জামালপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে হাটচন্দ্রা মিয়াবাড়ি বাজার। এই বাজার থেকে পশ্চিম দিকে আরও ৫০০ মিটার এগোলে ঝিনাই নদ। নামে নদ হলেও দেখতে অনেকটা সরু খালের মতো। নদের পূর্ব পারে জনবসতি আছে। পশ্চিম পারে শুধু ফসলি জমি। সেখানে সড়ক তো দূরের কথা, আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কোনো জনবসতিও নেই। এ রকম একটি এলাকায় প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৯৫ মিটার দীর্ঘ এক সেতু।

২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এই সেতু যানবাহন ‘চলাচলের’ জন্য উন্মুক্ত করে দেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। স্থানীয় লোকজন সেতুটি ব্যবহার করছেন মূলত ঝিনাই নদের পশ্চিম পারে ফসলের মাঠে যাতায়াতের জন্য। এর বাইরে ধান-খড়সহ বিভিন্ন ধরনের ফসল শুকানোর কাজেও সেতুটি ব্যবহার করেন কেউ কেউ।

সেতুর পূর্ব পারের হাটচন্দ্রা এলাকা জামালপুর সদর পৌরসভার আওতাধীন। আর পশ্চিম পারে মেলান্দহ উপজেলার চরপলিশা ও মধ্যেরচর এলাকা। এই দুটি এলাকার মানুষের যাতায়াতের কোনো পথ এই সেতুর দিকে নেই। এই সেতু নির্মাণের আগে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি বলে মুক্তকণ্ঠ কে জানান জামালপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান।

অন্যদিকে এলজিইডি জামালপুর কার্যালয়ের সদ্য বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদও স্বীকার করেছেন সেতুর পশ্চিম পাশে কোনো সড়ক নেই। তবে তিনি বলেন, সেতুর পশ্চিম পাশে সড়ক নির্মাণের জন্য একটি প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সেতুর পূর্ব পারের হাটচন্দ্রা এলাকার ১৬ জন বাসিন্দার সঙ্গে ১২ সেপ্টেম্বর কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ । তাঁদের কথা, এখানে সেতু নির্মাণের দাবি কখনো কেউ করেনি। কারণ, সেতুর পশ্চিম পাশে জনবসতি নেই। এরপরও কেন এত টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হলো, সেই প্রশ্ন তাঁদেরও।

১২ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে সেতু পার হয়ে পশ্চিম পারের মাঠে ঘাস কাটতে যাচ্ছিলেন হাটচন্দ্রা এলাকার বাসিন্দা আবদুস সালাম। তাঁর সঙ্গে কথা হয় সেতুর পশ্চিম প্রান্তে। আবদুস সালাম বলেন, বর্ষা মৌসুমে সেতুর পশ্চিম পাশের বিস্তীর্ণ জমি পানির নিচে থাকে। শুকনা মৌসুমে সেখানে ধান ও নানা ধরনের সবজি চাষ হয়। হাটচন্দ্রা এলাকার কিছু মানুষের জমি আছে সেতুর পশ্চিম পারে। তবে বেশির ভাগ জমির মালিক মেলান্দহ উপজেলার লোকজন।

আবদুস সালামের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন হাটচন্দ্রার আরেক বাসিন্দা বানু বেগম তখন সেতুর ওপর ধান শুকাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, রোদে ধান শুকানোর জন্য এই সেতু তাঁদের অনেকের কাজে লাগছে।

৯৫ মিটারের সেতু

এলজিইডি জামালপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চল পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ১৫ মার্চ। ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্মাণকাজ শেষে সেতুটি ‘যানবাহন চলাচলের’ জন্য খুলে দেওয়া হয়। সেতুটি দৈর্ঘ্যে ৯৫ মিটার, প্রস্থে ৯ দশমিক ৮ মিটার। নির্মাণ ব্যয় ১৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতুর এক পাশে যদি সড়ক না থাকে, তাহলে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, প্রয়োজন নির্ধারণ ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত সেতুটি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা, পরিকল্পনা ও সড়ক না হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা এবং দায় থাকলে তা নির্ধারণ করে ব্যবস্থা নেওয়া।

এলজিইডি সূত্র জানায়, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চল পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় জামালপুরের পাশাপাশি শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলায় সড়ক, কালভার্ট ও সেতু নির্মাণ করা হয়। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা।

প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ‘ওই সেতুর এক পাশে সড়ক না থাকার বিষয়টি জানি। প্রকল্পের শুরুর দিকেই সেতুটি নির্মাণ হয়েছে। আমি শুরু থেকে এই প্রকল্পে ছিলাম না। কিছু রাজনৈতিক নেতার তদবিরে হয়তো সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে।’

সেতু হবে শুনে অবাক হন মানুষ

স্থানীয় যে ১৬ বাসিন্দার সঙ্গে মুক্তকণ্ঠ র কথা হয়েছে, তাঁরা বলেছেন ২০২২ সালে যখন এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়, তখন কিছুটা অবাক হয়েছিলেন। পরে তাঁরা শুনেছিলেন, সেতুর পশ্চিম পাশে সরকার ‘নকশিপল্লি’ গড়ে তুলবে। এরপর জানতে পারেন ‘নকশিপল্লি’ স্থাপন করা হবে শহরের কম্পপুর এলাকায়। সেতুর পশ্চিম পারে জনবসতি নেই।

ওই ১৬ জনের একজন হাটচন্দ্রা এলাকার বাসিন্দা মো. আশেক আলী। তিনি বলেন, কয়েক কিলোমিটার ফসলের মাঠ পেরোনোর পর চরপলিশা ও মধ্যেরচর নামে যে এলাকা (সেতুর পশ্চিম পারে) রয়েছে, সেখানকার লোকজন এই পথ (যেখানে সেতু নির্মিত হয়েছে) কেন ব্যবহার করবে? এখানে আসতে হলে ধানখেত দিয়ে হেঁটে পাঁচ–ছয় কিলোমিটার হাঁটতে হবে। বর্ষায় সেটাও সম্ভব নয়, তখন পুরো মাঠ ডুবে থাকে।

উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় মানুষের মতামত, বাস্তব প্রয়োজন ও সম্ভাব্য উপকারভোগীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করেন জামালপুরের নগর উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম। তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, জনগণের করের টাকায় নেওয়া প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন পূরণ করা এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করা।

জামালপুরের নগর উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি বলেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতুর এক পাশে যদি সড়ক না থাকে, তাহলে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, প্রয়োজন নির্ধারণ ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত সেতুটি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা, পরিকল্পনা ও সড়ক না হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা এবং দায় থাকলে তা নির্ধারণ করে ব্যবস্থা নেওয়া।