস্য সুজাব উদ্দিন তালুকদার বলেন, "এসব কাজ সাধারণত জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আতিকুর রহমান নিজ উদ্যোগে ও নিজস্ব অর্থায়নে মানুষের জন্য কাজ করছেন। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা মেম্বার-চেয়ারম্যান অনেক ক্ষেত্রেই যে কাজ করতে পারিনি, আতিক নিজের অর্থায়নে অনেক কাজ করছেন। এটা আমাদের এলাকার জন্য গর্বের। আশা করি, তার এ উন্নয়নমূলক কাজ অব্যাহত থাকবে।"
নিজের উদ্যোগের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে আতিকুর রহমান বলেন, "বিলাসী জীবনযাপন ছেড়ে আমি আমার নিজ এলাকায় বসবাস করছি। প্রবাসে থাকাকালে নিজের এলাকার স্মৃতি একসময় আমাকে ভেতর থেকে নাড়া দিত। তখন থেকেই এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিই। মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ও এলাকার মানুষের কথা চিন্তা করে দূর প্রবাস ছেড়ে নিজের এলাকায় এসেছি। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি সাধ্য অনুযায়ী উন্নয়নমূলক কাজ করছি।"
আতিকুর জানান, গত এক বছরে বিভিন্ন উন্নয়নকাজে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছেন। এই সময়ে শতাধিক রাস্তা, ৮০টির বেশি মসজিদ-মাদ্রাসা, প্রায় ৩০টি কবরস্থান ও ঈদগাহ মাঠ এবং প্রায় ৩০টি টিউবওয়েল স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, "আমার এ উন্নয়নকাজ অব্যাহত থাকবে। সামনে বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা করছি।"
প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে আতিকুর বলেন, "নিজের উদ্যোগ অন্য প্রবাসীদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করেন আতিকুর রহমান। তার ভাষ্য, বিদেশে থাকা প্রবাসীরা যদি নিজ নিজ এলাকার মানুষের জন্য এ ধরনের কাজে এগিয়ে আসেন, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।"
জনপ্রতিনিধি বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আতিকুর স্পষ্টভাবে জানান, "রাজনীতি বা নির্বাচনে যাওয়ার ইচ্ছা তার নেই।"
স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফর রহমান বলেন, "বিদেশে দীর্ঘদিন বসবাস করেও আতিক এলাকার মানুষের কথা ভুলে যাননি। নিজের উপার্জিত অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করছেন। তার এমন উদ্যোগে এলাকার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যেও সমাজের জন্য কাজ করার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।"
গোবিন্দাসীর ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি খবির উদ্দিন বলেন, "আতিক যেভাবে উন্নয়নকাজ করছেন, তা প্রশংসনীয়। এর পাশাপাশি যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করা উচিত। তার মতো আরও বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি মাদকমুক্ত সমাজ গঠনেও ভূমিকা রাখা সম্ভব।"
স্কুলশিক্ষার্থী রুবেল বলেন, "আমাদের বাগবাড়ি স্কুলসহ কয়েকটি মাদ্রাসা আছে। বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হতো। আতিক ভাই জিও ব্যাগ ফেলেছেন। এখন আমাদের বিদ্যালয়ে যেতে কোনো সমস্যা হয় না।"
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, "আতিকুর রহমান যেভাবে উন্নয়নমূলক কাজ করছেন, তা প্রশংসনীয়। যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে তিনি বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজনও করেন। তার মতো আরও বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি মাদকমুক্ত সমাজ গঠনেও ভূমিকা রাখা সম্ভব।"
গোবিন্দাসী মাদ্রাসার ইমাম মুফতি নজরুল ইসলাম বলেন, "মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিন কোনো খেলার মাঠ ছিল না। আতিকুর রহমান নিজ উদ্যোগে মাটি ভরাট করে একটি খেলার মাঠ নির্মাণ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন মাদ্রাসা ও কবরস্থানেও সহায়তা করে আসছেন।"
ভূঞাপুর সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, "আতিকুর রহমান ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের বিদ্যালয়ে তিনি একটি টিউবওয়েল স্থাপন করে দিয়েছেন। এ ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ প্রশংসনীয়।"
ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব হাসান বলেন, "আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। এ ধরনের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তিনি যদি সার্বিক সহযোগিতা চান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।"