আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস (আউটসোর্সিং কাজ দেওয়া–নেওয়ার ওয়েবসাইট) ফাইভআরে একের পর এক ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি এবং ‘ফিডব্যাক বুস্টিং’ বা ‘ফেক রিভিউ’ কেনার কারণে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছেন বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা। সম্প্রতি ‘বিটোপিয়া গ্রুপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত ও নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম উন্মোচিত হওয়ার পর এই সংকট ও ফাইভআরের কঠোর নজরদারি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিটোপিয়ার অনিয়ম ও নিয়ম লঙ্ঘনের চিত্র

একাধিক ফ্রিল্যান্সার ফাইভআরে অভিযোগ করে জানান, বিটোপিয়া কেবল কর্মচারীদের নামে ফাইভআরে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং একটি জটিল ও নিয়মবহির্ভূত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। কাজের নিম্নমানের ঘাটতি ঢাকতে এবং অ্যাকাউন্টের র‍্যাঙ্ক বাড়াতে তারা ব্যাপকভাবে ভুয়া (ফেক) রিভিউ কিনত। এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের অর্থ দিয়ে ভুয়া বায়ার অ্যাকাউন্ট তৈরি করে নিজেদের সার্ভিসেই অর্ডার দেওয়া হতো এবং ‘ফাইভ স্টার’ পজিটিভ রিভিউ নিশ্চিত করা হতো। এই স্পেশাল অর্ডার বা ফেক রিভিউ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে আলাদা একটি বিশেষ দলও কাজ করত।

আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ‘ফাইভআরে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ফ্রিল্যান্সার কাজ করলেও দেশের এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখনো প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের অভাবে চরম সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে।

ফাইভআরের কঠোর স্ক্রিনিং ও তদন্তপ্রক্রিয়া

বিটোপিয়ার নিয়মভঙ্গের তথ্য ফাইভাআরের নজরে আসার পর প্ল্যাটফর্মটি তাদের নিরাপত্তা ও স্ক্রিনিং ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর করেছে। ২০২৩ সালে বেসিস সফটএক্সপোতে ওই সময়ের ফাইভআরের গ্লোবাল কমিউনিটি টিম লিডার মো. জাহিদুল ইসলাম (বর্তমানে ফাইভআরের এশিয়া রিজিওনাল কমিউনিটি ম্যানেজার এবং গ্লোবাল ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর) তুলে ধরেন যে ফাইভআরে অ্যাকাউন্ট স্থগিতের প্রধান দুটি কারণ হলো ‘মাল্টি অ্যাকাউন্টস’ (একধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার) এবং ‘ফিডব্যাক বুস্টিং’ (রিভিউ কেনাবেচা)। বাংলাদেশের বেশির ভাগ ফ্রিল্যান্সারের পেশা শুরুতেই পারিপার্শ্বিক কারণে নিজের অজান্তে এই নিয়মভঙ্গের (ভায়োলেশন) জড়িয়ে যায়।

ফাইভআরের একাধিক ফ্রিল্যান্সার জানান, বিটোপিয়া নিয়ে এর আগেও একাধিকবার রিপোর্ট করা হলেও পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে ফাইভআর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বিটোপিয়ার নিজস্ব ব্যবস্থাপনা দলের কতিপয় ব্যক্তি তাদের অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণ জনসমক্ষে এবং ফাইভআরের কাছে তুলে ধরেন। বিটোপিয়ার অসংগতিপূর্ণ ব্যবসায়িক মডেল এবং অনিয়মের জোরালো প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরেই ফাইভআর দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, ফাইভআর অন্যায্যভাবে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। কোনো অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে প্রথমে সেটির যুক্তি ও প্রমাণ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা (রিভিউ) করা হয়। নিরপেক্ষ পর্যালোচনার পর সন্দেহজনক কার্যক্রমের সত্যতা মিললেই কেবল পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হয়। তিনি এ–ও জানান, ফাইভআর কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়; বরং যে কোনো অ্যাকাউন্টের অনিয়মের ওপর নির্ভর করেই পদক্ষেপ নেয়।

ফাইভআরে অ্যাকাউন্ট স্থগিতের প্রধান দুটি কারণ হলো ‘মাল্টি অ্যাকাউন্টস’ (একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার) এবং ‘ফিডব্যাক বুস্টিং’ (রিভিউ কেনাবেচা)। বাংলাদেশের বেশির ভাগ ফ্রিল্যান্সারের পেশা শুরুতেই পারিপার্শ্বিক কারণে নিজের অজান্তে এই নিয়মভঙ্গের (ভায়োলেশন) জড়িয়ে যায়।

