নোয়াখালীর সুবর্ণচরে কিশোর নাঈম হত্যার রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশ। শনিবার উপজেলার চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে নাঈমের বাবা মো. খলিলুর রহমানের (৪১) আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং পুলিশের কাছে করা স্বীকারোক্তির বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পাওয়া নানা খুঁটিনাটিও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ হারেজ উদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন। নোয়াখালী জেলা পুলিশের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং এসআরবি-১১-এর যৌথ তদন্তে খলিলুর রহমানের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। পুলিশ জানায়, খুনির নাম আগে থেকেই সন্দেহের তালিকায় ছিল। ছেলের জানাজায় বারবার ফোন করে তাঁকে ডেকে আনা হয় এবং পরে কৌশলে থানায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ঘাতক বাবা খলিলুর রহমান।

গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নের মধ্য বাগ্যা গ্রামে নানার বাড়ির ৩০০ থেকে ৪০০ গজ দূরের একটি ধানখেতের পাশ থেকে নাঈমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত নাঈম চরজব্বার ইউনিয়নের দারুল উলুম মাদানী নগর মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।

পরিকল্পিত খুন

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, খলিলুর রহমান পরিকল্পনা করেই তাঁর ছেলেকে খুন করেন। গত সোমবার রাতে নাঈম নানার বাড়ির সামনের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত আড়াইটার দিকে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন বাবা। নাঈম কোনো কিছু না বুঝেই বাবার ডাকে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে খলিলুর রহমান বলেন, "ঘর থেকে ৩০০–৪০০ গজ দূরে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাঈমকে রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে জোরে ধাক্কা দেন তিনি। আঘাতে নাঈম লুটিয়ে পড়লে সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে পেছন থেকে শ্বাস রোধ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর লাশ সেখানেই ফেলে রেখে পালিয়ে যান।"

পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা

সন্তানকে হত্যার পর পুলিশ ও প্রযুক্তির নজর এড়াতে অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনা করেছিলেন ঘাতক খলিলুর রহমান। তিনি পাশের জেলা ফেনী থেকে নোয়াখালী আসার আগেই নিজের ব্যবহৃত মুঠোফোন বন্ধ করে সেখানে রেখে আসেন, যাতে ডিজিটাল লোকেশনে তাঁকে ঘটনাস্থলে না দেখা যায়। সেখান থেকে বিভিন্ন যানবাহন বদলে সোনাপুর হয়ে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে চরজব্বরে এসে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। হত্যার পর আবার ফেনী ফিরে গিয়ে বন্ধ মুঠোফোনটি চালু করেন, যেন তাঁর নোয়াখালীতে কিংবা ঘটনাস্থলে উপস্থিতির বিষয়টি কোনোভাবেই ধরা না পড়ে।

যেভাবে ধরা পড়লেন

এমন নিখুঁত পরিকল্পনার পরও শেষ রক্ষা হয়নি। নোয়াখালী জেলা পুলিশের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং এসআরবি-১১-এর তদন্তে খলিলুর রহমানের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয় পুলিশ। পুলিশ জানায়, খলিলুর আগে থেকেই সন্দেহের তালিকায় ছিলেন। ছেলের জানাজায় বারবার ফোন করে তাঁকে ডেকে আনা হয়। এরপর পুলিশ কৌশলে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।

এ ঘটনায় লাশ উদ্ধারের তিন দিন পর গত শুক্রবার নিহতের মা ফাতেমা আক্তার সুমি বাদী হয়ে খলিলুর রহমানকে একমাত্র আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।