সাধারণ ফ্রিল্যান্সারদের দুশ্চিন্তা

ফাইভআরের কমিউনিটি ম্যানেজার ও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর প্ল্যাটফর্মটির লিগ্যাল ও রিস্ক টিমের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল করার চেষ্টা করলেও নীতিগত গুরুতর নিয়মভঙ্গ পুরোপুরি মওকুফ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে ফাইভআর। তবে জাহিদুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, যেসব ফ্রিল্যান্সার ফাইভআরের নিয়ম বা নীতিমালা লঙ্ঘন করেননি, তাঁদের অ্যাকাউন্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। ফাইভআর তাদের নীতিমালার ভেতরে থাকা সৎ ফ্রিল্যান্সারদের সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেয়।

বিটোপিয়ার মতো কয়েকটি অসাধু প্রতিষ্ঠানের কৌশল এবং অনৈতিক উপায়ে কাজ পাওয়ার মানসিকতার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে দেশের লাখ লাখ সৎ ও পরিশ্রমী ফ্রিল্যান্সারকে। বিশেষজ্ঞরা তাগিদ দিয়েছেন, ফ্রিল্যান্সিং খাতে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে অনৈতিক পন্থা ছেড়ে কাজের প্রকৃত দক্ষতা ও গুণগত মান বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ফাইভআরে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ফ্রিল্যান্সার কাজ করলেও দেশের এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখনো প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের অভাবে চরম সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে।

বেসিস সফটএক্সপোতে প্রকাশিত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১০ সালে ফাইভআরের জন্মলগ্ন থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের অবস্থান, কাজের পরিধি, বিদ্যমান নানা সমস্যা এবং এর সমাধানের সম্ভাব্য পথ বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হলো এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর এত সময় পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং শিল্পকে এগিয়ে নিতে কিংবা সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

টিম ম্যাভিনের প্রতিষ্ঠাতা ও টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার কাজী মামুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘গত এক যুগের বেশি সময় ধরে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত থাকার সুবাদে আমি দেখেছি, কীভাবে আমাদের দেশের তরুণেরা নিজেদের মেধা ও হাড়ভাঙা পরিশ্রমে বিশ্বমঞ্চে একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করেছে; কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যখন সিন্ডিকেট করে, অ্যালগরিদম ম্যানিপুলেট করে, ভুয়া অর্ডারের মাধ্যমে সফল ফ্রিল্যান্সারদের পেশা ধ্বংস করে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না, পুরো শিল্পের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফায়সাল আলিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা দেশে বসেই আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের মেধা দিয়ে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বড় অবদান রাখছেন; কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের নিজস্ব দেশের এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে শক্তিশালী করতে এবং এই দূরদর্শী পেশাজীবীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে স্থানীয় পর্যায়ে বারবার উদাসীনতা প্রদর্শন করা হয়েছে। আমরা খুব তাড়াতাড়ি ফ্রিল্যান্সার সামিটের আয়োজন করছি। এর আগেই একটি নীতিমালা ও অসাধু ক্ষতিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

টিম ম্যাভিনের প্রতিষ্ঠাতা ও টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার কাজী মামুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘গত এক যুগের বেশি সময় ধরে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত থাকার সুবাদে আমি দেখেছি, কীভাবে আমাদের দেশের তরুণেরা নিজেদের মেধা ও হাড়ভাঙা পরিশ্রমে বিশ্বমঞ্চে একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করেছে; কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যখন সিন্ডিকেট করে, অ্যালগরিদম ম্যানিপুলেট করে, ভুয়া অর্ডারের মাধ্যমে সফল ফ্রিল্যান্সারদের পেশা ধ্বংস করে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না, পুরো শিল্পের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হলো তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির চরম লঙ্ঘন। বিটোপিয়া তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাধারণ কর্মীদের ব্যক্তিগত এনআইডি ও পাসপোর্ট ব্যবহার করে মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট খোলে, যেটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করা হয়। এটি কেবল মার্কেটপ্লেসের নিয়মনীতির লঙ্ঘনই নয়; বরং দেশের প্রচলিত আইন ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার চরম অবমাননা। ফাইভআর বা আপওয়ার্কের মতো আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসগুলোর ‘ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি’ দল এসব আইডেন্টিটি থেফট এবং অস্বাভাবিক কার্যকলাপ খুব সহজেই শনাক্ত করতে পারে। যখন তারা দেখে, একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে ক্রমাগত অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক চর্চা হচ্ছে, তখন পুরো দেশটির ফ্রিল্যান্সারদের ওপর থেকেই তাদের আস্থা কমে যায়। গ্রাহকেরাও তখন সেই দেশের প্রোফাইল দেখলে কাজ দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। মেধা ও সততার বদলে যদি এমন নোংরা মাফিয়াতন্ত্র ও পরিচয় জালিয়াতি মার্কেটপ্লেস নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তবে আমাদের সম্ভাবনাময় ফ্রিল্যান্সিং খাত অচিরেই তার আন্তর্জাতিক বাজার হারাবে।’

ফ্রিল্যান্সিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে অবিলম্বে এই খাতের সংকট চিহ্নিত করে উপযুক্ত নীতিমালা ও সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। না হলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে দেশের বিশাল তরুণ ফ্রিল্যান্সার সমাজ।